আহাম্মকের খুদকুড়ো। পর্ব ৫। গোতা গোতা দুতো দুতো দিম ও জলখাবারের সমারোহ। লিখছেন দুর্লভ সূত্রধর

গোতা গোতা দুতো দুতো দিম

ডিমের কথাই যখন উঠল তখন বলে রাখা ভালো – তখনও ডিম্ব-বিপ্লব সংঘটিত হয়নি – ‘মান্‌ডে কি সানডে রোজ খাও আন্ডে’ শ্লোগান চালু করার মতো গাঁটের জোরও ছিল না কারও।

তখন বাজারে হাঁস-মুরগির ডিম নিয়মিত পাওয়া যেত না – বাড়ি বাড়ি গৃহস্থ-ব্যাপারীরা ডিম দিয়ে যেত।

ডিম হলো সর্বকালের সর্বপ্রিয় এক অত্যাশ্চর্য খাবার। আমরাও বয়স-নির্বিশেষে ডিমাক্রান্ত ছিলাম।

কিন্তু খাবার পাতে ডিম পেতাম আধখানা। একটা গোটা ডিম যে খাওয়া যায় তা ছিল ধারণার অতীত। মা ডিম সিদ্ধ করে খোলা ছাড়িয়ে একটা সুতো দিয়ে দু-ভাগ করে দিতেন। এত নিখুঁত ভাগ আচ্ছা আচ্ছা ভাগাভাগির কারবার‍িরাও করতে পারতেন বলে মনে হয় না। খাবার সময় ভাইবোনেদের মন-কষাকষি, চোরাগোপ্তা মারপিট ঠেকাবার জন্যই মাকে কোনো গজ-ফিতে ছাড়াই এমন নিখুঁত মাপ অভ্যাস করতে হয়েছিল। সকলেই জানেন যে, ডিমের সাদা অংশটা একদিকে থাকে মোটা। দুই-ভাগেই সাদা অংশ আর কুসুম সমান সমান করতে মা ডিমটিকে আড়াআড়ি নয় লম্বালম্বি ভাগ করতেন। একেই বলে কাণ্ডজ্ঞান। সংসারে গৃহিণীদের কাণ্ডজ্ঞানের জ্ঞানকাণ্ড ছিল পুরোপুরি সুরক্ষিত।

মা সেই অর্ধেক ডিমের কুসুমের দিকটা অটুট রাখার জন্য কুসুমের উপর একটু আটা বা চালের গুঁড়োর লেইয়ের প্রলেপ দিয়ে অর্ধ-ডিম্বগুলো তেলে ভাজা করতেন। ডিম ভাজার গন্ধে উচাটন হয়ে সন্ধেবেলায় অঙ্কের খাতায় সাধারণ যোগ-বিয়োগও ভুল হয়ে যেত। সামান্য পিঁয়াজ আর হলুদ দিয়ে ডিমের ঝোল নামক গরম তরলটি যখন ভাতের উপর পড়ত, তখন – যাকে বলে – ওফ্‌ফ্‌!

ডিমের টুকরোটিকে পাতের কোণে আগাগোড়া বাঁচিয়ে রেখে ঝোলের আলু দিয়েই দেড় থালা ভাত খাওয়ার প্রহসন – ওফ্‌ফ্‌! এখানে একেবারেই জনান্তিকে একটা কথা জানিয়ে রাখা যায় – বাঁচিয়ে রাখা ডিমের টুকরোটা সবার শেষে একটু একটু করে খেয়ে আমরা উঠে পড়তাম এবং এর পর মুখ কুলকুচি করায় আমাদের ভীষণ আপত্তি ছিল, কেননা তাতে মুখের ভেতরে, দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা ডিমের মহার্ঘ ভগ্নাবশেষগুলো জলের সঙ্গে বেরিয়ে যাবে যে!

আধখানা ডিমের বিপরীত-উদাহরণে জানিয়ে রাখা যাক আমাদের ইস্কুলের সুমিতাভদার কথাও।

আমাদের ইস্কুল ছিল প্রকৃত অর্থেই প্লেটোর নগররাষ্ট্রের থেকেও এক আদর্শ রিপাবলিক। উকিল-মোক্তার-ডাক্তার-অফিসার থেকে শুরু করে ছোটো ব্যবসাদার-ভেণ্ডার-বাজারের তরকারি বিক্রেতা-রিক্সাচালক-পরিচারিকা – সব পরিবারের ছেলেরাই আমাদের ইস্কুলে পড়তো। রুশ লোককথার ‘দাদুর দস্তানা’-র মতো সকলের সেখানে ঠাঁই ছিল। শহর-লাগোয়া আশেপাশের নতিপুর, খয়রা, শিমুলডাঙা, মায়াট, সুরুটি, সাহাপুর ইত্যাদি শহরতলির গ্রামগুলির, যেখানে তখনও স্কুলগুলোর দৌড় বড়োজোর জুনিয়ার হাই, অর্থাৎ ক্লাস এইট পর্যন্ত, সেখানকার ছেলেদেরও ক্লাস সেভেন-এইটের পর আশ্রয় ছিল আমাদের আমজনতার বিদ্যালয়টি। যথাসম্ভব অনভিজাত হওয়ায় আমরা আমাদের ইস্কুল নিয়ে নিশ্চিন্ত আরামে ছিলাম।

সেবার বছরের মাঝখানে একটি ছেলে এসে আমাদের উপরের ক্লাসে ভর্তি হলো। নতুন কোনো ছেলে ভর্তি হলে তখন কিছুকাল সে গোটা ইস্কুলের কৌতূহলী নজরে থাকত। শোনা গেল সে নাকি আমাদের শহরে নবাগত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পুত্র। বড়ো সরকারি অফিসার, বছরের মাঝখানে বদলি হয়ে এসেছেন বলে তাঁর ছেলে নিয়মমাফিক বছরের মাঝখানেই ভর্তি হতে পেরেছে।

সকলের সঙ্গে আমরাও উঁকি দিয়ে নবাগত জীবটিকে দেখে নিলাম।

নেহাৎই গোলগাল ভালোমানুষ চেহারা, শুধুমাত্র পোশাকে ঈষৎ বড়োমানুষী। করোর দিকে তাকিয়ে ঈর্ষা করবার মতো আত্মবোধের চর্চা ছিল কম। বরং এমন একজন আমাদের এই ‘গোরুর গোয়ালে’ ভর্তি হওয়ায় আমাদের বেশ একটা গর্বিত-আনন্দই হলো বলা যায়।

সুমিতাভদা মুখ খুলতে বোঝা গেল একটু ত ত করে কথা বলে সে। এক ক্লাসের সিনিয়ার দাদা – হাসাহাসি তো আর করতে পারি না! বরং ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের ছেলে বলে অনেকেই তার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টায় খামতি রাখেনি।

কয়েকদিনের মধ্যেই সুমিতাভদা ইস্কুলে বিখ্যাত হয়ে গেল, এবং তা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অকল্পনীয় এক কারণে।

সেদিন টিফিন পিরিয়ডে আমরা অন্যদিনের মতো ইস্কুলের ভাঙা পাঁচিলে বসে কেউ চালভাজামাখা চিবোচ্ছি, কেউ-বা ঘুগনির শালপাতা চাটছি প্রাণপণে, কেউ কেউ সেসব না-পেয়ে অথবা শেষ করে এর-ওর হাতে ঠোক্‌-পাড়ার পর একটু দৌড়োদৌড়ি করছি – এমন সময় সুমিতাভদাকে দেখে আমাদের ক্লাসের খয়রা-মানিক (শহরতলি খয়রা গ্রামের ছেলে, আরও দু-চারটি মানিক থাকায় তার এমনদারা নামকরণ হয়েছিল, যেমন সাহাপুরের মানিক ছিল সা-মানিক ইত্যাদি) সুমিতাভদার দিকে হাতের চালছোলা ভাজার ঠোঙা বাড়িয়ে দিয়ে একটু খাওয়ার অনুরোধ জানাতেই সুমিতাভদা দাঁড়িয়ে পড়ে নাভির ওপর বাঁ হাতটা রেখে বলে উঠল বেশ নাটকীয়ভাবে – ‘পেতে আজ জাগা নেই রে।’

সে বয়সে আমাদের সবার পেটেই সারাদিন খাণ্ডবদাহন, আর ওর পেটে জায়গা নেই!

–‘জানিস, আজ গোতা গোতা দুতো দুতো দিম খেয়েছি।’

উরি ব্বাস্‌! গোটা ডিম! তা-ও আবার দুটো, একসঙ্গে!

অতি দ্রুত ‘সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে’ – সুমিতাভ গাঙ্গুলি আজ গোটা গোটা দুটো দুটো ডিম খেয়ে ইস্কুলে এসেছে। সবাই, সব ক্লাসের ছেলেরা রুদ্ধবাক্ হয়ে সুমতাভদাকে ঘুরে ঘুরে দেখে যেতে লাগল।

শোনা গেল সুমিতাভদার ক্লাসের বন্ধুরা তাকে ঘিরে ধরে একসঙ্গে দুটো গোটা ডিম খাওয়ার অনুপুঙ্ক্ষ বিবরণী আদায় করে ছেড়েছিল।

আমাদের কাছে বহুকাল সে বিস্ময় জীবন্ত ছিল।

অনেককাল পরে বাইরে পড়তে গিয়ে ছেলেদের হস্টেলে প্রথম গোটা গোটা ডিম খেতে দেখি। তখনও মেয়েদের হস্টেলে অর্ধেক ডিমই চলছে, তাকে তবলা ভক্ষণ বলে ছেলেরা ঠাট্টা করত। পয়সা না থাকায় হস্টেলে ঠাঁই হয়নি। গেস্ট মিল খেতে গিয়ে প্রথম গোটা ডিম কীভাবে খেতে হয় তা জানতে পারি। প্রথমদিন বেশ সাবধানে গোটা ডিম ভেঙে একটু একটু করে খেতে শিখি। তখনও একসঙ্গে ‘দুতো দুতো দিম’ খাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। যখন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাস্তবে দেখা দিল, তখন স্বাস্থ্যের কারণে ডিম খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়েছে।

হস্টেলের ছেলেরা গোটা ডিম পেলেও ডিমের ঝোল নিয়ে সদাই ক্ষুব্ধ থাকত। অবশ্য হস্টেলের সব খাবার নিয়েই ছেলেদের অনুযোগের অন্ত ছিল না। হস্টেল বা মেসের খবারের সমালোচনা করাটা বোধহয় ছাত্রদের চিরকালের দস্তুর। পাতলা ঝোলের মধ্যে সঞ্চরমান ডিমটিকে ছেলেরা পুকুরের জলে সন্তরণরত রাজহাঁসের সঙ্গে তুলনা করত। কিন্তু নিশ্চিত ব্যাপার এই যে, সুমিতাভদাদের মতো দু-চারটি পরিবারের ছেলে ছাড়া বাড়িতে কারোরই গোটা ডিম  জুটত বলে মনে হয় না। তারাও হস্টেলে এসেই প্রথম গোটা ডিম খেতে এবং সেইসঙ্গে ডিমের ঝোলের সমালোচনা করতে শিখেছিল। তা না হলে ডিম তো ডিমই – ডিমের ঝোলের আবার ভালো মন্দ বিচার!

 

জলখাবারের সমারোহ

আসল কথা এই যে, বাড়িতে অর্ধেক ডিম বা তার জলবৎ লম্বা ঝোলের জন্য আমাদের কোনো আক্ষেপ তো ছিলই না বরং আমাদের পাওয়ার দিকটি ছিল পরিমাণে কম। কিন্তু সেই কমের মধ্যেও পাওয়াটা ছিল অনেক। অল্পের মধ্যে অনেকটা পাওয়ার এবং পেয়ে খুশি হওয়ার অসম্ভব ক্ষমতা ছিল আমাদের। তাছাড়া অর্ধেক ডিম খাওয়ার পরদিন থেকেই বাকি অর্ধেকের জন্য প্রতীক্ষা করার মধ্যে আলাদা রোমাঞ্চও ছিল।

মা সকালে পরিশ্রম করে বা পরিশ্রম বাঁচিয়ে – যেভাবে, যা দিয়েই জলখাবারের আয়োজন করুন না কেন, তা ছিল পরিকল্পনায় অতুলনীয়, বৈচিত্র্যে বিপুল এবং স্বাস্থ্যভাবনায় যুগান্তকারী।

সব জাতির খাদ্যাভ্যাসেরই একটি প্রধান যুক্তিবাক্য থাকে, যেমন: বাঙালির ডাল-ভাত বা মাছ-ভাত, বিহারীদের ডাল-রুটি, দক্ষিণ-ভারতীয়দের ইডলি-ধোসা-সম্বার, রাজস্থানীদের ডাল-বাটি, চুর্‌মা, ব্রিটিশদের ব্রেড-বাটার ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের জলখাবারের তেমন মূল ধারা ছিল – রুটি-আলুর তরকারি।

আলুর তরকারি কথাটা আসলে গৌরবে বহুবচনের মতো।

কালজিরে ফোড়ন, হলুদ আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে আলুর ঝোল।

ঝোলে ডুবিয়ে তিন-চারটে গৃহস্থ-মাপের আটার রুটি অনায়াসে খেয়ে নেওয়া যেত। ডিমের মতো আলুর টুকরোও বাঁচিয়ে রাখতে হতো পরে তারিয়ে তারিয়ে খাওয়ার জন্য।

রুটির সঙ্গে দেওয়া আলুর তরকারিতে মাঝে মাঝে অসামান্য বৈচিত্র্য আনা হতো – জিরি জিরি লম্বা করে কেটে ঐ একই মশলা দিয়ে রসা রসা করে চচ্চরি বানিয়ে। এই আলু-চচ্চরির বৈচিত্র্য দেখা যেত যেদিন বাটির মধ্যে অল্প তেল দিয়ে জিরি জিরি করে কাটা আলু ছেড়ে দিয়ে সামান্য হলুদ দিয়ে ঢিমে আঁচে বসিয়ে রাখা হতো। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সেই আলু সিদ্ধ হয়ে, রসা হয়ে হয়ে উঠত বাটি চচ্চরি। একই জিনিস কিন্তু স্বাদে-গন্ধে যোজন ফারাক যেন!

রুটির সঙ্গে আরও এক-ধরনের আলুর তরকারি তৈরি হতো। ফোড়ন ছাড়াই অল্প তেলে আলু ছেড়ে দিয়ে সামান্য সাঁৎলে বেশি করে জল দিয়ে সেদ্ধ করে সামান্য একটু ঘেঁটে দিয়ে নামিয়ে তার ওপরে গোলমরিচ ছড়িয়ে দেওয়া হতো। হলুদ ছাড়া সেই সাদাটে তরকারিতে দু-চামচ ঘি দিয়ে মিনিট দশেক ঢেকে রাখা হতো। তারপর বাটিতে করে পরিবেশিত হতো। গরম বা ঠাণ্ডা যে রুটিই হোক এ তরকারি দিয়ে তা যারা খেয়েছেন তারা জানেন – সে যে কী ইন্দ্রজাল!

আলুসেদ্ধ দিয়ে ভাত খাওয়ার ব্যাপারটা না থাকলে অধিকাংশ বাঙালি অফিসযাত্রীকে অভুক্ত অবস্থাতেই অফিস যেতে হতো। কিন্তু খোসাসুদ্ধু আলুসেদ্ধ মাখা দিয়ে আমাদের রুটি খেতে হতো। আর তার স্বাদ ছিল যাকে বলে ডি লা গ্র্যাণ্ডি!

কোনোদিন কদাচিৎ অল্প তেল দিয়ে আলুভাজা হলে আর কোনো কথা নেই, আনন্দ-রসনায় আমরা তো নির্বাক!

কিন্তু কথা নেই বললে তো আর চলবে না। তার পরেও অনেক কথা ছিলই। সকালবেলা রুটির পাতে শেষ অনুপান হিসেবে কখনও কখনও পাওয়া যেত আচার। তেঁতুলের বা আমের। পাকা তেঁতুল চটকে বিচিগুলো ফেলে কাইটা আখের গুড় দিয়ে জ্বাল দিয়ে হরলিক্‌সের খালি কাচের শিশিতে ভরে রাখা হতো, আর কাঁচা আম খোসা ছাড়িয়ে আঁটি ফেলে দু-একদিন কড়া রোদে দিয়ে একইভাবে গুড় দিয়ে জ্বাল দেওয়া হতো। তাই রুটির পাতে এক চামচ দেওয়া হতো। রুটির শেষ টুকরোটা আচার দিয়ে খাওয়া হতো। এ পুরো কর্মকাণ্ডটা ছিল মেজদির অধীনে। আচার তৈরি, বিতরণ আর দুর্বৃত্তদের হাত থেকে তা রক্ষা করা – এর সবটাই মেজদিকে করতে হতো। শেষের কাজটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। অধিকাংশ পরিবারেই তখন স্টিলের দূরের কথা একটা ভালো কাঠের আলমারিও ছিল না। তবু মেজদি আচারের বোতলগুলো লুকিয়ে রাখত ঠিকই। আচার তৈরি থেকেও পরের কাজটা ছিল নিঃসন্দেহে আরও কঠিন। মাঝে মাঝে বোতলগুলোকে রোদে দিতে হতো। সেদিনটা ছিল মেজদির কাছে অগ্নিপরীক্ষা। বাঁ-হাতে ইতিহাস বই ধরে ঠায় ছাতে রোদে বসে থাকা! জলখাবারের পরিপাটির জন্য এই সাধনা – ভাবা যায়! তবু পাতে সেই আচার পেয়ে আমরা যতটা পুলকিত হতাম ততটা স্থায়ীভাবে খুশি হতাম না। প্রথমত আচারের পরিমাণ আমাদের তৃপ্ত করার বদলে আরও ক্ষিপ্ত করত, দ্বিতীয়ত মেজদি যতই রেশনিং করুক সবাই মিলে আচার খেলে আর ক’দিন থাকে আচারের ভাণ্ডার? আচার দেওয়ার সময় প্রত্যেকদিন আমরা ক্রম-খালীয়মান শিশির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তাম, প্রাণটা হায় হায় করত। শীতকালে যখন আচারের বদলে পাতের কোণে অনুপান হিসেবে ঝোলা খেজুরের গুড় বা পাটালির টুকরো থাকত, চেটেপুটে গুড়-পাটালি খেয়েও অন্‌-আচার (আচার না থাকলে আমরা বলতাম – ‘আজকে অনাচার চলছে’) পাতের জন্য তখন মেজদির ওপর বেজায় রাগ হতো – অকৃজ্ঞতা আর কাকে বলে!

এত ধরনের আলুর তরকারির কথা শুনে কেউ যেন ভেবে না বসেন যে, নিত্যি গরম রুটির সঙ্গে রসনামাফিক আলুর তরকারি জুটত।

বছরে দু-এক দিন বেগুনভাজা পাওয়া যেত। শীতকালে বেগুনভাজার সঙ্গে খেজুরের গুড়! এ-সময় খেজুরের গুড় রুটির সঙ্গে অনুপান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বেগুনভাজার টুকরোর সঙ্গে গুড় মাখিয়ে রুটির সঙ্গে তা মুখে পুরতে হতো! এই প্রক্রিয়াটি কার নিরীক্ষার ফল ছিল জানা নেই – কিন্তু সে ছিল এক অসামান্য কম্বিনেশন। বাঁধাকপির তরকারির সঙ্গেও খেজুরের গুড়ের এ কম্বিনেশন যথেষ্ট সফলতা পেয়েছিল!

শীতকালে দু-একদিন ফুলকপি বা বাঁধাকপির তরকারি, গরমকালে ভাজা-মশলা দেওয়া আলু-কুমড়োর ঝোল। রুটির সঙ্গে ফুলকপির তরকারি কিন্তু প্রথাগত ফুলকপির ডালনা নয়। ফুলকপি একেবারে ছোটো ছোটো করে কেটে তার সঙ্গে একই সাইজের আলুর টুকরো আর গাজরের টুকরো (মা দিদিদের পই পই করে এক এক ধরনের তরকারির জন্য এক এক সাইজে সবজি কাটার ট্রেনিং দিতেন, তাতেই নাকি তরকারির স্বাদে হেরফের হতো) দিয়ে অল্প তেলে পাঁচফোড়ন আর সামান্য হলুদ দিয়ে একটু সাঁৎলে তারপর ঢাকা দিয়ে দিয়ে সেদ্ধ করা হতো। এই তরকারি উনোনে চাপালে তার গন্ধ শীতের ভারি বাতাসে সারা বাড়িময় উড়ে বেড়াতো। বাড়িতে যতই পাঁচপোড়নের স্টক থাকুক এ তরকারির জন্য আলাদা করে টাটকা পাঁচফোড়ন আনানো হতো। তাছাড়া জলখাবারে, বিশেষভাবে গরমের সকালে রুটির সঙ্গে আখের গুড় বা ভেলি গুড় আর শীতকালে খেজুর গুড় বা পাটালি। কিছু না থাকলে চিনি দিয়ে কিংবা বাটিতে জলে চিনি গুলে সেই চিনি-জল দিয়ে রুটি ভক্ষণের এক অসামান্য রেসিপি প্রয়োগ করা হতো। ভেলিগুড় খাওয়াটা ছিল এক ঝকমারি এবং খুবই পরিশ্রমের ব্যাপার। তখন দোকানে ভেলি গুড় আসতো পাতলা জ্যালজ্যালে চটের বস্তায়। ফলে ভেলি গুড়ের গায়ে অসংখ্য পাটের ফেঁসো একেবারে লেপটে থাকতো, সেগুলো একটা একটা বেছে তবে মুখে দেওয়া যেত, আর পরিষ্কার না করে মুখে দিলেই পেট ছাড়তো। কুঁড়ের দল অনেকেই ভেলিগুড় বর্জন করে অন্য কোনো উপায়ে – নুন-কাঁচালঙ্কা বা একটু কাঁচা পিঁয়াজ জোগাড় করে – রুটি গলাধঃকরণ করতো। খারাপ কোনোকিছু ফেলে দেওয়ার রীতি ছিল না বলে আগের দিনের বাসি রুটিও প্রাপ্তব্য অনুপান সহযোগে খেতে হতো। বাসি রুটিতে মা গুড় দিয়ে মুড়ে ব্রেড রোল বানিয়ে আমাদের ছোটোদের হাতে ধরিয়ে দিতেন – এতে তাঁর সময়, শ্রম, শরীর বাঁচত এবং সংসারের ডাইনে-বাঁয়ের হিসেব মেলানোরও সুবিধে হতো। যেদিন সকালে বাড়িতে-পাতা দই দিয়ে বেলের সরবত হতো আর ঘটনাক্রমে বাসি রুটিও থাকত সেদিন রুটি পাকিয়ে বেলের সরবতের গ্লাসে ডুবিয়ে খেতাম আমরা। মনে রাখতে হবে – বেলের সরবতের সঙ্গে বাসি-রুটিই চাই – টাটকা বা গরম রুটি এক্ষেত্রে একেবারে অচল। এমন ব্রেকফাস্ট আর পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হয়নি – পেটরোগা, অরুচি বা অগ্নিমান্দ্যে আক্রান্ত অথবা রসনা-রসিক যে-কেউ এ খাবারটি পরীক্ষামূলকভাবে চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

শীতের তিনমাসে সকালে অন্তত তিন-চার দিন আমরা মুলোর অম্বল খেতাম। বড়ো, মোটা ও লাল, যাকে আমাদের শহরে বলা হতো বাঙ্গিডাঙ্গার মুলো, তা পাতলা চাকা করে কেটে, চালতা-থেঁতো, কাঁচা তেঁতুল, নারকেল কোরা সরষে ফোড়ন দিয়ে মুলোর অম্বল নামক যে বস্তুটি খেতে পেতাম তার রেসিপি গ্রামে-গঞ্জে আজ আর বেঁচে আছে কী-না জানা নেই।

শীতকালে খেজুরের গুড়ের সৌজন্যে পায়েস তো হতোই মাঝেমধ্যে – তাছাড়া এর-ওর জন্মদিনে। মনে রাখা দরকার : সম্ভবত আর্থিক কারণেই জন্মদিনে নতুন জামা-কাপড় বা দামি উপহার দেওয়ার আদিখ্যেতা তখনও মধ্যবিত্ত সংসারগুলিতে প্রবেশ করেনি।

মা আগের দিন রাত্রে পায়েস বানিয়ে প্রত্যেকের জন্য আলাদা বাটিতে বেড়ে রাখতেন। শহরের কর্কটক্রান্তীয় ঠাণ্ডায় বাটিতে সেই পায়েস জমে যেতো। সকালে এক-একটি বাটি মা এক-একজনের হাতে ধরিয়ে দিতেন। আমরা সেই পায়েসের ওপর ছড়িয়ে নিতাম মুড়ি — মুড়িই হলো পৃথিবীর সেরা এবং সস্তা ফাস্টফুড। মুড়ি ছাড়া পায়েস ছিল কল্পনার অতীত। আর এখন পায়েসের সঙ্গে মুড়ির কম্বিনেশন অতি বিরল এক অভ্যাস বলে মনে হয়। আমাদের মতো সকাল সকাল তো আর মায়ের জলখাবার খাওয়ার সময় হতো না। বাবা ডিস্পেন্সারি চলে যাবার পর মা একটু মুখ তুলে তাকাবার অবকাশ পেতেন। ফলে একটু বেলার দিকে তিনি নিজের জন্য এক কাপ চা তৈরি করে খেতেন। সেউ চায়ে তিনি মুড়ি ছড়িয়ে নিতেন, চা টুকু পান করতে করতে দফায় দফায় দু-তিন মুঠ মুড়ি ছড়ানো হতো। ব্যাস, ওটাই ছিল মায়ের জলখাবার। এই বস্তুটি সেসময় আমাদের চেখে দেখা হয়নি, কেননা আমাদের চা খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। কোনো অতিথি না এলে সারাদিনে ঐ এক কাপ চা-ই বাড়িতে তৈরি হতো।

মুড়ির কথাই যখন উঠল তখন সকালের জলখাবারের সুযোগ মতো ফাস্ট ফুড সেলিব্রেশনের কথাও জড়ো করে রাখা যেতে পারে।

সেটা দু-রকমের ছিল – ন্যাচরাল আর মেকিং।

প্রথমে ন্যাচরাল – পায়েসের মধ্যে মুড়ি ফেলে খাওয়া বা কোনো অনুপান দিয়ে মুড়ি জলসহ মাখা ছাড়া কখনও, অতি দুর্দিনেও আমরা সকালে শুকনো মুড়ি খাইনি। কীভাবে ও কেন জানা নেই মুড়ি বিকেল বা সন্ধ্যার সময় ছাড়া খাওয়ার প্রথা বা ধারণা আমাদের ছিল না। সকালে মুড়ির জায়গায় ছিল চিঁড়ে, কাঁচা চিঁড়ে। চিঁড়ে জলে ভিজিয়ে যেদিন যেমন অনুপান জুটত তাই দিয়ে মেখে ফেলতো মেজদি – নারেকেল কোরা, কলা, আমের দিনে আম, চিনি, আখের গুড়, খেজুরের ঝোলা বা পাটালি গুড়, কাঁঠালের রস ইত্যাদি। এগুলো সব একসঙ্গে জুটত বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। সুতরাং বলা উচিত – যা জুটত, শুধু চিনি বা গুড় দিয়ে, শুধু চিনি আর পাতি লেবুর রস দিয়ে, চিনির অভাবে পাতি লেবুর রস আর নুন দিয়েও আমাদের চিঁড়ে মাখা খেতে হযেছে। যদিও মেজদির মাখার হাতে ছিল জাদু, তবু সবসময় তো আর রসনা সহযোগিতা করতো না, ফলে মাঝে মাঝে বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়ে আমরা কেউ কেউ দাঁতের কষ্টের তোয়াক্কা না করে একেবারে শুকনো চিঁড়ে চিবিয়ে খেতাম, সঙ্গে থাকতো ভেলি গুড় বা ঐ জাতীয় কিছু, ব্যাস!

এই মাখা-মাখির মধ্যেও অতি-বিরল ট্যুইস্ট ছিল।

সেটা দিদিমা এলে তৈরি হতো। বড়ো-দানার সাবু রাত্রে ভিজিয়ে রাখা হতো। সকালে আমের দিনে আম বা/এবং কলা, নারকেল কোরা, চিনি/গুড় ইত্যাদি, যখন যেমন জুটতো – দিয়ে মাখা হতো। দিদিমা খেতেন তো দু-চামচ, কিন্তু আমাদের সকলের জন্য তা পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রস্তুত করা হতো। দিদিমা যতদিন থাকতেন ততদিন এই অমৃতটি জলখাবার হিসেবে পাওয়া যেতো। দিদিমা চলে গেলেও তা রেশ থেকে যেতো অনেকদিন।

মেকিং ফাস্ট ফুড ছিল বর্ণময়। তার এক নম্বরে ছিল চিঁড়ের পোলাও। আসলে ব্যাপারটা ছিল ছোটো ছোটো করে কাটা আলুভাজার সঙ্গে ভিজে চিঁড়ে অল্প-ভাজা পিঁয়াজ হলুদে নাড়া। সঙ্গে পরিমাণ মতো নুন আর মিষ্টি দেওয়া থাকতো। তাতে সম্ভব হলে গোটা গরম মশলা দেওয়া হতো। এই খাবারটি মেজদি বছরে এক-আধদিনের বেশি বানাতো না, তার কারণ এটি হলে সকলের চাহিদার চাপে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো যা সামাল দেওয়া ছিল কঠিন। চিঁড়ের পোলাওয়ের মতো করেই তৈরি হতো ভাতভাজা। আগেরদিন রাতে বেশি করে চাল নিয়ে বাসিভাত রেখে তাই দিয়ে ভাতভাজা তৈরি হতো। টোকে আমরা বলতাম দেশি পোলাও। শুধু এতে গরম মশলা দেওয়া হতো না।

সকালের জলখাবারের প্রসঙ্গে খিচুড়ির কথাও বলতে হবে। সকালে যেমন মুড়ির চল ছিল না, তেমনি দিনের বেলায় খিচুড়ির চল ছিল না আমাদের বাড়িতে। আমরা জানতাম খিচুড়ি মানেই সেটা রাত্রে খেতে হয়। বিশেষ করে শীতকালে ছোট ছোট নতুন আলু দিয়ে খিচুড়ি রান্না হতো বেশি করে। পরের দিন সকালে জমে যাওয়া বাসি খিচুড়িই হতো আমাদের জলখাবার। জমে যাওয়া খিচুড়ির মধ্যে যার পাতে আলু আবিষ্কৃত হতো সে তখনই আর্কিমিডিসের মতো উল্লাসে বিস্ফারিত হতো – ইয়াহু! ইউরেকা!

মাঝে মাঝে একইভাবে রাত্রে বেশি ভাত রান্না করে পরের দিন বাসিভাতে জল ঢেলে কাঁচা পিঁয়াজ-কাঁচা তেল-নুন-লঙ্কা-লেবুপাতা চটকে মেখে দিতো মেজদি – জলখাবারের ক্ষেত্রে সে-এক অসামান্য অভিজ্ঞতা!

সাংসারিক ওঠা-পড়া এবং আয়-ব্যয়ের টানাপোড়েনে জলখাবারের চেহারা বদল হতো। মায়ের ব্যস্ততা, দিদিদের পরীক্ষার পড়াশুনো বা শরীর খারাপ থাকলে এবং আর্থিকভাবে সম্ভব হলে সকালে বহুদিন পাউরুটি আসত। সঙ্গে পলসন বাটারের কৌটো। (পলসন নামটির সঙ্গে মানানসই বলে আমরা কখনও মাখন বলতাম না – ‘পলসন’ মানেই ‘বাটার’) এই আশ্চর্য  ব্র্যাণ্ডটি এখন পাওয়া যায় কিনা জানা নেই। পলসন বাটারের কৌটো কেটে সবটা মাখন বের করে মা একটা বড়ো চিনামাটির বাটিতে জল দিয়ে তার মধ্যে ছেড়ে দিতেন। জলের মধ্যে মাখন ভাসতে থাকতো – সেটাই ছিল মায়ের কাছে ঠাণ্ডা আলমারির বিকল্প। পলসনের স্বাদ কেমন ছিল তা বোঝা যেতো যখন আমরা ছোটোরা সবাই পাঁউরুটিতে মায়ের মাখানো বাটার চেটে খেয়ে তবে তাতে চিনি লাগাতাম! পাউরুটির সুবিধা ছিল এই যে, সঙ্গে কিছু না থাকুক একটু মাখন আর চিনি মাখিয়ে কিংবা শুধু চিনি গোলা জল দিয়েও দিব্যি খাওয়া যেত। শীতে সুকুমার রায়ের সেরা খাবার পাউরুটি আর ঝোলা গুড়। তখন পাঁউরুটির মান বা কোয়ালিটি এবং আকারের বিরাট বৈচিত্র্য ছিল। ছোটোমাপের কোয়ার্টার রুটি লম্বালম্বিভাবে কেটে দু-টুকরো করা হতো। অতো বড়ো বড়ো সংসারে স্লাইজ-পাঁউরুটিতে কুলাতো না বলে বড়ো পাউণ্ড পাঁউরুটি কেনা হতো। তিনকোণা পাঁউরুটিও তখন পাওয়া যেতো যত্রতত্র। শুধু আকার নয় প্রকারেও অনেক বৈচিত্র্য ছিল। মূল বিভাজন ছিল – স্থানীয় বেকারির পাঁউরুটি আর কলকাতা থেকে আমদানি করা গ্রেট ইস্টার্ণ আর ফিরপোর পাঁউরুটি। শহরের অভিজাতরা কলকাতার পাঁউরুটি খেতেন আর স্থানীয় পাঁউরুটি ছা-পোষারা। সবার উপরে – সেঁকা পাউরুটিতে মাখন বা দুধের সর মাখিয়ে চিনি ছড়িয়ে খাওয়াটা ছিল টোস্টের ফুলকোর্স।

সকলে সহমত হবেন না – কিন্তু পাঁউরুটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রুটির মাথা। দোকানে সাধারণভাবে টোস্ট বানাবার আগে রুটির মস্তকটিকে ছেদন করা হতো। সে নিয়ে আমাদের আপশোষের সীমা ছিল না। বাড়িতে পাঁউরুটি খাওয়ার সময় আমরা সেই ত্রুটি যথাসাধ্য সংশোধন করে নিতাম। ডিমের মতোই পাঁউরুটির মাথাগুলো আমরা শেষে খাওয়ার জন্য বাঁচিয়ে রাখতাম। মাথাটা যত পোড়া হতো ততই তার স্বাদ। মূলত এ কারণেই স্লাইজ রুটি পারতপক্ষে আমরা পছন্দ করতাম না, স্লাইজ রুটির তো আর মাথা থাকে না।

সকালের জলখাবারে আমরা আর-একট বস্তু পেতাম, সেটা ছিল বুদ্ধি, শ্রম, কল্পনাশক্তির অসামান্য মিশ্রণ – আতপ চাল আগেরদিন রাতে ভিজিয়ে রেখে সকালে বড়ো ও ছোটো এলাচ, চিনি দিয়ে বেটে এক ধরনের তরল খাবার তৈরি হতো – একদিকে স্বাদে অসামান্য, অন্যদিকে রেশনে দেওয়া নিম্নমানের আতপচালের খুদগুলোও কাজে লেগে যেত।

শীতকালের সকালে জলখাবারে হামেশাই খুদের ফ্যানা-ভাত পাওয়া যেত। যত আলগোছে ফ্যানাভাতের কথা উঠল, ব্যাপারটা তত সহজ ছিল না । ফ্যানাভাত ছিল গৃহিণীদের মাস্টার প্ল্যান ও সাংসারিক প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফ্যানা-ভাতের মাধ্যমেই কাঁচা বা পোড়ানো শুকনো লঙ্কা দিয়ে ছোটোদের ঝাল খাওয়ার ট্রেনিং হতো – ঝাল না খেলে আর কে কবে বড়ো হতে পেরেছে!

এখন প্রশ্ন উঠবে এত খুদ পাওয়া যেত কোথায়? – তখন রেশনের তো বটেই বাজার থেকে কেনা চালেও প্রচুর পরিমাণে ভাঙা চাল বা খুদ, সাদা ও কালো কাঁকড়, কালো মরা চাল আর সুপ্রচুর ধান থাকত। ধান আর কাঁকড় বেছে, খুদ ঝেড়ে তবে ভাত রান্না হতো – তবু দাঁতের জোরের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য কাঁকড় থেকে যেত যথেষ্ট। বাড়ির ছোটো-বড়ো সকলকেই বাধ্যতামূলকভাবে চাল বাছতে হতো। বাড়ি বাড়ি ভাইদের দিদিদের পায়ে প্রচুর তৈলমর্দন করতে হতো ভাগের ভাগের চাল বাছার কাজটা দিদিদের দিয়ে করিয়ে নেওয়ার জন্য। দয়াবতী দিদিরা করেও দিত।

এই তৈলমর্দনের প্রথাটির ডাকনাম থিল ‘পকিয়ে-পাকিয়ে’ কাজ করানো। ‘পকিয়ে-পাকিয়ে’-র মতো বহু-ব্যবহৃত শব্দবন্ধের প্রকৃত মানে নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রবল ধন্ধ ছিল। শব্দটির ব্যাখ্যা সবচেয়ে ভালো ভাবে করেছিল আমাদের খয়রা-মানিক, বলেছিল – ‘পকিয়ে-পাকিয়ে’, অর্থাৎ বকে-বকিয়ে’ – ‘পকা’ শব্দটা এখানে ‘বকা’ শব্দের অপভ্রংশ বুঝলি কীনা – কাঁচা কাজকে অনুরোধ করে করে পাকা কাজে পরিণত করা। এর সমাস পক পক করে অর্থাৎ পকপকিয়ে, অর্থাৎ বক বক করে করে করে করে পাকানো। কন্টিনিউয়াস বা বহুকষ্টের বহুব্রীহি। এরই বিপরীতার্থক শব্দ কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো। অর্থাৎ কীনা অনুরোধ নয়, গায়েব জোরে পাকানো!’ এই ব্যাখ্যা শুনে নিজের হাতের বড়ো বড়ো থাবা দিয়ে সজোরে খয়রা-মানিকের পিঠ চাপড়ে দিয়ে আমাদের মায়া-বিশু (শহরের পাশের মায়াট গ্রামের ছেলে) বলে উঠেছিল – ‘ওফ, মানিক তুই না একটা ইসে, যাকে বলে একেবারে একটা প্রতিভা।’

(ক্রমশ)

দুর্লভ সূত্রধর
লেখক | + posts

লেখক ছদ্মনামের আড়ালেই থাকতে চান, তাই ছবি কিংবা পরিচিতি কিছুই দেওয়া গেল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *