সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ১৩। বরুণদেব
নদী, পাহাড়, মনোরম তটরেখা নিয়ে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের থালাসেরি প্রাচীন যুগ থেকে মালাবার উপকূলে মশলা বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই রোমান ও গ্রীক জাহাজ ভিড়ত গোলমরিচ,এলাচ, নানা মশলাপাতির সন্ধানে। শাতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরবের মুসলিমরা, চিনারা, ইহুদিরা এসেছে মশলার খোঁজে।
ভারতীয় সমুদ্রে পর্তুগীজ আগ্রাসন শুরু হলে এ অঞ্চল পর্তুগীজ দখলে আসে। থালাসেরি থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে কান্নুরে মিলিটারি ব্যারাক তৈরী করে পর্তুগীজরা। ডাচ ঢেউয়ে সে আধিপত্য তছনছ হয়ে গেলে এ অঞ্চল ডাচদের হাতে চলে যায়। ডাচদের থেকে ফরাসীদের হাতে, থালাসেরিতে ফরাসীরা তৈরী করে মিলিটারি ক্যাম্প। ব্রিটিশরা এসে বাণিজ্যকুঠি তৈরী করল। থালাসেরি দুর্গের দখল নিল। টিপু সুলতানের সঙ্গে শ্রীরঙ্গপত্তনমের যুদ্ধের পর থালাসেরি ব্রিটিশ উত্তর মালাবারের রাজধানী হয়ে গেল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে কফি, দারুচিনি, গোলমরিচ,জায়ফলের চাষবাস করল।
এক প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ার সুবাদে আরব ও ইউরোপের সঙ্গে পণ্যের সাথে সাথে সংস্কৃতির আদান প্রদানে সমৃদ্ধ এ নগর। থালাসেরির রান্নাঘর আরবীয় -ভারতীয়—পারসীক- ইউরোপীয় রন্ধন শৈলীর মিশ্রণ। থালাসেরির বিরিয়ানি, থালাসেরির গোলমরিচ, এসো বসো আহারেতে সমাদৃত। এই শহর ভারতকে দিয়েছিল তিন ‘সি’- ক্রিকেট, কেক ও সার্কাস। শ্রীরঙ্গপত্তনমের যুদ্ধে টিপু সুলতানকে হারানোর পর মালাবারের প্রিন্সলি স্টেট কোট্টায়ামের পাঝাসি রাজা কেরালা ভার্মার বিদ্রোহ দমন করতে থালাসেরি এসে পৌঁছলেন মেজর জেনারেল আর্থার ওয়েলেসলি। ওয়েলেসলির হাত থেকে ভারতের প্রথম ক্রিকেট বলটি পড়ে থালাসেরিতে। প্রথম দিকে ক্রিকেট খেলার অধিকার ছিল না নেটিভদের। ভারতের প্রথম বেকারিও এই শহরেই, মামবাল্লি বাপুর মামবাল্লি’স রয়্যাল বিস্কিট ফ্যাক্টরি। আর তৃতীয় সি- সার্কাস, বিষ্ণুপন্থ ছত্রের ঘোড়ার পিঠে জন্ম নেওয়া ভারতীয় সার্কাসের লালন পালন খ্যাতি ও সমৃদ্ধির মূলে থালাসেরির কীলেরি কুনহিকান্নান।
বিদেশ সফর শেষ করে দেশে ফিরে এসে ১৮৮৮ সালে গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস তাঁবু ফেলল থালাসেরিতে। শহরে ব্রিটিশ আধিকারিকদের একের পর এক কার্যালয়। শ’য়ে শ’য়ে ইউরোপীয় সরকারী অফিসার, ব্যবসায়ীদের বাস। স্থানীয়দের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষার হার বেশ ভাল। কেরালার এই সমৃদ্ধ অঞ্চলকে বিষ্ণুপন্থ ছত্রে তাঁর গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের তাঁবু ফেলার জন্য বেছে নিলেন ।
প্রথম শোতেই দর্শকাসনে হাজির থালাসেরির একটি স্কুলের জিমন্যাস্টিক ইন্সট্রাকটর। বিভোর হয়ে ছত্রের সার্কাসের খেলা দেখতে দেখতে তাঁর মনে হলো, তিনি যেন চোখের সামনে তাঁর স্বপ্নকে সত্যি হতে দেখছেন। ছত্রের সার্কাসই তাঁর কাছে প্রথম সার্কাস নয়, কিছুদিন আগে ‘হিপোড্রোম সার্কাস’ নামে এক ইউরোপীয় সার্কাস দেখেছিলেন মাদ্রাজে। ছত্রের সার্কাসের দর্শকাসনে সেই কয়েক ঘন্টাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, যা তিল তিল করে সার্কাসশিল্পকে ভারতের মাটিতে সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিল। সেই কয়েক ঘণ্টাই এক স্কুলের জিমন্যাস্টিক ইন্সট্রাকটরকে ‘ফাদার অফ কেরালা সার্কাস’ -এ পরিণত হতে কাউন্ট ডাউন ঘোষণা করেছিল।
কীলেরি কুনহিকান্নান (Keeleri Kunhikannan)। জীবনের নানা ওঠাপড়া কীলেরির জীবনে। ১২ই অগস্ট, ১৮৫৫তে থালাসেরির কাছে চিরাক্কারা গ্রামে জন্ম। ছোটো থেকেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। পাঁচ বছর বয়সে ভর্তি হলেন স্কুলে। পড়াশোনায় যত না আগ্রহ, খেলাধুলায় আগ্রহ তার চেয়ে অনেক বেশি। বাড়ির কাছে মার্শাল আর্ট শেখার স্কুল। সেখানকার কলাকৌশল দেখে বাড়িতে নিজে নিজেই সেগুলির অনুশীলন। কয়েক বছর পর ছেড়ে দিলেন স্কুলের পথ। কাজের সন্ধানে বাড়ি ছাড়লেন। কখনো হেঁটে, কখনো গরুর গাড়িতে পৌঁছলেন নিলাম্বুর। অ্যাকাউন্টান্টের কাজ মিলল এক রাবার এস্টেটে । তিন বছর কাটালেন সেখানে। ম্যালেরিয়ার আক্রান্ত হয়ে ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে ধরলেন বাড়ির পথ। থালাসেরিতে ফিরে চিকিৎসা ও শরীর চর্চা করে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন।
সেই সময় এক ইউরোপীয় বায়োস্কোপ কোম্পানি আসে থালাসেরিতে। ম্যাজিক, নৃত্য, জুয়া, নানারকমের শারীরিক কসরত – এক শোভাযাত্রা। সে প্রদর্শনীতে ছিল আয়রন বলের খেলা আর ছিল ভারোত্তোলন। কীলেরির ভালো গেলে গেল খেলা দুটি। বার বার দেখে রপ্ত করলেন কৌশল। সে সময় মালাবারের কোথাও আয়রন বল পাওয়া যেত না। গ্র্যানাইট বোল্ডারকে বলের রূপ দিয়ে চলল তাঁর সাধনা।
কেরালার নিজস্ব মার্শাল আর্ট- কালারিপায়াত্তু বা কালারি (Kalaripayattu)। ট্রেনিং প্রতিষ্ঠানগুলিকে বলা হয় কালারি। পৃথিবীর প্রাচীন মার্শাল আর্টগুলির মধ্যে অন্যতম। একাদশ শতাব্দীতে চেরা ও চোল রাজ্যের মধ্যে যে শতাব্দীব্যাপী যুদ্ধ চলেছিল, যে যুদ্ধের ফলে চেরা রাজ্যের পতন হয়, সে যুদ্ধের সময় নাগরিকদের সামরিক যুদ্ধ প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়। কালারিপায়াত্তু সম্ভবতঃ সেই সময়ের ফসল। মধ্যযুগের শেষে কেরালার প্রতিটি গ্রামের কালারিতে শিশুরা প্রশিক্ষণ নিত। সপ্তদশ শতকে বন্দুক ও কামানের ব্যবহারে, কালারি গুরুত্ব হারাতে থাকে। ১৮০৪ সালে ব্রিটিশ বিদ্রোহে কেরালার এই মার্শাল আর্ট বড়ো ভুমিকা নেয় এবং বিদ্রোহী পাজাসি রাজার মৃত্যুর পর নিষেধাজ্ঞা জারি হয় কালারির ওপর। কিন্তু গোপনে এই চর্চা চলতেই থাকে। ১৯২০-র দিকে পুনরুজ্জীবন পায় এই মার্শাল আর্ট। ব্যায়াম ও শারীরিক তৎপরতার পাশাপাশি শরীর ও মনের নিখুঁত সমন্বয় সাধনের সাধনা এই মার্শাল আর্ট। ছ’ফুট গভীর, একুশ ফুট চওড়া, বিয়াল্লিশ ফুট লম্বা যে ব্যবস্থায় কালারি শেখানো হয়, তা রোমান অয়ম্ফিথিয়েটারের পরিমাপ। ফিলিপ অ্যাস্টলে, আধুনিক সার্কাসের জনক, ১৭৬৭ সালে ইংলন্ডে তাঁর ঘোড়ার খেলার প্রদর্শনীর জন্য এই পরিমাপই ব্যবহার করেছিলেন। জিমন্যাস্টিক্স শেখার জন্য কালারি এক গুরুত্বপূর্ণ মার্শাল আর্ট। এই আর্ট শিখলে অন্যান্য শারীরিক কসরত শেখা সহজ হয়ে যায়।
কীলেরি শিখতে শুরু করলেন এই মার্শাল আর্ট। কীলেরির ভগ্নীপতি ছিলেন সরকারী কর্মচারি। তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হতো। কীলেরি তাঁর সঙ্গে তামিলনাড়ুর থাঞ্জাভুর, মাদুরাই, ত্রিচিনাপল্লীতে ঘুরে ঘুরে পরিচিত হলেন কুস্তির সঙ্গে। মালাবারে কুস্তি চালু ছিল না সেসময়। শিখে নিলেন কুস্তিও। থালাসেরিতে ফিরে শেখাতে লাগলেন। কেরালায় তাঁর উদ্যোগেই চালু হলো কুস্তি। কীলেরি কখনো কোনো মল্লযুদ্ধের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন নি, তবুও তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল থালাসেরিতে। এমন কি ইউরোপিয়ানদের মধ্যেও। সেই সূত্রেই এক সকালে এক ইংরেজ যুবক হাজির তাঁর বাড়ির দরজায়। কীলেরির মা খুব ভয় পেয়ে গেলেন। সে সময় থালাসেরির অফিস কাছারি ব্যবাসায়ীমহলের প্রধানরা ছিলেন সব গোরা সাহেব। নেটিভদের সঙ্গে দেখা করতে হলে ডেকে পাঠাতেন, তাদের বাড়ির দরজায় হাজির হতেন না, সম্মানে লাগত।
এই লম্বা গোরা সাহেবটি একজন কুস্তিগীর। সাহবেটি কীলেরির কথা খুব শুনেছে। সে চায় কীলেরির সঙ্গে একবার মল্লযুদ্ধে নামতে। কীলেরি প্রথমদিকে এড়িয়ে গেলেন, কিন্তু সাহেব নাছোড়, অতএব রাজি হতেই হলো। কীলেরির মা খুব ভয় পেয়ে গেলেন, যদি কিছু অঘটন ঘটে যায়, হাজার হোক ইংরেজরা তো শাসক, ছেলের যদি কোনো বিপদ হয়ে যায়! উঠোনে শাসক আর শাসিতের ডুয়েল, ওদিকে বন্ধ ঘরে ছেলের মঙ্গলের জন্য মায়ের প্রার্থনা। কিছুক্ষণ পরে ছেলের ডাকে মা বাইরে এসে দেখেন সাহেবের করুণ দশা। উঠোনের একপাশে একটা ছোটোখাটো নারকোল গাছ, তার মাথায় সেই সাহেব যুবক। বাড়ি ছাড়ার আগে সে সাহেব কব্জি ডুবিয়ে কীলেরির মায়ের হাতে রান্না খেয়ে গেলেন।
কীলেরি খুব ভালো ক্রিকেট খেলতেন, এতটাই যে সাহেবরা তাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁকে বোলার করে নেয়। থালাসেরির সেই সময়ের ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন খেলাপাগল। বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করতেন। থালাসেরি মিউনিসিপাল মাঠে আয়োজিত খেলাধুলায় বা প্রদর্শনীতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ অবাধ । সে সময় কান্নুরের সেন্ট অ্যাঞ্জেলো দুর্গে ব্রিটিশ মিলিটারি ক্যাম্প ছিল। কয়েকজন এক্সপার্টকে থালাসেরিতে নিয়ে এসে আয়োজন করা হলো হরাইজন্টাল বার, প্যারালাল বার, রোমান রিঙের খেলা। কীলেরিকে খুব টানল এই খেলাগুলি। কিন্তু এইসব খেলার অনুশীলন হতো মিলিটারি ক্যাম্পে, সেখানে নেটিভদের প্রবেশ নিষেধ। থালাসেরির দুর্গ পাহারা দেওয়ার জন্য কিছু স্থানীয় যুবককে নিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা তৈরী করা হয়। যারা নির্বাচিত হতো, তাদের তিন মাসের ট্রেনিং দেওয়া হতো মিলিটারি ক্যাম্পে। কীলেরি জুড়ে গেলেন সেই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে। বাড়ি ফিরে শুরু করে দিলেন হরাইজন্টাল বার, প্যারালাল বার, রোমান রিঙের নিবিড় অনুশীলন। তিন বছরের মধ্যে হয়ে গেলেন এক্সপার্ট।
১৮৮২তে মাদ্রাজ স্টেট গভর্নমেন্টের নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক হাইস্কুলে শারীরশিক্ষা আবশ্যিক হয়ে গেল। সিলেবাসে জিমন্যাস্টিক্সের সাথে স্থান পেল কেরলার মার্শাল আর্ট। থালাসেরির একটি মিশন হাইস্কুল ডেকে নিল কীলেরিকে। জিমন্যাস্টিকস ইন্সট্রাকটারের পদে যোগ দিলেন বটে কিন্তু কীলেরি ছিলেন স্বশিক্ষিত, ঐ পদের যোগ্যতাস্বরূপ কোনো সার্টিফিকেট ছিল না তাঁর। মাদ্রাজে গেলেন এক বছরের সার্টিফিকেট কোর্সে যোগ দিতে। ফিরে এসে যোগ দিলেন বাড়ি থেকে দু’ কিলোমিটার দূরের সেই মিশন স্কুলে।
(ক্রমশ)
