রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ১২। অনুবাদে অর্ণব রায়
দ্বিতীয় চিঠি

মূলনাথের বাগান
মূলনাথ, জানুয়ারী ১৫
আমি ইতিমধ্যেই বলেছি, এখানে যখন আমি প্রথম আসি, আমি সুখসাগর হাউসে রাত কাটিয়েছিলাম। আমার বাকী যাত্রাটা ডাক পাল্কীতে করে হয়েছিল। ডাক পাল্কীতে করে যাতায়াত করাটা যতটা মনে হয়, তার চেয়ে কিন্তু কম ক্লান্তিকর। বিশেষ করে যাদের শরীরস্বাস্থ্য মজবুত আছে। কেননা এরকম অনেক পরিস্থিতি আসে, হয়ত শীতকাল হল বা সকাল বা বিকেল বা কোনও ছায়াময় স্থান পাওয়া গেল, যাত্রী পাল্কী থেকে নেমে বেশ খানিকটা হেঁটে নিজের হাত পা সচল করে নিতে পারে, একটানা বসে থাকার ক্লান্তিটাও দূর করতে পারে। যেমন আমি করেছিলাম আর কি।
সকাল সকাল গ্রাম থেকে পাল্কী বেহারা জোগাড় করে তাদের কাজে লাগিয়ে দেওয়া গেল। আমার মালপত্র আগেই কুলিদের দিয়ে বাইশ মাইল দূরের মূলনাথ হাউসের দিকে রওনা করে দেওয়া হয়েছে। তাদের দায়িত্বে আছে একজন বরকন্দাজ। এই বরকন্দাজ সাধারণত গ্রামের একজন ডাকাবুকো ও বিশ্বাসী লোক হয়, যাকে ব্যাক্তিগত দারোয়ান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তারা কখনও কোনও এলাকা পাহারা দেয় বা রাতে কাউকে কোথাও যেতে হলে হাতে একটা বল্লম বা বাঁশের লাঠি বা কখনও কখনও মনে হলে ঢাল তলোয়ার হাতে সঙ্গে যায়। ভোর চারটের একটু পরেই চা আর টোস্ট খেয়ে চাঙ্গা হয়ে মিঃ এইচ— আর তার সহকারীর সঙ্গে আমি ঘোড়ার পিঠে চড়ে রওনা দিলাম। গন্তব্য পাঁচ মাইল দূরে আমেদপুর বলে একটা জায়গা। সেখানে খুব সকালে আমার পাল্কী পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে পাল্কী সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এমন সুন্দর সকালে ঘোড়ার পিঠের থেকে নেমে পাল্কীর ভেতরে ঢোকা, একটা মুক্ত প্রাণের পক্ষে জেলে ঢোকারই শামিল। তাই আমি আমার বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে পায়ে হেঁটেই রওনা দিলাম। পেছনে আমার পাল্কী আর অন্ততঃ জনা পনেরো লোকের লম্বা লাইন। আমি আমার লোকেদের সাথে আরও পাঁচ মাইল পথ হাঁটলাম। চারপাশে বাংলার বিস্তীর্ণ চষা সমতল ভূমি দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। আমি এর আগে কোথাও একসাথে এত খেজুরগাছ হতে দেখি নি। কোথাও একটা নারকেল গাছ বা একটা তাল গাছের দেখা নেই, শুধুমাত্র খেজুরগাছ। অবশ্যই বেঁটেখাটো, যেন বাড়বৃদ্ধি বাধা পেয়ে থেমে গেছে, চারিদিকে শুধুই খেজুরগাছ!
প্রচন্ড সূর্যের তাপ আর সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটার জন্য আমি একসাথে বেশী পথ হাঁটতে পারছিলাম না। বিশেষ করে বাকী যাত্রাপথটা তো আমি মাইলখানেকের বেশী হাঁটতেই পারিনি। কিন্তু আমার সঙ্গের লোকেরা একবার মাত্র বিশ্রাম নিল! বেলিয়া নামের একটা গ্রামে। অসামান্য সুন্দর একটা বটগাছের ছায়ায়। এখানে আমাদের যিনি আপ্যায়ন করছিলেন, তিনিই এই গাছটাকে দেখাশোনা করে রক্ষা করে বড়ো করেছেন। সত্যিই, আমাদের অনারেবল কোম্পানির বোটানিকাল গার্ডেন ছাড়া এই একটিই ছবির মত সুন্দর বটগাছ আমি ভারতবর্ষে দেখেছি।
যাত্রাপথ যত ফুরিয়ে আসতে থাকল, আমার পাল্কী বেহারাদের গতি তত বাড়তে থাকল। ফলে বেলা দুটো বাজার একটু পরেই আমি দূরে একটা ছোট্ট সবুজ রঙের কুঁড়েঘরের মত বাসস্থান দেখতে পেলাম। আমাকে জানানো হল আমরা মূলনাথ পৌঁছে গেছি। দেখা গেল ওই ছোট্ট সবুজ কুঁড়েঘরটা আসলে মূলনাথ হাউসের প্রবেশপথের অনেকটা আগে মাঠের মধ্যে একটা দরজা। (ছবি পৃঃ ৩২) সেই দরজার কাছে পৌঁছোতে, আর চোখের সামনে থেকে গাছপালার আড়াল সরে যেতে, মূলনাথ হাউস তার পূর্ণ সৌন্দর্য্য নিয়ে আমার চোখের সামনে এসে দাঁড়াল। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। মূলনাথ হাউস দেখে আমার পুরোনো ইংল্যান্ডের প্রাসাদগুলোর কথা মনে পড়ছিল। ইংল্যান্ডের যে সমস্ত শহরতলির দিকে উচ্চবংশের লোকজন বসবাস করে, সে সমস্ত জায়গায় অবশ্য হামেশাই এই ধরণের বড় বড় বাড়ি দেখা যায়।

প্রবেশপথের লজ
অবশ্যই আমার ওজনের জন্য হাঁটতে গিয়ে আমি খানিকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তবু আমার ভালো লাগছিল যে বেচারা বেহারাগুলো আমাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল। আর তারপর যখন গাড়িবারান্দা থেকে চওড়া সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলাম, আমাকে এমন একটা বাসস্থান স্বাগত জানালো যার ভেতরের সৌন্দর্য্য, আসবাব সাজানোর পারিপাট্য আর সুখসুবিধা তার বাইরের জবরদস্ত চেহারার সঙ্গে একেবারে মানানসই। নীচের তলা পুরোটা ধূসর মার্বেল পাথরে বাঁধানো। তার ওপর ভারী কার্পেট দিয়ে মোড়া। এবং গোটা বাড়ি এমন সব সুন্দর আর রূচিপূর্ণ জিনিসপত্রে সাজানো যে আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলাম, মূলনাথ ম্যানসন থেকে আমি পরবর্তীতে ঠিক কী আশা করতে পারি।
সময়ের চঞ্চলা স্বভাব বাড়িখানার বহিরঙ্গে ইদানিং কিছু অনাকাঙ্খিত এমনকি আফশোস করার মত পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু তার অন্তরাত্মায় কোনও পরিবর্তন আসেনি। মার্জিত ও সূক্ষ্ম রুচি সম্পদের প্রাচুর্য্যের ওপর নির্ভর করে না। রুচির প্রকাশ ধনীর প্রাসাদে যেমন দেখা যেতে পারে, গরীবের কুটিরেও দেখা যেতে পারে। তার, আজ মূলনাথ হাউসে দামী জিনিসপত্রের প্রাচুর্য্যের কিছু অভাব হয়ত ঘটেছে, কিন্তু সৌন্দর্য্য ও আরামের প্রয়োজনীয় উপকরণের কোনও কমতি ঘটেছে বলে আমার মনে হয়নি। মূলনাথের মাথার সৌন্দর্য্যের মুকুট থেকে একটি পালকও খসে পড়েনি।
মূলনাথ হাউস আর তার আশেপাশের মাঠঘাট নদীয়া জেলার মধ্যে, আরও ভালো করে বলতে গেলে কৃষ্ণনগরের মধ্যে পড়ছে। ইছামতীর দক্ষিণ পাড়ে। ইছামতী গঙ্গার অনেকগুলি ছোট উপনদীর মধ্যে একটি। আরও খানিকটা এগিয়ে সুন্দরবনের কাছে অনেকগুলো নদীমুখের একটি হয়ে সমুদ্রে মিশেছে। অন্যদিকে এর জল কৃষ্ণগঞ্জ বলে একটি জায়গায় মাথাভাঙার জলের সাথে মিশেছে। শেষোক্ত নদীটি তার মুখের কাছে চূর্ণি নামে পরিচিত। এই নদী শিবপুরের কাছে এসে হুগলী নদীতে মিশেছে। জায়গাটা সুখসাগর থেকে মোটামুটি আট মাইল উজানের দিকে।
যদিও একটা সরলরেখা ধরে এগোলে জায়গাটার দূরত্ব কলকাতা থেকে পঞ্চাশ মাইলের বেশী হবে না, কিন্তু তার চেহারা চরিত্র এমনই, দেখে মনে হবে যেন কত দূরের কোনও রাজ্য! সত্যি বলতে কি, জায়গাটায় যদি দেশীয় চাকরবাকররা না ঘুরে বেড়াত তাহলে এখানকার দৃশ্যকে ইউরোপের কোনও জায়গার দৃশ্য ভেবে বসতে বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না। ব্যাপারটা আরও সম্ভব হয়েছে মিঃ এফ—এর জন্য, যিনি এদিক ওদিক দু চারটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তালগাছ ছাড়া বাড়ির আশেপাশের জায়গা থেকে সব গাছ সরিয়ে দিয়েছেন।
আর বাড়িটার কথা যদি বলতে হয়, তাহলে বলব আমার আঁকা পেনসিল স্কেচটা দেখে তোমরা বাড়ির বাইরেটা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাবে [1]। এই বাইরের দিকটা চওড়ায় পুরো একশো দশ ফিট। সম্ভবতঃ পেছনের দিকটারও একই মাপ। বাড়ির ভেতরে আঠারোটা অ্যাপার্টমেন্ট। এছাড়াও বাথরুম আর ড্রেসিং রুম তো রয়েইছে। বাড়ির নীচের তলায় ছাদের তলায় খিলানগুলি বিশাল বিশাল। পুরোপুরি শুকনো আর হাওয়া বাতাস খেলে। কোনও কোনওটা এতই বড় যে সেগুলোকে সেলারে বদলে দেওয়া হয়েছে। একটার তলায় তো ফায়ারপ্লেসও রয়েছে। এতে করে ঘরের কাজের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন গরম জল পেতে বারবার দূরের রান্নাঘরে দৌড়োতে হয় না।
বাড়ির সামনে একটা পাথরে বাঁধানো বৃত্তাকার পথ পার করেই একটা অপূর্ব সুন্দর পার্ক। সেখানে একটা সুর্যঘড়ির কিছু অংশ আর অনেক বসার জায়গা মিলে জায়গাটাকে একটা সম্পূর্ণ আর পরিচ্ছন্ন রূপ দিয়েছে। জায়গাও বিশাল। সত্তর একরের ওপর জমি। এর মধ্যে কুড়ি তিরিশটা হরিণ শিঙওয়ালা আর দাঁতনখওয়ালা জন্তুদের নাগালের বাইরে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়। এর মধ্যে একটি হরিণশাবক আমাদের গৃহকর্ত্রীর বিশেষ প্রিয়। এটি নির্ভয়ে বাড়ির যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায় আর মাঝে মাঝে বাইরে গিয়ে তার বন্ধুবান্ধবদের সাথে দেখা করে আসে। বাড়ির চৌহদ্দিতে বড় বড় ট্যাঙ্ক রয়েছে। টার্কিপাখি, রাজহাঁস, পাতিহাঁস, সব এখানে জলের মধ্যে মজা করে খেলা করে। চারিদিকে বাবুলের মত ছোট ছোট গাছ রয়েছে। হরিণগুলি এইসব গাছগুলির তলায় রাতের বেলা বিশ্রাম নেয় আর দিনের বেলা আর ছায়ায় বসে দুপুরের প্রখর তাপ থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। এছাড়া বাগানে বিশাল বিশাল তেঁতুল আর ম্যাগনোলিয়া গাছে ছাওয়া চওড়া চওড়া রাস্তা রয়েছে। মাঝে মাঝে রয়েছে বাঁশঝাড়। আর এই রাস্তাগুলো বাড়ির চত্তরের বিভিন্ন ছোট ছোট কুটির বা লজ বা গেট বা বাইরের দিকের অফিস থেকে বেরিয়ে এসে বাগানটাকে অনেক ভাগে ভাগ করে এগিয়ে গেছে।
বাড়ির এলাকার উত্তরদিকে পার্ক আর বাগানের জমিটুকু বাদ দিলে একটা অসাধারণ সুন্দর চওড়া পরিস্কার জলের হ্রদ ক্রমে সরু থেকে চওড়া হয়ে ঘোড়ার খুরের আকারে ওপরের দিকে প্রসারিত হয়ে গেছে। একটা দৃশ্যকে সুন্দর আর পরিপূর্ণ বানাতে একজন যা কিছু কল্পনা করতে পারে, এই হ্রদটি এখানে থাকায় তার সবটা পূরণ হয়েছে। এই হ্রদটার গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে বাংলার নদ-নদীর একটি উল্লেখযোগ্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে— এখানকার নদীগুলি হামেশাই তাদের গতিপথ পালটায়। এই হ্রদটি আসলে ইছামতী নদীর একটি বাঁক ছিল। যখন বাঁকটা তার চুড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, তখন জলের তোড়ে নদী একটি সংক্ষিপ্ততর গতিপথ বের করে নেয় এবং ক্রমে এই নতুন গতিপথটি গভীরতর খাতে পরিণত হয়। এদিকে পুরোনো বাঁকটির দুই মুখে মাটি জমতে থাকে এবং এই দুই মুখ শুকিয়ে আসে। শেষে এই পরিত্যক্ত বাঁকটি একটি হ্রদের চেহারা নেয়। দেশীয় লোকেরা এই ধরণের হ্রদকে আলাদা নাম দিয়ে সাধারণ হ্রদের থেকে আলাদা করে থাকে। প্রথমটিকে তারা বলে বাঁওড়, আর দ্বিতীয়টিকে তারা বলে বিল । মূলনাথ আর তার চারপাশের এলাকার মানচিত্র আমি আমার প্রথম চিঠির সঙ্গে দিয়েছি, (সার্ভে বিভাগের মেজর আর স্মিথ দয়া করে আমাকে মানচিত্রটি দিয়েছেন), যদি সেই মানচিত্রটি ভালো করে দেখো, তাহলে দেখতে পাবে এই রকম আকারের বেশ কিছু হ্রদ আশেপাশে ছড়িয়ে আছে। এই হ্রদগুলির উৎপত্তি একই ভাবে হয়েছে। এবং এগুলি এখানকার নদীগুলির চঞ্চলা চরিত্রের কথাই বলে।

মূলনাথ ও তার পারিপার্শ্বিকের মানচিত্র
লেখকের টীকা
[1] প্রথম চিঠির মাথার ওপর আঁকা ছবি দ্রষ্টব্য।
(ক্রমশ)
