অকূলের কাল। পর্ব ৪৭। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

(গত পর্বের পর)

কোথাকার জল কোথায় গড়ায়

হাইকোর্টে মামলার দিন পড়েছে ২৩ মার্চ, শুক্রবার। সেই খবর ছড়িয়ে গেছে ক্ষিতির ঘনিষ্ঠ মহলে। সকাল থেকেই সাজো সাজো রব। নরজিত দিনের ডিউটি বদলে রাতের ডিউটি নিয়েছে। অমিয় ছুটি নিয়েছে অফিসে। অশোক নন্দীগ্রাম থেকে এসে পড়বে দুপুরের আগেই। হস্টেলের বন্ধুদের মধ্যে অনুপম আর দিনু হাইকোর্টে পৌঁছে যাবে বারোটার মধ্যে। সাড়ে বারোটায় তার কেস ওঠার কথা। সত্যকিঙ্কর জলের মতো পরিষ্কার করে দিয়েছে কী হতে চলেছে আজ কোর্টে। জজসাহেব দোলনকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেন তাকে জোর করে আটকে রাখা হয়েছে কি-না। দোলন যেই বলবে, সে স্বামীর কাছে যেতে চায়, তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাপের বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছে; অমনি জজসাহেব অর্ডার করে দেবেন তাকে স্বামীর হাতে তুলে দেওয়া হোক। হেবিয়াস করপাস। এ মামলা সাধারণত সরকারের বিরুদ্ধে হয় যখন কারোর সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করে আটকে রাখে। এ পর্যন্ত একটাই মাত্র মামলা হয়েছিল মাদ্রাজ হাইকোর্টে, যখন একটা বাচ্চাকে মামাবাড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল তার বাবার কাছ থেকে। বউকে আটকে রাখা কেস এই প্রথম হতে চলেছে। রায় বেরোলেই হইচই পড়ে যাবে, কাগজে বেরোবে। ক্ষিতি একদিনেই বিখ্যাত হয়ে যাবে।

সে তো না হয় হবে কিন্তু সে বউ নিয়ে থাকবে কোথায়? নরজিত বলল, – চিন্তা মাত করো মামা। আমি আছি কী করতে! আমার কোয়ার্টার ছেড়ে দেব মামিকে। কোর্ট থেকে সোজা কালীঘাটে। সেখানে একজন পুরুত ভাড়া করে মন্ত্র পড়ে আর মালাবদল করে বিয়ে দিয়ে এখানেই নিয়ে এসে তুলব মামিকে। আমার এই খাটেই হবে তোমাদের ফুলশয্যা।

হুম। ক্ষিতি ভাবল, বউ নিয়েই যখন ফিরতে হবে, কোর্টে আজ ধুতি-পাঞ্জাবি পরে যাওয়া উচিত। কোথায় পাওয়া যাবে ধুতি-পাঞ্জাবি? নরজিত তার টিনের ট্রাঙ্ক হাতড়ে বের করল ধুতি আর পাঞ্জাবি। ধুতিটা একটু হলদেটে হয়েছে, পাঞ্জাবিটাও ঝুলে বেশ খাটো, ক্ষিতির কোমরের নীচে খুব একটা নামেনি।  তা হোক, এতেই চালিয়ে নিতে হবে।

যথাসময়ে দলবলসহ বরবেশে ক্ষিতি হাজির হলো কোর্টে। যে-রুমে তার মামলা উঠবে, সেই রুমে একটা মামলার শুনানি শেষ হয়েছে, এর পরেই উঠবে ক্ষিতির মামলা। মনসুর সাহেব মিস মোহেকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়েছেন। বললেন, – ওরা বাঘা বাঘা দুজন অ্যাডভোকেট দিয়েছে। সহজে ছাড়বে না।

দোলনকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে বড়, মেজ – দুই ভাই মিলে। জজসাহেব এখনও হাজির হননি  চেয়ারে। ওদের অ্যাডভোকেট কী একটা বলতে ওর বড়দা দোলনকে ডেকে নিয়ে জজের মঞ্চের একপাশে কাঠ দিয়ে ঘেরা উঁচু জায়গায় নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিল। সত্যকিঙ্কর বলল, – ওটা সাক্ষীর কাঠগড়া। জজসাহেব জিজ্ঞেস করলে কী বলতে হবে, এই সময় একবার ওকে ভালো করে সব বলে দিয়ে এস।

কতদিন পরে দোলনকে সে দেখতে পাচ্ছে। কচি কলাপাতা রঙের একটা সিল্কের শাড়ি পরেছে সে, শ্যাম্পু করা চুল ফ্যানের হাওয়ায় উড়ে উড়ে তার নাকে-মুখে পড়ছে। কী সুন্দর যে লাগছে দেখতে! বুকের ভেতর উথালপাতাল ক্ষিতির। সে কাছে গিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে, বাঘের মতো দৌড়ে এল ওর বড়দা – এতো সাহস তোমার! কোর্টের মধ্যে এসেও কথা বলছ ওর সঙ্গে!

কিছুই বলা হলো না। ফিরে এসে মনসুর সাহেবের কাছে এসে অভিযোগ করল ক্ষিতি, – কথা বলছিলাম বলে ধমক দিল আমাকে।

মনসুর সাহেব বললেন, – বললি না কেন কথা বলব বলেই তো পয়াসা খরচ করে কেস করেছি!

উলটো দিকে তাকিয়ে ক্ষিতি দেখে, জজসাহেব এসে চেয়ারে বসেছেন। ঘরে উপস্থিত সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। তার মধ্যেই চোখমুখ লাল করে পঞ্চু বসাক ওর পোষা উকিলটাকে ধমক দিচ্ছে। বলছে, – মেয়ের সঙ্গে কথা বলছিল – এত বড় সাহস! আপনি ঘোষ সাহেবকে বলুন জজসাহেবকে এটা জানাতে। ঘোষ সাহেব মানে টি কে ঘোষ, মনসুর সাহেব যাঁদের বাঘা অ্যাডভোকেট বলছিলেন, তাঁদের একজন। উকিল বলছে, – এটা জানানোর দরকার কী? না জানানোই ভালো।

পঞ্চু বসাক বলছে, – আপনাকে যা বলছি সেটাই করবেন। তাড়া তাড়া টাকা খাচ্ছেন কি এমনি এমনি!

মিইয়ে গেলেন সিড়িঙ্গে-মার্কা উকিলবাবুটি। ঘোষ সাহেব তখন বক্তব্য রাখছেন – ধর্মাবতার, আমার ক্লায়েন্ট স্বীকার করছে তার বোন সাবালিকা; স্বীকার করছে সে বাদীর কাছে যেতে চায়। কিন্তু হুজুর, বাদী এখনও ছাত্র, আদ্যন্ত বেকার। নিজের খরচ চালায় বাবার পাঠানো টাকায়। এক গ্রাম্য, গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে সে। সেই বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ক্লায়েন্টের কন্যাসম, আদরযত্ন ও স্বাচ্ছন্দ্যে মানুষ হওয়া বোনটি গেলে নিচু জাতের মেয়ে হিসাবে তাকে মেইড সারভেন্ট – বাড়ির ঝি-চাকরের বেশি মর্যাদা দেওয়া হবে না। সে চাইছে বলেই কি তাকে আদালত আত্মহত্যা করার দিকে এগিয়ে দেবে ধর্মাবতার!

ঘোষ সাহেব একটু থামতেই পঞ্চু বসাকের তাড়া খেয়ে সেই উকিল নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে বলতে গেলেন, – হুজুর, মেয়ের সঙ্গে কথা বলছিল বাদী –

জজসাহেব হাতের ইঙ্গিতে তাঁকে বসিয়ে দিলেন। ঘোষ সাহেব বিরক্ত চোখে নিজপক্ষের উকিলের দিকে তাকিয়ে আবার শুরু করলেন, — আমার ক্লায়েন্ট তাঁর মাতৃপিতৃহারা আদরের বোনটির সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের সমাজ এবং আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এক পাত্রের সঙ্গে বিবাহের সম্বন্ধ করে রেখেছে ধর্মাবতার। সেটা বানচাল করার জন্যই বাদী এরকম একটা সাজানো মামলা নিয়ে হাজির হয়েছে।  এই মামলা করার অধিকারই নেই তার। আমরা তার স্ট্যাটাস চ্যালেঞ্জ করছি ধর্মাবতার। এফিডেভিট-ইন-অপোজিসন দাখিল করার জন্য এক সপ্তাহ সময় আমার মক্কেলকে দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করছি।

মনসুর সাহেব সামান্যই সওয়াল করলেন। বললেন, – আমার মক্কেলের স্ত্রীর উপরে অত্যাচার হচ্ছে হুজুর। এই মামলার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত তাকে তার দাদার কাস্টডি থেকে সরিয়ে কোনো তৃতীয় পক্ষের কাস্টডিতে রাখার আদেশ দিতে আজ্ঞা করুন। এ ব্যাপারে আদালতে হাজির আমার মক্কেলের স্ত্রীর বক্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক। তার কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিক আদালত।

জজসাহেব দোলনের দিকে তাকালেন। কিন্তু তাকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই বললেন, – দেখে মনে হচ্ছে না মেয়ের উপর সেরকম কিছু নির্যাতন হচ্ছে। এ-ব্যাপারে আদালত খেয়াল রাখবে। আপাতত কাস্টডি পরিবর্তনের দরকার নেই। বিবাদী পক্ষকে পাল্টা এফিডেভিট দাখিল করার জন্য এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হলো। শুনানির পরবর্তী তারিখ ১৯ এপ্রিল।

জজসাহেব উঠে যেতেই হতাশ ক্ষিতি মনসুর সাহেবের কাছে ছুটে গেল। সত্যকিঙ্কর যা বলেছিল কিছুই তো হলো না। মনসুর সাহেব বললেন, – কী ভেবেছিলি – এক দিনেই মামলা শেষ হয়ে যাবে? বউয়ের গলায় মালা ঝুলিয়ে ঘরে নিয়ে চলে যাবি! ওরা তোর স্ট্যাটাস-টাই চ্যালেঞ্জ করছে। মানে তুই যে মেয়ের স্বামী সেটাই মানছে না। এখন আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে তোদের বিয়েটা সত্যি সত্যিই ঘটেছে। সাক্ষীসাবুদ তৈরি রাখতে হবে।

সমস্ত উদ্দীপনা কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে ক্ষিতির। যা মিথ্যে তাকে কি সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব! একে একে সবাই কোর্টরুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সবার আগে দোলনকে নিয়ে তার দুই দাদা চলে গেছে। যাওয়ার আগে ওর বড়দা ক্ষিতিকে শেষবারের মতো ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে বিঁধে দিয়ে গেছে। এখন সত্যকিঙ্করের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার। আইন নিয়ে পড়ছে, মামলা নিয়ে এতো কম জানে সে! না কি অলীক স্বপ্ন দেখিয়ে মজা নেওয়া তার অভ্যেস?

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply