সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ২৪। বরুণদেব
গোবিন্দপুরে যখন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের নির্মাণ শুরু হলো তখন এখানকার আদি বাসিন্দা বসু পরিবারের পুনর্বাসন মিলল বাহির সিমলাতে। সেখান থেকে কালক্রমে কলকাতা থেকে পাঁচ ক্রোশ দূরে বোড়াল গ্রামে গিয়ে বসতি স্থাপন করল বসু পরিবার। এই বোড়াল গ্রামে জন্ম এই পরিবারের রাজনায়ায়ণ বসুর। বাবা নন্দকিশোর বসু ছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের অনুগত শিষ্য ও ব্যক্তিগত সচিব। সেকালে কলকাতার দক্ষিণের গ্রামগুলিতে বর্ধমান থেকে আসা গুরুরা ধনী গৃহস্থদের চণ্ডীমণ্ডপে পাঠশালা খুলতেন। গাঁয়ের সেই পাঠশালায় রাজনারায়ণের বিদ্যারম্ভ। সাত বছর বয়সে কলকাতা যাত্রা। কলকাতার বাঙালি পাড়ায় পাড়ায় তখন ইংরাজি শিক্ষিত বাঙালিদের ইংরাজি স্কুল। বৌবাজারের শম্ভু মাস্টারের ইংরাজি স্কুল হয়ে ডেভিড হেয়ারের স্কুল ঘুরে হিন্দু কলেজে ভর্তি হলেন যখন রাজানারায়ণ, তখন কলেজ আলো করে আছেন সাহিত্যের অধ্যাপক ডি এল রিচার্ডসন এবং নেপোলিয়ান বোনাপার্টের সৈন্যদলের এক পদাতিক সৈন্য থেকে গণিতের সুপণ্ডিত অধ্যাপক হয়ে ওঠা বীজ সাহেব। কলেজের ডেস্কে তখন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, প্যারিচরণ সরকার, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, আনন্দকৃষ্ণ বসু, জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরদের ছাত্রবেলা। হিন্দু কলেজে পাঁচ বছরের পাঠ শেষ করে রাজনারায়ণ যোগ দিলেন ব্রাহ্মসমাজে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে ব্রাহ্মস্মাজের ধমনীতে তখন নতুন রক্তের প্রবাহ। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক অক্ষয় কুমার দত্তের সঙ্গে জুড়ে গেলেন রাজনারায়ণ, পত্রিকার জন্য শুরু করলেন উপনিষদের ইংরাজি অনুবাদ। ১৮৪৮-এ ইংলণ্ডে দ্বারকানাথ ঠাকুরের মৃত্যু হলে দেনার দায় মেটাতে মেটাতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৈষয়িক অবস্থা খারাপ হলো। উপনিষদের ইংরাজি অনুবাদের কাজ বন্ধ হলো। প্রায় দেড় বছর বসে থেকে ১৮৪৯-এ সংস্কৃত কলেজে দ্বিতীয় ইংরাজি শিক্ষকের পদে যোগ দিলেন। সেখানে ক্লাসের ছাত্রদের পাশাপাশি ইংরাজি শেখালেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, বামগতি ন্যায়রত্নদের।
ইতিমধ্যে বেদের অভ্রান্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল ব্রাহ্মসমাজে। অক্ষয়কুমার দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে রাজনারায়ণও মনে করলেন যে মানুষের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তি বেদ নয়, আত্মপ্রত্যয়। সে সময় ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত যুবকরা প্রাচ্য বিরোধিতার স্রোতে গা ভাসাতে গিয়ে দেশীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে করতে করতে সুরাপানে ডুবে গিয়ে আপন সংস্কৃতিকে জলাঞ্জলি দিতে লাগল। রাজনারায়ণ হিন্দু কলেজের ছাত্র হয়েও, ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও,সে স্রোতে গা ভাসান নি। ১৮৫১ সালে মেদিনীপুর জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়ে মেদিনীপুরে পা দিয়ে দেশের জন্য নানান কাজে হাত দিলেন। কখনো মেদিনীপুর জেলা স্কুলের উন্নয়নে, কখনো বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনে তো কখনো সুরাপান নিবারণে। শিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে স্থাপন করলেন ‘জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা’। মেদিনীপুরে একের পর এক সভা-সমিতি গড়ে উঠল। অবস্থা এমনই দাঁড়াল যে মদারুরা তাঁর ওপর রেগে গেল। তাঁর সভা-সমিতির চোটে লোকজন বিরক্ত হয়ে পড়ল। একবার এক ভদ্রলোক তাঁকে বলেছিলেন – আপনার সভাসমিতি বন্ধ করার জন্য একটা সভা নিবারণী সভার স্থাপন করা দরকার, যে সভার কাজ হবে আপনাদের সভার খবর পেলেই লাঠিসোটা নিয়ে হাজির হওয়া।
মেদিনীপুরে ব্রাহ্মসমাজের পুনর্জাগরণে মন দিলেন রাজানারায়ণ। তাঁর উপদেশগুলি মুদ্রিত আকারে ছড়িয়ে পড়ল। সেগুলি পড়ে ব্রাহ্মসমাজের দিকে আকৃষ্ট হলেন কেশবচন্দ্র সেন, যাঁর হাত ধরে পররবর্তীকালে ব্রাহ্মসমাজে ফাটল দেখা দিল, ব্রাহ্মসমাজ ভাগ হয়ে গেল আদি ও নব্যে। কেশবচন্দ্র ও তাঁর অনুগামী যুবকদের অতিবৈপ্লবিক মতাদর্শে মত দিতে পারলেন না রাজনারায়ণ, রয়ে গেলেন আদি শাখায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে।
উনবিংশ শতাব্দীর ইংরাজি শিক্ষার গনগনে আঁচে খ্রিস্টীয় কাবাব না হয়ে, ইউরোপীয় শিক্ষার আলোটুকু নিয়ে, রাজনারায়ণের ব্রাহ্মধর্মে বিশ্বস্ত মনন ধর্ম সম্বন্ধে উদার মনোভাব পোষণ করছে। একদিকে ভারতীয় আর্য ঋষিদের শ্রদ্ধা দেখাচ্ছেন, আর একদিকে হাফেজের রচনাবলীর প্রতি অনুরক্ত হচ্ছেন, আবার মাদাম গেঁও তাঁকে টানছেন।
১৮৬৬-তে রাজনারায়ণ ইংরাজিতে জাতীয় গৌরবেচ্ছা সঞ্চারণী সভার অনুষ্ঠানপত্রে লিখলেন –
‘হিন্দু ব্যায়াম, হিন্দু সঙ্গীত, হিন্দু চিকিৎসাবিদ্যা এবং সংস্কৃত ও বাঙ্গালা ভাষার অনুশীলন, যত পারা যায় বাঙ্গালা শব্দ ব্যবহার করিয়া আমদিগের কথোপকথনের ভাষার বিশুদ্ধতা সম্পাদন, বাঙ্গালা ভাষায় পরস্পর পত্রলেখা এবং বাঙ্গালীর সভাতে বাঙ্গালায় বক্তৃতা করা, সুরাপানাদি বিদেশীয় অনিষ্টকর প্রথা যাহাতে প্রচলিত না হয় তাহার উপায় অবলম্বন করা, হিন্দু শাস্ত্র অবলম্বন করিয়া সমাজ সংস্কার কার্য্য সম্পাদন করা, স্বদেশীয় সুপ্রথা রক্ষা করা, নমস্কার প্রণামাদি স্বদেশীয় শিষ্টাচার পালন করা, বিদেশীয় রীতিতে পরিচ্ছদ পরিধান ও আহার কার্য্য সম্পাদন পরিত্যাগ করা, দেশীয় ভাষায় নাটকাদি অভিনয় করা ইত্যাদি বিবিধ বিষয় আলোচিত হয়।‘
সে অনুষ্ঠানপত্র প্রকাশিত হলো দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আর্থিক সাহয্যে প্রকাশিত ন্যাশানাল পেপারে, যে পত্রিকার সম্পাদক নবগোপাল মিত্র। সে অনুষ্ঠানপত্র আলোড়িত করল নবগোপালকে। নবগোপালের হাত ধরে শুরু হলো এক নতুন যুগ- হিন্দু মেলার যুগ। সেই সূত্র ধরে সংগঠিত হলো বাংর ব্যায়ামচর্চা। থেমে রইল না সেখানে। নবগোপালের হাত ধরে বাঙালি পেল প্রথম বাঙ্গালীর সার্কাস- নবগোপাল মিত্রের ‘ন্যাশনাল সার্কাস’।
(ক্রমশ)
