অকূলের কাল। পর্ব ৪৫। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
পঞ্চনদের মেয়ে
শ্রুতিলিখন শেষ হতেই জুনিয়ার মেয়েটি সেই ছয় পৃষ্ঠার রচনাটিকে মনসুর সাহেবের দিকে ঘুরিয়ে রাখল। তিনি সেটিকে মন দিয়ে পড়তে লাগলেন আর সেই সঙ্গে চলল ইতিউতি সংশোধন। Affidavit শিরোনামের নীচে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা রয়ে গেছে। এবার সেটা পূর্ণ করতে হবে। মনসুর সাহেব ক্ষিতিকে সামনে ডাকলেন। বললেন, – শোন – এই যে মেয়েটিকে দেখছিস আমার সঙ্গে কাজ করছে, এ বাঙালি নয়। বাড়ি সেই সুদূর পাঞ্জাবে। নাম কিরণ মোহে। তোর দোলনের মতো এও বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিল বছর সাতেক আগে। তবে বিয়ে হাসিল করার জন্যে নয়, একেবারে উলটো কারণে। পাঞ্জাবের সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েসন করার পর আইন পড়তে চেয়েছিল। বাড়ির লোক রাজি নয়।
মনসুর সাহেব তার জুনিয়ারের জীবনী বলে চলেছেন। কেন বলছেন কে জানে! ক্ষিতি মেয়েটিকে এই প্রথম ভালো করে দেখছে। বেশ লম্বা, তীক্ষ্ণ নাক, পাতলা ওষ্ঠাধর, চোখ দুটি কেবল বাঙালি মেয়েদের মতো, কালো তারায় কোমল চাহনি। মনসুর সাহেব তারই গল্প সাতকাহন করে শোনাচ্ছেন বলেই বোধহয় একটু লজ্জায় পড়েছে। কারণ ধীরে ধীরে তার ফরসা গালে লালের আভা দেখতে পাচ্ছে ক্ষিতি।
মনসুর সাহেব বলছেন, – তারা কিরণের বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত। সেই ব্যস্ততার মধ্যে এক ভোরবেলায় একটা ব্যাগে নিজের সামান্য জামাকাপড় আর টাকাপয়সা নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে সোজা কলকাতায় এসে হাজির হলো কিরণ। ইচ্ছের জোর থাকলে কী না হয়। তবে এর মধ্যে একটা কথা আছে। অতি সাধারণ মানুষও প্রবল ইচ্ছা সম্বল করে একটা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। তবে সে ওই একবারই। কী হয় জানিস? একবার সফল হয়ে গেলে তার ইচ্ছের জোরটা কমে যায়। বাকি জীবন তাকে হিসেব করে চলতে হয়। কিরণ পেরেছে। মেয়েদের একটা মেসে থেকে টিউশন জোগাড় করে নিজের খরচ চালিয়েছে। আইন পাশ করেছে। এখন আমার কাছে শিখছে। একদিন অবশ্যই সে দক্ষ আইনজ্ঞ হবে। তবে সেটা করতে গিয়ে যে-বিয়েটা সে মিস করেছে সেটা আর কোনোদিন ফিরে পাবে না। এজন্যই আমি ওকে মিস মোহে বলে ডাকি। কী রে ঠিক বলেছি? – এই বলে দুচোখে হাসি ভরে তাঁর জুনিয়ারের দিকে তাকালেন মনসুর সাহেব। কিরণ মোহে নিমেষেই লজ্জারুণ। হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। ক্ষিতি বুঝল মনসুর সাহেবের কথার ভেতরে একটা গোপন রসিকতা আছে কিন্তু সেটা তার আন্দাজের বাইরেই থেকে গেল।
সাহেব এবার ক্ষিতির দিকে আঙুল দেখিয়ে কিরণকে বললেন, – এই ছোঁড়াটা পণ করেছে একটা অসম্ভবকে সম্ভব করবে। ফর রং কজ। আমি তাই প্রথমে ভাগিয়ে দিয়েছিলাম। চেয়েছিলাম ইচ্ছের এই জোরটা সে আরও মহৎ কিছুর জন্য জমিয়ে রাখুক। শুনল কই! এখন যা-হওয়ার হোক। আমার যা করণীয় সে তো করতেই হবে। মিস মোহে, তুই ওর কাছে শুনে নিয়ে এফিডেভিট এর ড্র্যাফটটা কমপ্লিট করে ওকে সঙ্গে নিয়ে হাইকোর্টে চলে যাবি। রিটটা টাইপ করিয়ে ওকে দিয়ে সই করিয়ে এফিডেভিট দাখিল করে দিবি আজকেই। দেখা যাক কবে দিন পাওয়া যায়। কথা শেষ করে মনসুর সাহেব ক্ষিতির দিকে তাকিয়ে বললেন, – শোন, মিস মোহেকে ট্যাক্সি করে কোর্টে নিয়ে যাবি। বউ পেতে গেলে খরচা করতে হবে বাবা!
চেয়ার থেকে উঠে মনসুর সাহেব চেম্বার ছেড়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন পিছনের দরজা দিয়ে। আজ নিশ্চয় দেরি করে কোর্টে যাবেন।
মিস মোহে নিজের চেয়ারটা ডান পাশে একটু সরিয়ে একটা টুল টেনে নিয়ে এসে বাঁ দিকের ফাঁকা জায়গাটায় রাখল। ক্ষিতিকে বলল, – এটায় বসুন।
বেঞ্চি থেকে উঠে ক্ষিতি টুলে বসতে বসতে ভাবছিল, এই মেয়েটা এতো ভালো বাংলা বলতে শিখল কীকরে! মোহের হাবভাবে কোনো তাড়া নেই অথচ তার ধীর চলনে সময় নষ্ট হচ্ছে না একটুও। ক্ষিতির নাম, পিতৃপরিচয়, ধাম ইত্যাদি সব শুনছে আর তার কলমও চলছে সমান গতিতে। অবশেষে ‘যাহা কহিলাম তাহা আমার জ্ঞান-বিশ্বাস মতে সত্য কহিলাম’-এর ইংরাজি বয়ানে লেখা শেষ হল। মোহে তার কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে মাঝারি গোছের একটি চামড়ার ব্যাগে ভরে নিয়ে নিজের কাঁধে ঝোলালেন, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষিতিকে বললেন, – চলুন।
বড় রাস্তায় উঠে ক্ষিতি নিজের পকেট হাতড়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করছিল এখান থেকে হাইকোর্ট যেতে ট্যাক্সি ভাড়া কত হতে পারে এবং সেই পরিমাণ মুদ্রা আদৌ সেখানে মজুত আছে কি-না। একই সঙ্গে সে উলটো দিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ট্যাক্সির দিকে হাত তুলে ইশারায় ডাকতে যাচ্ছিল। তার হাত ধরে নামিয়ে দিয়ে মিস মোহে বলল, – ট্যাক্সির দরকার নেই। আপনি তো স্টুডেন্ট মাত্র। খরচ বাড়ানোর দরকার নেই। ওই যে একটা বাস আসছে, চলুন উঠে পড়ি।
ঈষৎ সজল হয়ে ওঠা চোখ এবং গলায় বাস্প নিয়ে বাসে উঠে পড়ল ক্ষিতি মিস মোহের পিছু পিছু।
(ক্রমশ)
