সার্কাসের ইতিকথা : প্রান্তজনের করতালি। পর্ব ১২। বরুণদেব

গত পর্বের পর

আমেরিকার সার্কাসে সেই সময় রিঙ্গলিঙ্গ ব্রাদার্স, কার্ল ব্রাদার্স, বাফেলো বিলসের মতো কিংবদন্তী দলগুলি স্বমহিমায় বিরাজ করছে। ছত্রের সার্কাসে তাদের মতো না ছিল জাঁকজমক, না ছিল সাজসরঞ্জাম। এইসব আমেরিকান সার্কাসের পরিচালকরা গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসের বিজ্ঞাপনে প্রবলভাবে বাধা দিলো। তারা বলল, ছত্রের সার্কাস ঠিক সার্কাস নয়, কাজেই তার বিজ্ঞাপনে ‘সার্কাস’ কথাটি রাখা যাবে না, লিখতে হবে ‘ইন্ডিয়ান শো’। এই অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞার কাছে মাথা নত করলেন না ছত্রে। সার্কাস দলগুলি জনমত তৈরী করল। আমেরিকান জনগণ বয়কট করল ছত্রের সার্কাস। যে ছত্রে চিয়ারিনির দুঃসহ আর্থিক অবস্থায় তাঁর দলকে কলকাতা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় তাদের সদর দপ্তরে ফিরে যেতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই ছত্রে সানফ্রান্সিকোতে অযৌক্তিক কারণে আমেরিকাবাসী ও আমেরিকান সার্কাস দলের রোষানলে পড়লেন।  শো বন্ধ রাখতে বাধ্য হলেন ছত্রে। খবর পেয়ে অর্থ সাহায্য দিয়ে পাশে দাঁড়ালেন কুরুন্দওয়াদ ও ইছলকরঞ্জির রাজারা। জাহাজে চেপে বসল গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস। সানফ্রান্সিস্কোকে বিদায় জানিয়ে গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস পৌঁছাল জাপান, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া। সমাদৃত হলো। হারনো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল দল। চিনে গিয়ে বেজিঙের রাজাকে মোহিত করে দিলো। চৈনিক সম্রাট নানাবিধ উপহার দিলেন। চিনের বিভিন্ন শহর ঘুরে গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস দেশে ফিরল তিন বছর পর, ১৮৮৭-তে। এরপর ভারত জুড়ে গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস ‘সার্কাস’ নামক এই শিল্পটিকে জনপ্রিয় করে তুলল।

সার্কাসের পাশাপাশি, ছোটোবেলা থেকেই বিষ্ণুপন্থ ছত্রের নেশা ছিল সঙ্গীত। সার্কাস জীবনের আগে গোয়ালিয়রের আস্তাবলে যখন ঘোড়ার প্রশিক্ষণের তালিম নিচ্ছেন, গোয়ালিয়র ঘরানার হিন্দুস্তানি সঙ্গীত শিক্ষার প্রবল ইচ্ছা ছত্রের।ওস্তাদ হাদু খান তখন গোয়ালিয়র  রাজদরবারের গায়ক। ছত্রে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন তাঁর কাছে নাড়া বাঁধার।  পাত্তা দিলেন না ওস্তাদজী। একদিন এক অনুষ্ঠানে গাইতে যাচ্ছিলেন ওস্তাদজী। বিষ্ণুপন্থও জুটে গেলেন দলে। চম্বল নদী পার হচ্ছিল দলটি। হঠাৎ  টর্নেডো। নৌকা গেল উল্টে। বিষ্ণুপন্থ উত্তাল নদীতে ঝাঁপ দিয়ে উদ্ধার করলেন সকলকে। রাগসঙ্গীতের ফরাসে বসার অনুমতি দিলেন ওস্তাদ। চেলা করে নিলেন বিষ্ণুপন্থকে। সার্কাসের জন্য বিভিন্ন মেডেল, পুরস্কার,বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ‘প্রফেসর’ সম্মান পাওয়া  বিষ্ণুপন্থ, শেষ জীবনটা সার্কাস ছেড়ে সেই সঙ্গীতের আশ্রয়েই কাটিয়ে দিলেন। ১৮৯০ সালে সার্কাসের দায়িত্ব ভাই কশিনাথপন্থ ছত্রের হাতে তুলে দিয়ে হিন্দুস্তানি সঙ্গীতে মনোনিবেশ করলেন। এবার ওস্তাদ রহমত খানের কাছে নাড়া বাঁধলেন। সার্কাসের মতোই  সঙ্গীতেও তিনি সমান উজ্জ্বল। বাকি জীবনটা ওস্তাদজীর সঙ্গে  মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় কনসার্ট করে বেড়ালেন।   মধুমেহ রোগে ভোগা বিষ্ণুপন্থ ইন্দোরে ২০শে ফেব্রুয়ারী, ১৯০৫ এ চলে গেলেন যখন, বয়স তাঁর বাষট্টি। ততদিনে ভারতীয় সার্কাস শক্ত করে গেঁথে গেঁথে নিয়েছে তাঁবুর খুঁটি।

গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসের দায়িত্ব বিষ্ণুপন্থ থেকে তাঁর ভাই কাশীনাথ হয়ে, কাশীনাথপুত্র বিনায়কপন্থ ছত্রের হাতে এলো যখন, শেষের ঘণ্টা বেজে উঠল।  ১৯২৪ -এ  কাশীনাথ ছত্রের মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র বিনায়ক ছত্রে সার্কাসকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন আর তিনটি বছর। বিষ্ণুপন্থ ও তারপর কাশীনাথ – এই দুই ভাইয়ের হাত ধরে ছত্রের সার্কাসের যে ধারবাহিক সাফল্য, তার মূলমন্ত্র ছিল তাঁবু ও তাঁবুর বাইরে সকল সার্কাসকর্মী ও শিল্পীদের সঙ্গে এক অচ্ছেদ্য বন্ধন। সকলে মিলে এক সার্কাসপরিবার। শিল্পী কর্মীদের ভালো সময়ে যেমন পাশে থাকছেন, তেমনি খারাপ সময়েও তাদের স্বজন ও সুজন হয়ে উঠেছেন। তাঁদের কাছে শিল্পী ও কর্মীরাই ছিলেন তাঁদের কান্ডারী। যখন বাল গঙ্গাধর তিলক ছত্রের সার্কাস দেখতে আসেন তাঁবুতে, তখন সার্কাসদলের পরিচালক কাশীনাথ । কাশীনাথ তাঁবুর সকল শিল্পীকে হাজির করান তিলকের সামনে, তাঁকে বলেন, এইসব শিল্পীরাই আমাদের সার্কাসের স্তম্ভ।

বিষ্ণুপন্থ ও কাশিনাথের মধ্যে যে দয়ালুতা উদারতা যে  চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল, কাশীনাথপুত্র বিনায়কের মধ্যে তা ছিল না। বিনায়কের পরিচালনায়, তাঁর ব্যবহারে, ছত্রের সার্কাস আর সার্কাসপরিবার হয়ে রইল না। শিল্পীরা হতাশ হয়ে একসঙ্গে তাঁবু ছেড়ে গেলেন। ছত্রের সার্কাস তখন পাঞ্জাবে। ভয়ানক ঝড়বৃষ্টি নিয়ে প্রকৃতিও বিরূপ। তছনছ করে দিলো তাঁবু। নিরুপায় বিনায়ক, উত্তরপ্রদেশের মেরুটের জুয়েলারি ব্যবসায়ী ও ঘোড়ার প্রশিক্ষক শিরিমনি বাবুর কাছে ধার করলেন বিশাল অঙ্কের টাকা, বন্ধক রাখলেন সার্কাস। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও ঋণ শোধ করতে পারলেন না। এই ঋণখেলাপী আদালত পর্যন্ত গড়াল। কোর্টের আদেশে শিরিমনি দখলিসত্ত্ব পেলেন ছত্রের গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসের। ঐ সার্কাসেরই দুই শিল্পী শঙ্কর ও মহাদেবের ওপর  দায়িত্ব দিয়ে বদলে দেওয়া হলো নাম- ছত্রের নিউ ইন্ডিয়ান সার্কাস। শঙ্কর ও মহাদেবের একটা সার্কাস দলের নেতৃত্ব দেওয়ার  মতো না ছিল লিডারশিপ, না ছিল শোম্যানশিপ আর না জানা ছিল সার্কাসব্যবসার ট্রিক্স। ফলতঃ চিরদিনের জন্য তাঁবু গোটালো ছত্রের সার্কাস। ১৯২৭ এ।  ১৮৮০-র কুরুন্দওয়াদের রাজপ্রাসাদের মাঠ থেকে প্রথম ভারতীয় সার্কাসের সাতচল্লিশ বছরের রোমাঞ্চকর যাত্রা  শেষ হলো মহারষ্ট্রের আহমেদনগরের  কাছে সাঙ্গামানে। সার্কাসের সূচনাপর্বের ইতিহাসের এক গৌরবজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি। ততদিনে ভারতের মাটিতে জন্ম নিয়েছে আরও অনেক সার্কাসদল। ভারতে সার্কাস আর এখন শুধুই ইউরোপীয় নয়। ভারতীয়  সার্কাসশিল্প প্রসারিত হয়েছে। জনপ্রিয় হয়েছে।  যে শিল্পের তাঁবু টাঙাতে শিখিয়েছিলেন প্রফেসর বিষ্ণুপন্থ দামোদর ছত্রে।

(ক্রমশ)

Author

Leave a Reply