খড়কুটোর জীবন : মামার বাড়ি ভারি মজা । পর্ব ১২ । লিখছেন সুপ্রিয় ঘোষ

ছোটো বেলাতে হরেন কাকা আদর করতে গিয়ে মাঝে মাঝে উপরের দিকে তুলে ধরে বলতেন — ‘মামার বাড়ি দেখতে পাচ্ছিস?’ আমিও মিথ্যা মিথ্যা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতাম — ‘হ্যাঁ। ঐ তো দিদা মুসুরির  ডাল রোদে দিচ্ছে। ছোটো মাসি গোয়ালের ছায়ায় বসে বসে আখ খাচ্ছে আর মামা গরুর জন্য বিচালি কাটছে। দাদুকে দেখতে পাচ্ছি না। মনে হয় মাঠে গিয়েছে।’

এই সব বলতে বলতে খিল খিল করে হাসতাম। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতাম কেমন গম্ভীর। কেননা দাদু বহুদিন হলো মাকে আনতে আসেনি। গ্রাম থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরে তেহট্ট ঘাট পেরিয়ে জলঙ্গী নদীর তীরে চকবিহারী গ্রামে মামার বাড়ি। আমার আর ভাইয়ের বহুদিন মামার বাড়ির মজা পাওয়া হয়নি। মায়ের বাবার বাড়ির গ্রাম থেকে এক বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী মাঝে মাঝে আমাদের গ্রামে আসতো মাধুকরীর জন্য। আমাদের বাড়ি এলেই মা তাদের উঠানের নিমগাছের ছায়ায় চেয়ারে বসিয়ে চা-মুড়ি খাইয়ে জেনে নিতো বাবার বাড়ির খোঁজ। আর শেষে মিনতি করে বলতো — ‘কাকা, বাবাকে বোলো আমাকে যেন কয়েক দিনের জন্য নিয়ে যায়।’ তিলক কাটা বৈষ্ণব দাদু মা কে অভয় দিয়ে বলতেন — ‘কেঁদো না মা, তোমার বাবাকে বলেছি, আখ ভাঙা হয়ে গেলেই তোমাকে নিয়ে যাবে।’ এই সব বলে মাকে প্রবোধ দিয়ে ‘জয় রাধে-কৃষ্ণ’ বলে তিনি পথ ধরতেন। আর মা সেই পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঘরে গিয়ে অবদমিত কান্নার মুক্তি ঘটাতো। ছোটো হলেও বুঝতাম মায়ের জন্য যেমন আমার স্কুলে গিয়ে মন খারাপ করে তাকে দেখতে না পেয়ে মায়েরও বোধহয় তেমনি মন খারাপ। আমি তো স্কুল থেকে ফিরেই মাকে কাছে পেতাম, তার মেখে দেওয়া ভাত খেতাম মার তো তেমন হয় না। মা সেই কবে মামার বাড়ি গেলে দিদা তাকে নিজে বসিয়ে আদর করে খাওয়াবে।

আচ্ছা দিদা কি দাদুকে বলতো না মাতা মেনকার মতো —

‘কবে যাবে বল গিরিরাজ, গৌরীরে আনিতে।
ব্যাকুল হৈয়েছে প্রাণ উমারে দেখিতে হে।
গৌরী দিয়ে দিগম্বরে, আনন্দে রোয়েছো ঘরে;
কী আছে তব অন্তরে, না পারি বুঝিতে।’

হয়তো বলতো। কিন্তু পাষাণ প্রাণ দাদু নিজের সময় খুঁজতো ।

আমরা খেলা করার সময় বলতাম –

‘তাই তাই তাই মামার বাড়ি যাই
মামার বাড়ি ভাড়ি মজা
কিলচড় নাই।’

সত্যিই মামার বাড়ি গিয়ে ক’দিনের জন্য কিলচড়ের হাত থেকে মুক্তি পেতাম। কেননা সেখানে ছোটো কাকার শাসন পৌঁছাতো না। মামা বাড়ির ভালোবাসার ভাবাবেগে আমরা পিঠোপিঠি দু’ভাই দেবদূতের মতন হয়ে উঠতাম।

তারপর একদিন দেখতাম হাঁটু পর্যন্ত ধুতি আর পাঞ্জাবী পরিহিত গামছা কাঁধে ব্যাগ হাতে টাক মাথা আমার টুকটুকে ফর্সা দাদু এসে হাজির তার মেয়ের বাড়ি। মা ছুটে গিয়ে তার পায়ের ধুলো নিতো। আমরাও মাকে অনুসরণ করতাম। গাড়ুতে করে দাদুকে হাত-পা ধোওয়ার জল দেওয়া হতো। আমি গামছা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম দাদুর জন্য। ঘরে এসে দাদু হাত-পা-মুখ মুছতেন। এমনকি ঘেমে যাওয়া টাকটাতেও গামছা বোলাতেন। ততক্ষণ মা এনে হাজির করেছে আখের গুড়, পাতি লেবু আর নুন দেওয়া সরবৎ। গ্লাসের সবটা শেষ না করে দাদু আমাদের দু’ ভাইকে বলতেন — এটুকু তোরা খা। আমরা গ্লাস শেষ করে পালাক্রমে দু’ভাই দাদুকে তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করতাম। দাদুর গায়ে পাখা লেগে গেলে মাটিতে তিনবার ঠুকে নিতাম। না হলে ঠাকুমা বলতেন পরমায়ু ক্ষয় হয়ে যায়।

আমার ঠাকুমার সঙ্গে দাদুর নানান গল্পগাছা হতো। সে গল্পের নটের গাছটা মুড়তো তখন যখন মা জল, আসন দিয়ে দাদুকে আর আমাদের খেতে ডাকতো। খেতে বসে দাদু প্রথমে গ্লাস থেকে একটু জল নিয়ে থালার চারিদিকে ছড়িয়ে দিতেন। তারপর ভাত ভেঙে ভাজা, ডাল, তরকারি, মাছ, অম্বল দিয়ে আস্তে আস্তে খাওয়া শেষ করতেন। খাওয়া শেষ হলে মা চৌকির উপর দাদুর বিছানা করে দিতো। আমরা দু’ভাই দাদুর দুইদিকে শুয়ে পড়তাম। দাদুর কাছে গল্প শুনতাম। তিনি বলতেন — ‘বুঝলে দাদু ভাইরা, আমি তখন সতেরো-আঠারো বছর বয়সি। গায়ে ভীষণ জোর। বাবা দেবনাথপুরের এক বিয়েতে চার মণ দইয়ের বায়না পেয়েছে। বাঁকে করে দু’মণ করে দই নিয়ে দুই বাপ-ব্যাটা সন্ধ্যার সময় বেরিয়েছি। খরে নদী পেরিয়ে ঘণ্টা খানেকের পথ। তো জল থেকে চাপাগাড়ার মাঠের পথ যেই ধরেছি এক হায়না পিছন ধরলো। বাবা কয়েকবার ছেই ছেই করে আওয়াজ দিলো। কিন্তু নাছোড় হায়না পিছু ছাড়লো না। অন্ধকারে তার দুচোখ জ্বলছে। আমার আর সহ্য হলো না। বাঁক থেকে দইয়ের হাঁড়ি গুলো নামিয়ে বাঁক টাকে নিয়ে বাগিয়ে দাঁড়ালাম। বাবা এগিয়ে গেছে অনেকটা। হায়নাটা কাছে এসে লাফিয়ে পড়তেই বাঁকদিয়ে উদোম পেটাতে শুরু করলাম। নেতিয়ে পড়লো হায়না। রক্তে ভেসে গেলো বাঁক। পাশের এক খাদের জলে ধুচছি এমন সময় বাবার হাঁক শুনতে পেলাম। চিৎকার করে বললাম আসছি।’ এসব শুনতে শুনতে দু’ভাই দাদুকে জড়িয়ে ধরেছি। মা এসে বললো – তোরা দুটো কি আমার বাবাকে একটু ঘুমাতে দিবি না?’ সে কথা শুনে দাদুকে ছেড়ে ঘুমানোর ভান করতে করতে ভানু বাবু অস্ত গেলেন।

পরের দিন সকাল সকাল মামার বাড়ি যাত্রা। দাদু মায়ের ব্যাগ নিয়েছে। আমরা দু’ভাই মায়ের দু’হাত ধরেছি। গ্রাম থেকে মষেগাড়ির মাঠ পেরিয়ে বড় আন্দুলিয়ায় গিয়ে পাটিকাবাড়ির বাস ধরে তেহট্ট ঘাটে গিয়ে নামতে হবে। তারপর নৌকাতে করে জলঙ্গী নদী পাড় হতে হবে। বাসে উঠলেই আমার বমি হতো । তাই মা সঙ্গে লেবু পাতা নিয়ে যেতো। বমি বমি ভাব হলেই মা লেবু পাতা শুঁকতে বলতো। লেবুপাতা করমচা যা বৃষ্টি ছেড়ে যার মতো আমার বমি বমি ভাব কেটে যেতো। বাস থেকে নেমে দাদু আমাদের মিষ্টির দোকানে নিয়ে যেতো। প্লেটে রাখা রসগোল্লা চামচ বাগিয়ে ধরে কেটে কেটে খাওয়া। কিন্তু শেষ টুকরোটা কিছুতেই চামচে করে তুলতে পারতাম না। অগত্যা হাত লাগাতাম। পেট ভরে মিষ্টি খেয়ে পাড় ঘাটাতে গিয়ে দাঁড়াতাম। পাটনির কাছে দাদু পয়সা দিয়ে আসতেন। নৌকায় উঠে মাকে ধরে দু’ভাই বসে পড়তাম। মাঝি লগি ঠেলে ঠেলে নৌকা এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। কাচের মতো স্বচ্ছ জল। জলের মধ্যে শ্যাওলা আর ছোটো মাছেদের নড়াচড়া। নীল আকাশে উড়ে যাচ্ছে পাখির দল। পাড়ের মাচায় মৃদু ধাক্কা খেয়ে নৌকা ভিড়তেই সবার সঙ্গে আমরাও নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। পিচ রাস্তার দুদিকে মাঝে মাঝে কোথাও বাড়ি-ঘর, কোথাও আম-কাঁঠালের বাগান, কোথাও আখের ক্ষেত, কোথাও রাস্তার পাশে বুড়ো বটের নীচে বিশালাকার মাচা। এসব পেরিয়ে পাকুড় তলার পাশ দিয়ে বাঁয়ে নেমে গেলেই মামার বাড়ি। পথেই অন্যান্য দাদু, দিদা বা মামাদের সঙ্গে সাক্ষাত ঘটে যেতো।

মামার বাড়ি গিয়েই ছুট লাগাতাম সেজ মাসির বাড়ি। মাসির ছেলে বাঁশি দাদা আমার খেলার সঙ্গী। আর অন্যান্যদের মধ্যে ছিলো তাপস আর সঞ্জয়। এই চারজন যেন পটল ডাঙার চার মূর্তি। মাঠে-ঘাটে-বাটে চলতো নানান অভিযান। মাঠে গিয়ে আখের ক্ষেতে ঢুকে যেতাম। মনের সুখে ইক্ষু চর্বণ করতে করতে দেখতাম শিয়ালের দল আমাদের দিকে অবাক তাকিয়ে। কখনো বাঁশি দাদাদের বাগানে গিয়ে উঠে যেতাম কাঁঠাল গাছে। টিপে টিপে খুঁজে বার করতাম পাকা কাঁঠাল। গাছের উপরে বসেই চারজনে ভাগ করে খেতাম ।না, পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া তখনো শিখিনি। কখনো চারজনে চলে যেতাম নদীতে। তীরে বসে বালি ভাস্কর্যে হাত পাকিয়ে সুদর্শন পট্টনায়ক হয়ে উঠতাম। রবি ঠাকুরের ছুটি গল্পের ফটিক ও তার দলবলের মতো খেলতাম নানান খেলা। গামছাতে ছাঁকা দিয়ে ধরতাম চিংড়ি বা ময়া মাছ। জুংড়া পাতে রাখতো অনেকে। জুংড়া ঝেড়ে পেয়ে যেতাম নানান মাছ। কালো শুশকের দল ভেসে উঠেই ডুব দিতো জলে। ভেসে যেতো ছই লাগানো জেলে নৌকা। মোষের লেজ ধরে অনেকে সাঁতরে পার হয়ে যেতো নদী। নদী থেকে ফিরতেই দিদা আবার তেল মাখিয়ে স্নান করিয়ে দিতো।

দুপুরে খাওয়ার পর দিদা পান খেতেন। আমি গিয়ে পাখির ছানার মতো হাঁ করতাম। তিনি পানের পাতা ছিঁড়ে ঢুকিয়ে দিতেন মুখে। এরকম করতে করতে কেটে যেতো দশ-পনেরো দিন। বাবা আনতে যেতো। মার মুখ ভার হয়ে যেতো। মহাকালের মতো বাবা বলতো ‘বেরোও গণেশ মাতা।’ মা বেরোনোর সময় ঘরের দরজার পিছনে গিয়ে কাঁদতে শুরু করতো। ছোটো মাসি, দিদা তারাও যোগ দিতো সে কান্নার সঙ্গে। আসতে আসতে মা বার বার পিছন ফিরে তাকাতো যতক্ষণ বিদায় জানাতে আসা স্বজনদের দেখা যায়।

কবেকার কথা সব। তবে কথার কথা নয়। মর্মগাথা।  আমার সেই মামা বাড়ির তিন বন্ধু বাঁশি দাদা, তাপস আর সঞ্জয় তারা আজ আর কেউ বেঁচে নেই। তিন জনেই বিভিন্ন সময়ে ত্রিশের কোঠায় পৌঁছানোর আগেই আত্মহত্যা করে। এখন মামার বাড়ি গেলেই খুঁজে ফিরি হারানো শৈশবের স্মৃতিদের। সেই নদী, মাঠ, বাগান আজো আছে । আর আমি আছি। জীবন্মৃত হয়ে।

(ক্রমশ)
সুপ্রিয় ঘোষ
+ posts

নদীয়ার চাপড়া বড়ো-আন্দুলিয়া সংলগ্ন আলফা গ্রামে সুপ্রিয় ঘোষের জন্ম। অঞ্চলসংস্কৃতি উৎসাহী ও সন্ধিৎসু সুপ্রিয় আড়ালেই সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে তাঁর কাজ করে চলেছেন। তাঁর প্রকাশিত বই 'নদীয়ার হাট-হদ্দ'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *