রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল। কোলস্‌ওয়ার্দি গ্রান্ট। পর্ব ৯। অনুবাদে অর্ণব রায়

গত পর্বের পর

নদীর পাড়ে এই যে কলেজটি, এর প্রতিষ্ঠা ১৮৩৬ সালে। কলেজের যাবতীয় খরচ চলে একজন পুণ্যাত্মা মুসলমান ভদ্রলোকের সম্পত্তি থেকে। স্বাভাবিকভাবেই কলেজটিকেও তাই ‘মহম্মদ মহসীনের কলেজ’ বলেই সবাই জানে। আমাদের সরকার এখন এই ভদ্রলোকের সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক। কলেজের যা স্থায়ী রোজগার, তার বাইরে কোনও পয়সা খরচ হলে তা সরকার থেকে মেটানো হয়। আর ইংরেজী বিভাগের ছাত্রদের খুব সামান্য মাইনে দিতে হয়। এই মাইনে দিয়ে পড়ার ব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে সব সরকারী কলেজেই চালু হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে দেশের মানুষের মধ্যে যে মূল্যবোধ ছড়ানোর চেষ্টা চলছে, তা-ও ধীরে ধীরে সফল হচ্ছে। স্বাধীনভাবে অনেক এলিমেন্টারি স্কুল ছাড়াও আমাদের সরকার দেশের বিভিন্ন কোনায় এরকম আটটি কলেজ চালায়। এর জন্য বছরে মোট খরচ হয় ৪,৫৩,৫৮৯ টাকা। স্বাভাবিকভাবেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে অন্ততঃ ভারতীয় শিক্ষার উন্নয়নকে সমর্থন করার মত লোক খুব একটা কেউ নেই।[1] এই সমস্ত কলেজগুলিতে মোট কত ছাত্রকে পাঠদান করা হয় আমার সঠিক জানা নেই। কিন্তু এদেশে যারা সবচেয়ে বেশী সংখ্যক ছাত্র ধারণ করে রয়েছে, নিঃসন্দেহে সেগুলি হল আমাদের মিশনারি প্রতিষ্ঠানগুলি। বিশেষ করে জেনারেল অ্যাসেম্বলি অফ দ্য চার্চ অফ স্কটল্যান্ড, ফ্রি চার্চ অফ স্কটল্যান্ড (সাধারণভাবে ডঃ ডাফের স্কুল বলে পরিচিত) আর ভবানীপুরের লন্ডন মিশনারী সোসাইটি। এই সমস্ত সংস্থাতে সবসময়ই গড়পড়তা হাজারের ওপর ছাত্র থাকে। অনেক সময় তার চেয়ে অনেক বেশী থাকে। [2]

সকালের জোয়ারে ভেসে আমাদের নৌকোযাত্রা আবার শুরু করে চুঁচুড়া থেকে মাইলখানেক উজানে গেলেই একজোড়া উঁচু উঁচু প্রাচ্যদেশীয় মিনার চোখে পড়বে। যেন মনে হবে বসফরাস বা আলহামব্রা বা কায়রোর মসজিদের ছবি মনের পটে কল্পনায় ভেসে উঠছে। কিন্তু এটি কোনও কল্পনা নয়, বাস্তব। ওগুলি ইমামবাড়ার মিনার। যাকে মেহামেডান কলেজও বলে। ওই যে ধনী দেশীয় ভদ্রলোকের কথা আগেই বললাম, মহম্মদ মহসীন, তারই দানের পয়সায় এই ইমামবাড়াটি বানানো, সেই পয়সাতেই রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।

হুগলী ইমামবাড়া

 

এই কলেজটি যে স্থানীয় শহর হুগলীতে অবস্থিত, দুই শতাব্দী আগে (মানে এর গৌরবের দিনগুলিতে) এটি একখানি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পর্তুগীজ বসতি ছিল। ১৬৩১ সালে তিনমাস ঘেরাও করে রাখার পর মোগলরা এটি তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। তাদের দখলে থাকাকালীন এটি বাংলার পশ্চিমভাগের রাজকীয় বন্দরের মর্যাদা পায়। কলকাতা পুনর্দখলের পর ক্লাইভ এটিকেও দখল করেন। তবে ততদিনে এর সমস্ত গৌরব অনেকদিন অস্তমিত হয়েছে। তবু আজও এখানে বিপুল সংখ্যক ধর্মবিশ্বাসী মানুষের জমায়েত হয়। [3]

হুগলী থেকে মাইলখানেক ওপরের দিকে গেলে ছোট্ট পর্তুগীজ বসতি ব্যান্ডেল। সুখসাগর যাওয়ার পথে শহররূপী মনুষবসতির এটিই শেষ নমুনা। এখানে একটা বহু পুরোনো কনভেন্ট ও একখানা চার্চ চোখে পড়বে। চার্চের মাথায় ছোট ছোট মিনার আর একটা ছোট ঘন্টা বাজানোর টাওয়ার। চার্চের প্রাচীনত্ব এটি নির্মানের তারিখ থেকেই বোঝা যায়, ১৫৯৯! বোঝাই যাচ্ছে এটি ভারতবর্ষের এই দিকের প্রাচীনতম খ্রীস্টান চার্চ।

ব্যান্ডেল

 

চলতে চলতে এবার আমরা ব্যস্ত মনুষ্যবসতি ছাড়িয়ে এসেছি। এবার আমরা নদীর ওপরে ভাসমান অন্যান্য কৌতুহল উদ্রেগকারী জিনিসপত্রের দিকে নজর দিতে পারব। তার মধ্যে প্রধান হল নানারকম দেশী নৌকার সারি। প্রথমেই রয়েছে ভারী উলাক  বা বাংলার মালবাহী নৌকা। কখনও কখনও এর আকার পুটেলি (পুতুল) নৌকার মত দৈত্যাকার। আর ব্যবহারও হয় একই কারনে। এই নৌকাগুলি আসলে তক্তা ঠুকে বানানো। এর তক্তাগুলি একটা আর একটার ওপর চেপে থাকে বলে একে লন্ডনের হোয়্যারি বা দাঁড়টানা হালকা মাল ও যাত্রী বহনের জন্য যে নৌকা, অনেকটা তার মত দেখতে। কিন্তু উলাক বা অন্যান্য দেশী নৌকা আকারে অনেকটা গোল আর ধারগুলো লোহার কবজা দিয়ে আটকানো থাকে বলে দেখে মনে হয় নৌকাটিকে সেলাই করে আটকে রাখা হয়েছে।

উলাক

 

এরপর আমাদের চোখে পড়বে গোদা সাইজের পুটেলী বা পুতুল নৌকা (ইতিমধ্যেই এর কথা আমরা বলেছি)। হয়ত ফারাক্কাবাদ থেকে দীর্ঘ তিনমাসের ক্লান্তিকর যাত্রা সেরে ফিরছে। নৌকা বোঝাই বিভিন্ন দেশজ জিনিস, যেমন চাল, গম, অন্যান্য খাদ্যশস্য, রেশম অথবা তুলো। নৌকা চালাচ্ছে দশ থেকে বারোজন মাঝি। আর এদের প্রত্যেককে, যদি বাতাস না থাকে আর পাল ব্যবহার করা না যায়, তাহলে নৌকার পাটাতন বা ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে বিপুল শ্রমে বিশাল বিশাল বাঁশের দাঁড় টানতে দেখা যাবে। এই দাঁড়গুলি লম্বায় পুরোপুরি আঠারো ফুট, আর তার শেষে চ্যাপ্টা চওড়া ব্লেড লাগানো। দেখে অনেকটা রুটি কারখানায় ব্যবহার হওয়া বেলচার মত মনে হবে। আর সে জিনিস এতই বড় আর ভারী যে তাকে একবার জলে ফেলে আবার তুলে জলে ফেলতে পাক্কা দুমিনিট সময় লাগে! আর এই দাঁড়কে একবার জলে ফেলে টানতে যে পরিমান পরিশ্রম লাগে, দেখলে নিজেরই কষ্ট হয়।

আমি ইতিমধ্যেই বলেছি যে ভারতের নৌকাগুলি পাল ও দাঁড়, দুইয়েই চলার জন্য বানানো হয়। খুব কম ক্ষেত্রে দেখা যায় যে এই সব নৌকার পালগুলি কোনও ভালো কাপড়ে বানানো। বেশীরভাগ সময়ই মোটা আর আটপৌরে এক রকমের কাপড়, সাকে সাধারণ ভাষায় গানি বলা হয়, পালগুলি তা দিয়ে বানানো হয়। এদেশ থেকে ইউরোপে যে চাল চিনি আরও অন্যান্য ভারতীয় দ্রব্যসমূহ চালান যায়, তা এই কাপড়ে তৈরি থলে ও বস্তায় করেই যায়। তাই খুব সম্ভব তোমরা এই ধরনের কাপড় দেখেছো। আর যদি দেখেই থাকো, তাহলে নিশ্চই বুঝতে পারছো, এই কাপড়গুলিকে আর যাই হোক মজবুত একথা বলা যায় না। আর এদেশের মাঝিমাল্লা শ্রেনীর লোকের খুব যে বাস্তব বুদ্ধি আছে যার দরুন তারা এই কাপড় দিয়ে পাল বানিয়ে খুব খানিক সময় আর পয়সা বাঁচায়, তা-ও একেবারেই নয়। বরং যে পয়সা বা সময় তারা সস্তার কাপড় লাগিয়ে বাঁচায়, সেটা খরচ করলে দীর্ঘমেয়াদী সময়ে তার দশগুন পয়সা ও সময় তারা বাঁচাতে পারত। ফলে হয় কী, এদের পালগুলি সবসময়ই ছেঁড়াখোঁড়া আর তালিতাপ্পা মারা থাকে। মাঝে মাঝে তাদের চেহারা এমনই হাস্যকর হয় যে লোকজন হো হো করে হেসে ফেলে আরকি।

পালতোলা নৌকার মধ্যে একমাত্র ব্যাতিক্রম হল, মানে আমি যতদূর জানি, সেই সমস্ত নৌকাগুলো যেগুনো নিয়মিত আমাদের জন্য খড় বয়ে নিয়ে আসে। তাদের দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন একটা বিরাট খড়ের গাদা স্রোতের টানে ভেসে ভেসে এগিয়ে আসছে আর তার দুপাশে একজোড়া দাঁড় ধীরগতিতে নড়েচড়ে তাদের গতিপথ নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

খড়ের নৌকা

লেখকের টীকা

[1]  ১৮৫৮— মাদ্রাসাগুলিতে ও কলকাতার মোহাম্মদীয়া কলেজে অন্যান্য ক্লাসের সাথে সামরিক শিক্ষার শাখাও ছিল আর সেখানে ক্লাসও হত। এই সাম্প্রতিক বিদ্রোহ টিদ্রোহের ঝামেলায় সেই ক্লাস উঠে গেলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

[2]  একটি খুব আকর্ষনীয় পুস্তিকা লিখেছেন ভবানীপুর মিশনের রেভারেন্ড জে মুলিয়েন। নাম ‘স্ট্যাটিস্টিক্স অফ মিশনস ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড সিলোন’। সেখান থেকে জানা যাচ্ছে এদেশে মিশনারীরা প্রায় ১৩৪৭ টারও বেশী স্থানীয় ভাষার মিশনারী স্কুল চালান। সেগুলিতে মোটামুটি ৪৭,৫০৪ জন ছাত্র পড়ে। এর সাথে রয়েছে ৯৩ টি আবাসিক বিদ্যালয়। সেখানে ২,৪১৪ টি খ্রীস্টান ছাত্র পড়ে। এছাড়াও তাদের তত্ত্বাবধানে ১২৬ টি উন্নত মানের ডে স্কুল চলে। সেখানেও মোটামুটি ১৪,৫৬২ টি ছাত্র পড়াশোনা করে। এদেশে নারী শিক্ষার কথা বলতে হলে (যা ভারতের একমাত্র আশাভরসার স্থল বলে আমার মনে হয়) বলতে হয়, এদের হাতে মেয়েদের জন্য ৩৪৭ টি ডে স্কুল রয়েছে যাতে মোটামুটি ১১,৫১৯ টি ছাত্রী পড়াশোনা করে। তবে প্রকৃত আশার জায়গা হল মেয়েদের জন্য ১০২টি বোর্ডিং স্কুল সেখানে ২,৭৭৯ টি খ্রীস্টান ছাত্রী পড়াশোনা করে।

[3] “ এই হুগলীতেই এই প্রেসিডেন্সীর প্রথম ছাপাখানা স্থাপন করা হয়েছিল। আর সেখানেই ১৭৭৮ সালে বাংলা ভাষার প্রথম গ্রন্থটি ছাপা হয়েছিল, হ্যালহেডের বাংলা গ্রামার। তাও আবার বাংলা হরফে। সেই বাংলা হরফের ডাইসগুলি মিঃ উইলকিন্স –এর নিজের হাতে কেটে বানানো, যিনি পরবর্তীকালে স্যার উইলকিন্স হন। এরকম একটা ঘটনা, সভ্যতা ও উন্নতির আলো আনয়নকারী ঘটনা যেকোনও জায়গাকে অমর করে তোলার পক্ষে যথেষ্ট। তাতে সেই জায়গার রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক গুরুত্ব যতই লোকের মন থেকে মুছে যাক না কেন!” —নোটস অন দ্য রাইট ব্যাঙ্ক অফ হুগলী। ক্যালকাটা রিভিউ।   

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply