আহাম্মকের খুদকুড়ো। পর্ব ৪। কুলে পোকা। লিখছেন দুর্লভ সূত্রধর

কুলে পোকা

বাড়ির কাছেই হলেও স্কুলে যাওয়া আমার পক্ষে সহজ হয়নি।

মেজদাকে স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে যাওয়ার কথা ওঠায় আমিও ভর্তি হবো বলে জেদ ধরে বসলাম। কান্নাকাটি।

প্রথমে স্কুলে যাওয়ার জন্য এবং পরে না যাওয়ার জন্য কান্নার মনীষীবাক্য যাবে কোথায়?

বাবা তো আমাদের দুই-ভাইকে নিয়ে গিয়ে দু’জনকেই একসঙ্গে প্রাইমারি সেকশনের ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করে দিলেন। মেজদা আমার থেকে ঠিক দু’বছরের বড়ো, আগের প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ওয়ান থেকে স্ট্যাণ্ড করে ক্লাস টু-এ উঠেছে – তবু তারও ক্লাস ওয়ান! স্কুলের খাতায় বাবার দেওয়া বয়স লেখা থাকায় আমার বয়সও বেড়ে গেল। তখনকার অভিভাবকদের ব্যাপারই ছিল আলাদা। তাঁরা ছেলেমেয়েদের অত গ্রাহ্য করতেন না – সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উথাল-পাথাল ব্যস্তও হয়ে পড়তেন না।

স্কুলে ভর্তি হতে পারায় আমার জেদ রক্ষা হলো বটে, কিন্তু প্রথম দিনেই বিপত্তি দেখা দিল। ক্লাসে অন্যমনস্ক হয়ে দরজা দিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকায় মাস্টারমশাই নামডাকার খাতা দিয়ে মাথায় টোকা দিয়ে বললেন – ‘মন থাকে কোথায়?’

এ গুরুতর প্রশ্নের উত্তর আমার জানা ছিল না। তিনিও এটুকু বলেই ক্লাসের অন্যপ্রান্তে চলে গেলেন। কিন্তু আমার ভয় ধরে গেল – এ-প্রশ্নের উত্তর তো আমার জানা ছিল না। আবার যদি জিজ্ঞেস করেন!

কবুল করতে লজ্জা নেই আজও এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয় – অন্যমনস্ক লোকেরা সারাজীবনে এই উত্তর খুঁজে পায় না।

সেদিনই আর-এক কাণ্ড ঘটল। টিফিনে ঘন্টা বাজবার পর দেখি যাদের কাছাকাছি বাড়ি তারা দৌড়ে যে-যার বাড়িতে খেতে যাচ্ছে। প্রথমদিন। ক্ষিদে পেয়েছিল জব্বর। আমিও দৌড় লাগালাম বাড়ির দিকে। কী খেয়েছিলাম মনে নেই। দৌড়ে স্কুলে ফিরবার পথে স্কুল-গেটের অদূরে ক্লাস বসার ঘন্টা বেজে গেল। আমি এক দৌড়ে স্কুলের মাঠে মুড়ি, আইসক্রিমের শেষাংশ খাওয়া বা ঘুগনির শালপাতা চাটা ছেলেদের কাটিয়ে ক্লাসে পৌঁছোতেই ক্লাসের একটা বড়ো ছেলে আমায় চেপে ধরল, চোখ পাকিয়ে বলে উঠল – ‘কোথায় গিয়েছিলি? ঘন্টা পরার পর ক্লাসে ঢুকেছ, দেখবে হেডস্যার কী করেন!’

ওরে বাবা! হেডস্যার! ভয়, ভয়! ভয়ার্ত এক বিভীষিকা সেই সাড়ে চার-পাঁচ বছরের বালককে ঘিরে ধরল।

মার খাওয়ার ভয় আমাদের ছিল না। মা-দিদিদের হাতে অমন পিটুনি খেয়েই থাকি। পর পর কয়েকদিন পিটুনি না খেলে বরং ফাঁকা ফাঁকা লাগে – কী নেই কী নেই মনে হয়। কিন্তু ওরে বাবা, হেডস্যার! অত ছেলের সামনে… অত ছেলের সামনে শাস্তির অপমান…! সে-যে শরীরের আঘাতের থেকে ঢের বেশি – কর্ণকে সূতপুত্র বলে সকলের সামনে ব্যঙ্গ করার থেকেও বোধ হয় বেশি।

পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে ভয়টা যে কত অমূলক তা বিচার করে দেখার ক্ষমতা বা অবকাশ ছিল না। ফলে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো, গলা শুকিয়ে যেতে লাগলো, জিভটাকে কেউ ক্রমাগত মুখের ভেতর দিকে টানছিল যেন। টিফনের পরের পিরিয়ডগুলিতে মাস্টারমশাইরা এলেন গেলেন, কত কথা বললেন, মধ্যপর্বগুলিতে ছেলেরা হৈ চৈ করছিল – আমার কানে কিছুই ঢুকছিল না। আমি শুধু ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছিলাম হেডমাস্টারমশাইয়ের ঘরের দিকে, উনি ঘর থেকে বেরিয়ে আমাদের ক্লাসের দিকে আসেন কী-না!

ব্যাস্‌! পরের দিন থেকে আমার স্কুল যাওয়া বন্ধ।

মেজদার বিবরণ শুনে সকলে বুঝলেন যে, মাস্টারমশাই আমার মাথায় নাম-ডাকার খাতা দিয়ে ঠোকা দিয়েছেন, সেই ভয়ে আমি স্কুল যেতে চাচ্ছি না। স্কুলে না যাওয়ার এ কারণটা কারোর কাছেই বিশেষ জোরালো বা গ্রহণযোগ্য বলে মনে হলো না। আসল কথাটা আর কাউকে বলা হলো না। কী জানি ঘন্টা পড়ে যাওয়ার পর স্কুলে ঢোকা কতবড়ো অপরাধ।

দিদিদের বোঝানো, মায়ের বলা ব্যর্থ হলো, যাব না তো যাবই না। শুধু সব শুনে বাবা বললেন – ‘আহা থাক না, ওকে জোর কোরো না, ওর যখন ইচ্ছে হবে যাবে-খন।’

বাবার উপরে আর কথা নেই।

মাঝে মাঝে দিদিরা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বা জোর করে স্নান করিয়ে খাইয়ে-দাইয়ে ছোড়দির সঙ্গে আমাকে স্কুলে পাঠাবার প্রয়াস পেত। আমিও কিছুটা যাবার পর, সকলের হাত ছাড়িয়ে এক-দৌড়ে বাবার চেম্বারে ঢুকে বাবার চেয়ারের পেছনে লুকিয়ে পড়তাম, সেখান থেকে তো জোর করে ধরে নিয়ে যাবার সাধ্য কারও ছিল না। বাবা বরাভয় দিতেন। আর কম্পাউণ্ডার নগেনদাকে দিয়ে শান্তিবাবুর দোকান থেকে রসগোল্লা আনিয়ে, খাইয়ে আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন।

বার’কয় এমন চলবার পর সবাই রণে ভঙ্গ দিল। আমি তো স্কুল না গিয়ে দিব্যি বাড়িতেই কাটাতে লাগলাম।

দিদিরা ব্যঙ্গ করে বলতে লাগল আমার ‘কুলে পোকা’ ধরেছে। আমি স্কুলে ভর্তি হয়েছি কী-না, কোন ক্লাসে পড়ি – এসব কেউ জিজ্ঞেস করলেও ঐ একই কথা বলা হতো।

এক বছর কেটে গেল। বাবা আর তো ভর্তি করাতে নিয়ে যাবেন না, মা তাই এক বছর ধরে আমার বেতন দিয়ে গেলেন। হিসেবের সংসারে এ অপচয় মায়ের বড্ড বেজেছিল।

বছরের শেষে অ্যানুয়াল পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলো। মেজদা যথারীতি স্ট্যাণ্ড করে ক্লাসে উঠে গেল। সবার ওকে নিয়ে কী উল্লাস, কী আদর – প্রতিবেশীদেরও কী সপ্রশংস দৃষ্টি!

দেখলাম পড়াশোনা ব্যাপারটা আদৌ খারাপ কিছু নয়, স্কুলে ভালো করে পড়াশোনা করলে প্রচুর আদর পাওয়া যায়। নতুন ক্লাসের ঝাঁ-চকচকে নতুন বই পাওয়া যায়। আমার মনে হলো: মেজদা অন্য ক্লাস হয়ে যাওয়ায় হেডমাস্টারমশাই আর নিশ্চয়ই টিফিনে বাড়ি গিয়ে দেরি করার কথা মনে রাখবেন না। আমি মাকে গিয়ে ধরলাম – আমাকে নতুন বই এনে দাও, আমিও স্কুলে যাব।

মা মাথা নাড়লেন – না না, তুমি আমার বারো-চৌদ্দ টাকা নষ্ট করেছ। আর নয়, সব দেওয়া-টেওয়া হবে, তারপর তুমি বলবে স্কুলে যাব না, না না …

আমি মাকে প্রায় জড়িয়ে ধরে বললাম – এবার দাও, দেখো ঠিক যাব।

আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মা কী বুঝলেন কে জানে!

আমার জন্যও নতুন বই এলো, মেজদি ব্রাউন পেপারের মলাট দিয়ে চমৎকার অঙ্ক আর বাংলা খাতা সেলাই করে দিল। আর এলো একটা ক্যানভাস কাপড়ের ছোটোমাপের পিঠ-ব্যাগ।

স্কুলে যেতে শুরু করলাম আমি।

 

ভেবে দেখতে গেলে সবকিছুরই একাট ভালো দিক আছে – বলেছিলেন আমাদের বাংলার দেববাবু স্যার। তিনি বলতেন – ‘স্কুল আসার সময় রাস্তায় পড়ে গিয়ে পা কেটে গেছে, ডেটল বা বেঞ্জিন লাগাতে গিয়ে জ্বালা করছে বলে কাঁদছ? কিন্তু ভেবে দেখ দেখি, যদি পা-টা না কেটে ভেঙে যেত … তা হলে একুশ দিন… ফুটবল ম্যাচ যেত, মামাতো দিদির বিয়েতে যাওয়া মাটি, সরস্বতী পুজোটা বাড়িতে বসে কাটাতে হতো – ব্যাণ্ডেজ-ট্যান্ডেজ – সে তো মহা হাঙ্গামার ব্যাপার। তাছাড়া আজকের প্রথম ক্লাসটা ছিল কানাইবাবুর ইংরেজি। তাঁর কচার ডালের বাড়ি থেকে … বাপু হে, সবকিছুর মধ্যে কিছু ভালো দিক আছে, শুধু ভেতর থেকে দেখতে জানতে হবে!’

আমার ‘কুলে পোকা’ লাগার ভালো দিকটা ছিল এ যে, সেই থেকে মেজদা বরাবর আমার থেকে এক ক্লাস ওপরে। তা নাহলে দু-বছরের বড়ো দাদার সঙ্গে এক-ক্লাসে পড়াটা না হতো উপাদেয়, না হতো প্রকৃতি অনুমোদিত।

কুলে পোকা সেরে যাওয়ায় মা এতো খুশি হয়েছিলেন যে মাঝে-মাঝে নিজের ডিমের থেকে অতিরিক্ত একটু ভেঙে সকলের নজর এড়িয়ে আমার পাতে দিতেন, মাছের টুকরোটাও যেন বড়ো বড়ো ঠেকত।

(ক্রমশ)

দুর্লভ সূত্রধর
লেখক | + posts

লেখক ছদ্মনামের আড়ালেই থাকতে চান, তাই ছবি কিংবা পরিচিতি কিছুই দেওয়া গেল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *