মেদিনীপুর লোকাল। পর্ব ১৩ । দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস । লিখছেন আদিত্য ঢালী

গত পর্বের পর…

ছোটোবেলায় প্রচণ্ড গরমের পর যখন বিকেলবেলা ঝোড়ো হাওয়ার সাথে খানিক বৃষ্টি হতো তখন যেন আমাদের স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ত। চৈত্রের শেষে বা বৈশাখের শুরুর দিকে কালবৈশাখি যেন লেগেই থাকত। কতবার যে আমাদের দোতলার টিন কালবৈশাখিতে উড়ে চলে গেছে সে কথা আজ আর কারোর মনে নেই। একবার মনে আছে শিবরাত্রির দিন দুপুরের পরই আকাশ কালো করে এসে বৃষ্টি শুরু হল। বৃষ্টি বলা ভুল অঝোরে শিল পড়া শুরু হল। আমাদের খেলার মাঠ একদম ধবধবে সাদা হয়ে গিয়েছিল। সবাই আমরা বালতি নিতে শিল কুড়োতে গিয়েছিলাম। কেলে সবার আগে একটা বালতি শিল ভর্তি করে বাবার থানের কাছে গিয়ে হর হর মহাদেব বলে সেই শিল ভরা বালতি নিজের গায়ে ঢেলে স্নান করেছিল। তখন যদি আইস বাকেট চ্যালেঞ্জ থাকত তাহলে কেলেই হতো প্রথম। কেলের বিশ্বাস ছিল ওর উপর ভোলেবাবার দয়া আছে ওর কিছু হতে পারে না। তাও আবার বাবার থানের সামনে গিয়ে স্নান করেছিল। জল ঢালতে আসা পাড়ার বউদিরা হাঁ করে এক এক করে কেলের পাঁজরের কটা হাড় চামড়ার উপর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল এক এক করে গুনছিল। শিবুকাকু সেবারে মন্দিরের পুজোর দায়িত্বে ছিল। কেলের কাণ্ড দেখে দৌড়ে কেলের কাছে এসে নিজের নামাবলি কেলের গায়ে দিয়ে বলেছিল “এই হিম জলে কেউ স্নান করে! নিমুনিয়া হয়ে মরবি তো, যা এখুনি বাড়ি গিয়ে গরম দুধ খা”। কেলে নামাবলিটাকে মাফলারের মতন জড়িয়ে একহাতে শিবুকাকার হাত ধরে আর আরেক হাতের আঙুল তুলে মন্দিরটাকে দেখিয়ে বলেছিল “অ্যাই শিবু… হি ইজ ভোলে, আই অ্যাম কেলে, নাথিং হবে আমার জলে”। বলেই কাঁধ বেকিয়ে চুল ঠিক করতে করতে সেই যে গেল আবার ফিরে এসেছিল প্রায় এক সপ্তাহ পর। পরেরদিন ওর কাকার ছেলে বিল্টাই এসে বলেছিল ওর নাকি রাতে এত ভয়ানক জ্বর এসেছিল যে ডাক্তার না পেয়ে ওর বাড়ির লোক কম্বল ভিজিয়ে ওর গায়ে দিয়েছিল। সকালে জ্বর একটু কমাতে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে ডাক্তার নাকি বলেছিল ঐ হিম জলে স্নান করার পর আর দু-মিনিট যদি ওখানে বেশি থাকত তাহলে স্বয়ং ভোলেবাবা এসেও নাকি ওর নিমুনিয়া হওয়া থেকে আটকাতে পারত না। এই শুনে কেলে এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে জ্বর সেরে যাওয়ার পরও ও দু-তিন দিন বাড়ির মধ্যে ছিল। পরে শিবুকাকা পুজোর ফুল এনে কেলের বুকে মাথায় ঠেকিয়ে নাকি বলেছিল “সব ভুত নেবে গেছে তোর মাথা থেকে এবারে আর কিছু হবে না”। শিবুকাকাকে জড়িয়ে নাকি সেদিন আধঘন্টা কেঁদেছিল কেলে। আর আমরা অপেক্ষা করেছিলাম কবে ও বাইরে আসবে আর ওর থেকে শিবরাত্রির দিন রাতের ভিসিডির ভাড়াটা নেব। একপ্রকার ওর জোড়াজুড়িতেই আমরা টাইটানিক ছাড়াও দিওয়ানা নিয়ে এসেছিলাম। কারণ কেলে বলেছিল ও নাকি শাহরুখ খানের মত তোতলানো শিখে ও পাড়ার প্রিয়াঙ্কাকে ইম্প্রেস করবে। কেলে দেখতে পারেনি সেই ছবি ঠিকই কিন্তু আমরা ঘুম ছেড়ে চোখ টানটান করে দেখেছিলাম।

সেসব দিনে আরও একটা বাড়তি পাওনা ছিল বৃষ্টি শেষ হতে না হতেই লোডশেডিং। আর লোডশেডিং মানেই পড়াশুনো সব লাটে উঠবে। গোপালদের ছাঁদে গিয়ে এবারে জমিয়ে আড্ডা হবে। সেই আড্ডার বহর একসময় এমন হত যে বাড়ি থেকে ডাকার জন্য লোক আসতে হত। কিন্তু আজ লোডশেডিং হতে ভয় করছে। গোটা স্কুল বাড়ি অন্ধকার। সামনে একটা বিশাল মাঠ। মাঠ পেড়িয়ে মেন গেট। গেটের ওপারে রাস্তা। তিনতলা স্কুল, মাত্র একটা ঘর খোলা। দুটো মোমবাতি টিমটিম করে জ্বলছে। বারন্দা দিয়ে প্রায় তিনশ মিটার হেঁটে যাওয়ার পর বাথরুম। বাথরুমের পাশে আবার জঙ্গল। এই ভেবেই আর টয়লেট পাচ্ছে না। যন্ত্রের মত আমরা স্ট্যাম্প মেরে যাচ্ছি আর প্রিসাডিং একের পর এক সই করে যাচ্ছে। সই করতে করতে যখন প্রিসাইডিং হাঁপিয়ে উঠছে তখন বাইরে বেড়িয়ে একটা বিড়ি টেনে আসছে। মাঝে মাঝে আমিও তার সঙ্গী হচ্ছি। এই পোড়া দেশে একদিন নাহয় পোড়া বিড়ি খেয়েই কাটল। কারণ রাতে কী খাবার জুটবে কে জানে! শেল্ফহেল্প গ্রুপের মহিলারা এসেছিল বিকেলে কী খাব জানতে। আমরা বলার আগেই ওনারা নিজেদের লিস্ট ধরিয়ে দিলেন। তাতে আগে থেকেই সরকার দাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। কিন্তু ওনাদের বক্তব্য হল এর দরে ওনাদের পোশাবে না। আমরা যদি আরও কিছু একটু বেশি দিই তবে ওনাদের সুবিধা হবে। প্রিসাডিং বলল সে না হয় দেওয়া যাবে কিন্তু আমাদের দেশি মুরগি খাওয়াতে হবে আজ রাতে আর আগামীকাল পুকুরের টাটকা মাছের টক আর কুঁচো চিংড়ির ঝোল। এই শুনে দ্বিতীয় পোলিং অফিসার জিভ বের করে সে এসব কিছুই খাবে না। কারণ সে মাছ মাংস কিছুই খায় না। তার সাথে মুড়ি আছে সে মুড়ি ভিজিয়েই খাবে। আমরা শুনে বললাম তা কখনও হয় নাকি আবার! সবাই ভেবে সিদ্ধান্ত নিল আজ রাতে নিরামিষই খাব। আর কাল দুপুরে দেশি মুরগি হবে যদি পাওয়া যায়, আর ওনার জন্য আলাদা করে নিরামিষ তরকারি করা হবে, যেটায় আমিষের কোনো ছোয়া থাকবে না। গ্রুপের মেয়েরা বলল ওনারা বাজারে দেখে সন্ধ্যের পরে এসে জানিয়ে যাবে কাল দেশি মুরগি হবে কিনা। ওনারা চলে যেতেই বৃষ্টি শুরু হল, আর বৃষ্টি শুরুর সাথে সাথেই লোডশেডিং। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

বিকেলে চপ মুড়ি খেলেও বেশ খিদে খিদে পাচ্ছিল। ব্যাগে ছোটো বিস্কুটের প্যাকেট ছিল। বের করে দুটো বিস্কুট খেলাম। খাওয়ার পর জল খেতে গিয়েই খেয়াল হল বেশি জল খাওয়া যাবে না। বেশি জল খেলেই যদি বাথরুম যেতে হয় তাহলেই হয়েছে। এই অন্ধকারে রাম নাম করলেও ভুত ছাড়বে না। তাই একটু জল খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিলাম। আমাদের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আমরা আগামীকালের জন্য নিজেদের প্ল্যানিং সেরে নিচ্ছি। প্রিসাইডিং বলল “অনেক বড় বুথ। অনেক ভোটার। আর একজন অফিসার হলে ভালো হত। তাড়াতাড়ি শেষ করা যেত। নাহলে কখন যে শেষ হবে কে জানে!” আমি বললাম- “এরিয়া অফিসারকে বলা যায় না আরেকজন দিতে, উনি তো সকালে বলছিলেন দেখবেন যদি আরেকজনকে দেওয়া যায়”। প্রিসাডিং মাথা নেড়ে বলল “ঠিক বলেছ একবার ফোন করে দেখি কী বলে”। প্রিসাইডিং ফোন করতে যাবে ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই দেখি দশ বারোজন লোক দাড়িয়ে আছে। প্রথমে দেখে একটু ভয়ই পেয়ে গেলাম। এই অবেলায় এরা কারা রে বাবা! আমারই বয়সের একটি ছেলে বলল “প্রিসাইডিং স্যার আছেন?” আমি কিছু বলার আগেই দেখি প্রিসাইডিং অফিসার বলল “আসুন ভিতরে আসুন”। চার পাঁচ জন লোক ভিতরে এল। বাকি লোক বাইরেই দাঁড়িয়ে রইল। একজন নেতা গোছের লোক সামনে এগিয়ে এসে বলল “এই দেখতে এলাম স্যার আপনাদের কোনো অসুবিধে হচ্ছে কিনা”। প্রিসাইডিং অফিসার বলল “না না কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। লোডশেডিং-এ একটু আলোর সমস্যা ছিল কিন্তু এখন তো কারেন্ট এসে গেছে আর কোনো সমস্যা নেই”। ভদ্রলোক বেশ অমায়িক হাসি এনে বলল—‘তা ভালো। আমরা এলাম আমাদের এজেন্টকে পরিচয় করিয়ে দিতে। আর কোনো দল এসেছিল নাকি?’

‘না না আর কেউ আসেনি।’ প্রিসাইডিং বলল।

‘ওহ! আর কেউ আসবে বলে মনেও হয় না। একদল তো এখন একেবারে নিশ্চিহ্ন। আরেকদল তো এত কাটমানি খেয়েছে যে উঠতেই পারবে না। এবারে তো আমরাই আসছি।’

বলেই সবাই মিলে হো হো করে হেসে উঠল। প্রিসাইডিং সব কিছু বুঝিয়ে দিল। কখন আসতে হবে সকালে। কী কী করতে হবে। সমস্ত প্রক্রিয়া খুব ভালো করে বুঝিয়ে দিল। ইতিমধ্যেই দেখি গ্রুপের মহিলারাও চলে এসেছেন। সাথে করে নিয়ে এসেছেন রাতের খাবার। একজন মহিলা  ঘরে ঢুকে বলল –“স্যার কাল মুরগি পাইনি। দেশি মাছ হবে শুধু”। প্রিসাইডিং হাসি মুখ করে বলল “আর কপালে নেই যখন তখন আর হবে না। যা হবে তাই খাব”। নেতা গোছের লোকটা আগ বাড়িয়ে সামনে এসে মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করল “কী ব্যাপার শ্যামলী? কোনো প্রবলেম হল নাকি?” শ্যামলী বলল “স্যারেরা কাল দিশি মুরগি খাবে বলেছিল। সে তো আর পেলাম না”।

‘কী ! মুরগি পাওয়া যায়নি? হতেই পারে না। স্যারেরা আমাদের গ্রামে এসে মুরগি খেতে চেয়েছেন আর মুরগি পাওয়া যাবে না হয় নাকি!’

প্রিসাইডিং বলল – ‘না না ঠিক আছে। কাল এমনিই কাজের চাপ থাকবে কখন খাওয়ার সময় তার নেই ঠিক ও যা হবে তাতেই হবে।’

‘না না স্যার আমি বলছি আমি আপনাদের মুরগি খাওয়াব। আপনারা নিশ্চিন্তে ভোট করান। আমাদের কর্মীরা তো আছেই কোনো কিছুর সমস্যা হবে না”। ভদ্রলোক বললেন। বলেই তিনি ফটকে কাউকে একটা বাইরে থেকে ডাকলেন। একটা কম বয়সি ছেলে ভিতরে এলে তার কানে কানে কিসব যেন বললেন, বলার পরই বললেন “সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আর কোনো চিন্তা নেই। আপনারা শুধু ভোটটা দেখে নেবেন।’ বলেই শ্যামলীকে হাঁক দিয়ে বাইরে নিয়ে কিসব যেন বুঝিয়ে বলে সবাই মিলে চলে গেল। আমরা সবাই মিলে পাশের ঘরে খেতে গেলাম। খেতে বসার সাথে সাথেই আবার লোডশেডিং হয়ে গেল। মোমবাতির আলোয় মশার কামড় খেতে খেতে ভাত,নুন ছাড়া ডাল, বিচিওয়ালা বেগুন ভাজা আর ঘেটে যাওয়া কুমড়োর ঘ্যাট দিয়ে খেয়ে দেয়ে সিভিক ভলিন্টিয়ারকে সাথে নিয়ে একেবারে বাথরুমের কাজ সেরে ঘরে ঢুকলাম। এবারে শুতে হবে। কিন্তু শোবো কোথায়? বেঞ্চিগুলোর চওড়া এতই কম যে দুটো বেঞ্চি একসাথে করেও শোওয়া যাবে না। অগত্যা সেই মেঝেতে ভোট নেওয়ার পিচবোর্ড পেতে মশারি টানিয়ে মোবাইল নিয়ে যেই শুয়েছি। পাশ থেকে প্রিসাইডিং বলল – “এই কার্বলিক অ্যাসিড ছড়িয়ে দেওয়া হয়নি তো। এমনিই বৃষ্টি কমে গেছে তেনারা আবার এদিক ওদিক গর্তে থাকতেই ভালোবাসে। রাতের অন্ধকারে যদি ঘরে ঢুঁকে আসে কোনোভাবে। এরম কিন্তু হয়েছিল একবার…” প্রিসাইডিং-এর কথা শেষ করেই আমি মশারি থেকে বেড়িয়ে কার্বলিক অ্যাসিড চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়ে আবার মশারির মধ্যে ঢুকে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম এসে গেল। একদিকে ভালোই হল। কাল অনেক ভোরে উঠতে হবে। হঠাৎ দরজায় খুব জোড়ে কেউ কড়া নাড়তে লাগল। ঘুম একদম ভেঙে গেল। একটু ভয়ও পেলাম। দরজা খুলতেই একটা গোবেচারা লোক কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে আধ ভেজা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে আর হাঁপাচ্ছে। আমায় দেখেই বললেন “আর বলবেন না মশাই। কতবার করে বললাম ভিতরে দিয়ে আসুন, ড্রাইভার ও শুনল না আর এরিয়া অফিসারও শুনল না। ভিতরে আসতেই অন্ধকারে ঢেমনা কুকুরগুলো এমন চিৎকার করল যে পরিমরি করে ছুটে এখানে এলাম”। আমার বুঝতে বাকি রইল না ইনিই হল নতুন অফিসার যাকে দেওয়ার কথা এরিয়া অফিসার বলেছিলেন সকালে। ভিতরে ঢুকে উনি যে কতক্ষণ এই এক বিষয় নিয়ে গজগজ করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। তবে ওনার কথায় কেউই উত্তর দেয়নি। শুধু যেটা এরপর হল সারারাত আমার আর ঘুমই এল না।

(ক্রমশ)

আদিত্য ঢালী
লেখক | + posts

আদিত্য চলচ্চিত্র-বিদ্যার ছাত্র। নেশায় পাহাড়। মানুষকে দেখা, বোঝা ও আঁকার স্ব-ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যাবে তাঁর এই কলামে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *