রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ১১। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

আজ আর এগোনো যাবে না। খুব দেরী হয়ে গেছে। আমি এখানে এই বাড়িতে রাতের মত আশ্রয় নিয়ে নিই।  যদিও এখানে আমাকে স্বাগত জানানোর জন্য কোনও গৃহকর্তা নেই, কিন্তু এখানে চাকরবারকরা আছে। তারা সর্বদা সজাগ থাকে যাতে হেডকোয়ার্টার্স থেকে আসা তার মালিকদের বা তার বন্ধুদের কোনও অসুবিধা না হয়। দিনে রাতে যখনই তাদের ডাকা যাক, তারা হাজির হয় এবং সামান্য থেকে সামান্যতম প্রয়োজনও মেটানোর জন্য তাদের তৎপরতা দেখবার মত হয়। একখানা গোটাগুটি বাড়ি রয়েছে, সেখানে আসবাবপত্র সব সাজানো গোছানো, অথচ কোনও গৃহকর্তা নেই, ব্যাপারটা রহস্যজনক মনে হতে পারে। কিন্তু যখন তোমরা ফ্যাক্টরি আর আউট ফ্যাক্টরি সম্পর্কে আরও জানতে পারবে, তখন ব্যাপারটা আর রহস্য বলে মনে হবে না। আপাতত এটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে সুখসাগরকে একটি আউট-ফ্যাক্টরি বলা যায়। এখানে সর্বক্ষণের জন্য একজন গৃহকর্তা থাকার কোনও দরকার নেই। একজন গোমস্তা বা স্থানীয় ম্যানেজার থাকলেই কাজ চলে যায়। এই গোমস্তার বাড়ি কারখানা চত্তরেই কোথাও একটা হয়। যদিও আমি যখন এখানে প্রথম আসি, তখন পরিস্থিতি এরকম ছিল না। আমি সেবারে মিঃ ও মিসেস এইচ.-এর আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলাম। আর আমি তার জন্য চিরকৃতজ্ঞ থাকব। আমি সেবারে সমস্ত রকম আরামের উপকরণ পেয়েছিলাম। বাড়ির পরিবেশও ছিল অত্যন্ত আনন্দময়। তার ওপর ছিল শান্ত মফঃস্বল, বিশুদ্ধ বাতাস আর জায়গাটার গ্রাম্য পরিবেশ।

সুখসাগর হাউস চারপাশে খুব যত্নে বানানো বাগানের মধ্যে একটা ছোটখাটো ছিমছাম আরামদায়ক বাড়ি। এর চারপাশে উঁচু উঁচু গাছ। আর এর গা ঘেঁসে একখানা ছোট্ট গ্রাম। তাতে মূলতঃ জেলেদের বাস। দেশের অভ্যন্তরে যে সব স্টিমারগুলো যাতায়াত করে, সেগুলোতে মাঝিমাল্লার দরকার পড়লে তারা এই গ্রামের জেলেদের মধ্যে থেকেই লোক নিয়ে থাকে।

এখানে বলে রাখি, সুখসাগরের কিন্তু একটা ঐতিহাসিক গুরুত্বও আছে। এখানকার আসল বাড়িটা বানিয়েছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস, বাগানবাড়ি হিসেবে। তার নিজের ও আরও তিনজন অসামরিক ব্যাক্তির থাকার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল এখানে একখানা আদত বিলিতি বাগান বানাবেন। সেখানে কফি ও ওই ধরণের অন্যান্য জিনিসপত্তর উৎপাদন করা যায় কি না তা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে। তাতে করে জমির ক্ষমতারও একটা যাচাই হয়ে যাবে। সত্যি কথা বলতে কি বাংলার মাটিতে, চব্বিশ পরগনা জেলার বাইরে সরকার অনুমোদিত কোনও ইউরোপীয় মানুষের প্রথম সম্পত্তি ছিল এই বাড়ি আর তার সংলগ্ন জমি। এই সম্পত্তি পরে হাতবদল হয়ে পৌঁছয় কলকাতার বিখ্যাত ধনী পর্তুগীজ ব্যাবসায়ী জোসেফ ব্যারেটোর হাতে। তিনি তার জীবৎকালে রাজার মত জীবনযাপন করতেন। তার বাড়ির এলাকায় অন্যান্য জিনিসপত্তরের সাথে সাথে তিনি একখানা রোমান ক্যাথলিক চ্যাপেলও স্থাপন করেছিলেন। সেখানে প্রার্থনা ও অন্যান্য কাজকর্ম করার জন্য যাজকও আনিয়েছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না সেই যাজক শুধুমাত্র তার পরিবারের হয়েই কাজ করতেন। কিন্তু উদ্দেশ্য ভালো হলেও সবকিছুর পরিণতি ভালো হয় না। মিঃ ব্যারেটোর পরে বাড়িটি যার হাতে আসে, তিনি একজন স্পেনীয়, নাম মিঃ লরালেট্টা। তিনি তার আতিথেয়তা অ-খেলোয়ারসুলভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি এই চ্যাপেলটাকে পরিবর্তন করে মাহুতদের (হাতির চালক) বাসস্থান করে দেন। তার সাথে এখানে লড়াকু মোরগগুলোও থাকত।

নদীর ধ্বংসলীলা এ সমস্ত কিছুর চিহ্ন আজ মুছে দিয়েছে। সেই উন্নতির শিখর আর সেখান থেকে পতন, কোনও কিছুই আজ আর দেখতে পাওয়া যাবে না। আসল যে বাড়িটা নদীর তীর থেকে দু-তিনশ ইয়ার্ড জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে ছিল, শুধু সমস্তটা নিশ্চিহ্নই হয়ে যায়নি, নদীটা পুরো দেড় মাইল দক্ষিণ পূর্বে সরে, যেখানে বাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল, তার ওপর দিয়ে বইতে লেগেছে। সত্যিই, গত দশ বছরে আমি শিখলাম কীভাবে একটা নদী তার খাত সম্পুর্ণ পরিবর্তন করে দুই মাইল দক্ষিণ পূর্ব দিয়ে বইতে পারে। [1]

এবার মূলনাথে ফিরে আসার সময় হয়েছে। আর আমারও মনে হচ্ছে একটা চিঠির পক্ষে একটু বেশীই বিষয়বস্তু তোমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাকী কথা আর একটা চিঠির জন্য তোলা থাক।

 

সুখসাগর হাউসের ধ্বংসাবশেষ

 

লেখকের টীকা

[1]  মাত্র কয়েকমাস আগে জায়গাটায় গেছিলাম। গিয়ে দেখি দৃশ্য বদলে গেছে! যে বাড়ি নদী থেকে প্রায় পঞ্চাশ ইয়ার্ড ভেতরে ছিল, তার মাত্র কয়েকটা দেওয়ালের ধ্বংসাবশেষ নদীর ওপর ঝুলে আছে। সুখসাগর হাউসের অবশিষ্ট বলতে ওটুকুই রয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, বাড়িটার পরিণতি তার পূর্বসূরীদের মতই হতে চলেছে।

১৮৫৮– নদী এখন দক্ষিণ পূর্ব দিকে আরও আধ মাইল মতন সরে গিয়ে বইছে। দেখে মনে হচ্ছে হুগলী নদীর খাতটাই বদলে যাবে।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply