অকূলের কাল। পর্ব ৩৭। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
বন্দিনী কন্যা
বেদগর্ভ পেরোতেই অনেকখানি প্লাসচিহ্নহীন রাস্তা। হাঁটতে হাঁটতে ক্ষিতি তারাতলা ব্রিজের উপর পা রাখে। মাঝামাঝি গেছে, সেতুর বাঁ দিকে এক অদ্ভুত কাঠামোর উপর জ্বলজ্বল করা প্লাসচিহ্নযুক্ত বিপণি নজরে পড়ল। সেতুর নীচ থেকে ওঠা চারটে পিলারের উপর ঢালাইয়ের মেঝে, তার উপর কাঠ, প্লাইউড আর সানমাইকা দিয়ে তৈরি দোকানঘর। ওষুধে ঠাসা। ক্ষিতির ঘ্রাণশক্তি বেশ তীব্র, ছোটবেলায় কুকুরদের সঙ্গে অষ্টপ্রহর থাকারই ফল হয়তো। নতুনের গন্ধ এক রকম, পুরনোর গন্ধ আর এক রকম; রমরম করে বিক্রি হওয়া আর ঢিমেতালে চলা দোকানের গন্ধেরও যে পার্থক্য আছে সেটা যে বোঝে সে বোঝে। দোকানের ভিতরে পা রাখতেই যেমন সে বুঝে গেল, ‘মৌসুমি মেডিক্যাল’ নতুন কিন্তু জমে উঠেছে অল্প দিনেই।
ডাইরি খুলে দোকানের ঠিকুজি-কুষ্ঠি লেখার পরেও কথা বলার সুযোগ পেতে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো ক্ষিতিকে। খদ্দের সামলাতে সদাব্যস্ত, মালিকই সম্ভবত, ক্ষিতির দিকে চোখই ফেরাচ্ছেন না। অল্পবয়স্ক কর্মচারী দুজনেরও একই দশা। মিনিট কুড়ি অপেক্ষার পর একটু ফুরসত মিলতেই ক্ষিতি তাঁর সামনে গিয়ে হাতজোড় করে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। বাঁধা গত আউড়ানো শেষ হতেই তিনি এক মোটা বাঁধানো খাতা বের করে ক্ষিতির দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন, লিখে নিন আপনার কোম্পানির কী কী ওষুধ আছে রিকুইজিশন খাতায়। যেগুলোর অর্ডার নেবেন সেগুলোয় টিক মার্ক দেবেন। একটু ফাঁফরে পড়ল ক্ষিতি। এতগুলো দোকান ঘোরার পর এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। সাহার তিনটে কোম্পানির ওষুধের তালিকায় কী কী সব ওষুধের নাম আছে – সব কি তার মাথায় আছে নাকি! একদিনই চোখ বুলিয়েছিল একবার। রক্ষে যে তালিকা তিনটে তার ব্যাগের মধ্যে আছে।
দোকানের একটা কোণের দিকে খাতাটা নিয়ে সরে এল ক্ষিতি। ব্যাগ থেকে তালিকা তিনটে বের করে খাতায় লেখা রিকুইজিসনের লম্বা লিস্টের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে নিজের অর্ডার বইয়ে লিখতে লাগল। অস্বস্তির সঙ্গে অসুবিধেও হচ্ছে বেশ। অস্বস্তি – কারণ মালিক হয়তো ভাবছে এমন সেলসম্যান যে নিজেদের কোম্পানির ওষুধের নামগুলোই জানে না! আর অসুবিধের কারণ, ওষুধের নামের সঙ্গে সড়গড় না হওয়ায় তাকে বারবার করে মিলিয়ে দেখতে হচ্ছে তাদের কোনো ওষুধের নাম বাদ পড়ে যাচ্ছে কি-না। গলদঘর্ম হয়ে অর্ডার লেখা শেষ করেও স্বস্তি নেই। এ যে বিশাল লম্বা তালিকা – বহু টাকার অর্ডার। সত্যি সত্যিই দেবে তো! মালিকের সামনে রিকুইজিশন খাতা আর অর্ডার বই রেখে দুরুদুরু বুকে অপেক্ষায় থাকল ক্ষিতি। তার সমস্ত সংশয়কে এক ঝটকায় ঝেড়ে ফেলে খসখস করে অর্ডার বইয়ের নীচে সই করে দিল মালিক। ভালো করে দেখলও না পড়ে, কেবল বলল – কাল যেন মাল চলে আসে।
ঠাকুরপুকুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে পা-দুটো জিরান চাইল। একটা চা-এর দোকানের বেঞ্চিতে বসে চা-বিস্কুট খেয়ে একটা চারমিনার ধরাল ক্ষিতি। সাড়ে এগারটা বাজে। টানা সাড়ে তিন ঘণ্টা হেঁটেছে। প্রথম দিনের পক্ষে কাজও কিছু খারাপ হয়নি। খিদিরপুর থেকে ঠাকুরপুকুর – তেইশটা ওষুধের দোকানের নাম তার ডাইরিতে ঢুকেছে, তাও প্রথম দিকের গোটা তিনেক দোকান বাদ গেছে। সাহা ডাইরিটা দেখলেই বুঝবে সে ফাঁকি দেয়নি কাজে। অর্ডার যদিও একটাই – মৌসুমির; তা হোক, তার পরিমাণ দেখলে সাহার হৃদয়ে ভক্তি জাগা উচিত।
ভুল অনুমান করেছিল ক্ষিতি। মৌসুমির অর্ডার দেখে ভক্তি নয়, অবিশ্বাস আর সন্দেহে হাজারো কথায় জেরবার করে ছাড়ল তাকে। অথচ বেলা একটার সময় পেটে আগুন আর শরীরে ক্লান্তি নিয়ে কোয়ার্টারে ফেরার সময়েও মাথায় শান্তি ছিল। চাকরির প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা। সফলই ধরতে হবে, খালি হাতে তো ফেরেনি। কোনোরকমে মাথায় জল ঢেলে রান্নাঘরে আসন পেতে বসেছিল। রঞ্জিতের দ্রৌপদীর হাঁড়ি, খুদকুঁড়ো হলেও থাকবে, এ তো জানা কথাই। আজও ছিল। কেবল ভাত নয়, কড়াইয়ে পোস্তর চাটনিও। গোগ্রাসে বললে অন্যায় হবে, খেতে যতই কম সময় লাগুক, থালা চেটেছে ঢেঁকুর না ওঠা পর্যন্ত। তারপর ঝাড়া দুটি ঘণ্টা ঘুমিয়ে প্রায় নাচতে নাচতে সে এসেছে সাহাকে তাক লাগাবে বলে। তাক যে লেগেছে মৌসুমির তিন পাতা ভর্তি অর্ডার দেখে সাহার ঝুলে যাওয়া ঠোঁট দেখেই বুঝেছে ক্ষিতি। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া যেমনটি ভেবেছিল হলো তার উলটো –
–অর্ডারের নীচে সইটা কার? মালিকের না কর্মচারীর? ওষুধ নিয়ে গেলে ডেলিভারি নেবে তো? চেকে পেমেন্ট চলবে না সেটা বলেছিলেন কি? নতুন ছেলে দেখে অচল চেক দিয়ে দোকানের স্টক বাড়িয়ে নেওয়ার ধান্দা নয় তো? দোকানটা দেখে চালু মনে হলো, না-কি ছাতা-পড়া?
সব প্রশ্নের উত্তরেই ক্ষিতিকে দ্বিধান্বিত দেখে সাহার ঝোলা গোঁফ আরও ঝুলে গেল যেন। বলল, – এমন মিনমিন করে কথা বললে এই চাকরি করতে পারবেন না। কেউ আপনার কথায় কান দেবে না।
ক্ষিতি বুঝল, সাহা আসলে মনস্থির করতে পারছে না তার আনা অর্ডার মোতাবেক ওষুধপত্র পাঠাবে কি-না। মনটাই তেতো হয়ে গেল তার। প্রথম দিনেই বড় অর্ডার পেয়ে মালিককে খুশি করে দেবে ভেবে এতক্ষণ ধরে সে হাওয়ায় ভাসছিল। সেই মালিকের এই ভাবগতিক দেখে সব চুপসে গেল। ন্যাতানো মন নিয়ে জি এম স্টোর্স থেকে সে যখন বেরিয়ে আসছে তখনও সাহা আনমনা হয়ে ভেবেই চলেছে।
হস্টেলে পৌঁছে ফোনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে আরও মুষড়ে পড়ল ক্ষিতি। ঘনিষ্ঠ দু-চারজন এখনও আছে বটে, জুনিয়াররা এখনও তাকে অবজ্ঞা করছে না, তাও নিজেকে রবাহুত মনে হয়। যেখানে কাকুর ব্র্যাকেটই একদিন ছিল শেষ কথা, সেখানে কাকুই আজ অপ্রাসঙ্গিক। এখনও তার ঘনিষ্ঠ বলতে মনোজিৎদা, কিষাণ, দু-চারজন জুনিয়ার আছে। আছে অনাথদাও। তবে অনাথদা ঠিক বন্ধুপদবাচ্য নয়, ছিলও না কোনোদিন। গতবারের প্যানেল ক্ষিতি পর্যন্ত না নামলেও মনোজিৎদা এবার ক্লার্কশিপ পরীক্ষায় উপরের দিকে থেকেই রাইটার্সে চাকরিতে ঢুকেছে। এবারে ডব্লিউবিসিএসে বসছে, পেয়ে যাবে ঠিক। ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ক্ষিতির বুক চিরে। একদিন একসঙ্গেই শুরু করেছিল। আর আজ কোথায় নেমে গেছে সে! সবই অনিশ্চিত। গ্র্যাজুয়েট কি হতে পারবে আদৌ কোনোদিন!
জুনিয়ার ছেলেরাও জেনে গেছে, কেন ক্ষিতি অধিকাংশ বিকেলে হস্টেলে এসে ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়ে যায়। কারণ জেনে ফেলায় ক্ষিতির অবশ্য সুবিধেই হয়েছে। প্রেম ব্যাপারটার প্রতি বেশির ভাগ ছেলেরই দুর্বলতা আছে। সেই সূত্রে সামান্য পরিচিত জুনিয়ারও তাকে খাতির করে। যেদিন আড্ডা দেওয়ার মতো ঘনিষ্ঠ কাউকে পায় না ক্ষিতি, বিকেলের দিকে প্রায়ই তেমনটা হয় – সেদিন সামান্য পরিচিতরাও তাকে সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করে। বিকেলের টিফিনটাও তাকে খেতে হয়। তবুও যত দিন যাচ্ছে একটা হীনম্মন্যতা ঘিরে ধরছে তাকে।
ফোন আসা বন্ধই হয়ে গেল। তার বদলে একদিন ভেলি একটা চিঠি পাঠাল কিষাণের হাতে। ক্ষিতিকেই চিঠিটা লিখেছে ভেলি। ফোনের ঘরে কড়া পাহারা। কোনো সুযোগই পাচ্ছে না দোলন। এর মধ্যে একদিন মামাবাড়ি এসেছিল তার সেজদা আর সেজবৌদির সঙ্গে। কয়েকদিনের জন্য দোলনকে রেখে যেতে বলছিল সবাই। কিছুতেই রাজি হয়নি ওর দাদা। বিয়ের নোটিশ দেওয়ার পরে দু-মাস কেটে গেছে। আর এক মাসের মধ্যে দোলন বাড়ি থেকে বেরোতে না পারলে নোটিশ বাতিল হবে সেটা মাথায় আছে তার। এক মাসের মধ্যে বেরোবার চেষ্টা করবে। আর মাঝে মাঝে ভেলি বা জলির হাত দিয়ে চিঠি পাঠাবার চেষ্টা করবে। নেটকির সঙ্গে দেখা করা নিষেধ। তাছাড়া নেটকি খুবই ভেঙে পড়েছে। ওদের বাড়ি থেকে শান্তর সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি। তার বাবাকে নাকি ফোন করাও হয়েছিল বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা বলতে। শান্তর বাবা এমন সব কথা বলেছে নাকি যে অপমানিত হয়েছে মামারা। তারা নেটকিকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে যা হয়েছে সব ভুলে যেতে।
(ক্রমশ)
