আহাম্মকের খুদকুড়ো । পর্ব ৩ । লিখছেন দুর্লভ সূত্রধর

পিতলের নাগরা জুতো

বড়দিকে আমাদের বাড়িতে ছোটোবেলায় প্রায় পাই-ই নি। বেশিরভাগ সময় বড়দি বড়োমার কাছে থাকত। বিয়েও হয়ে গিয়েছিল খুব অল্প বয়সে।

বিয়েটা হয়েছিল বড়মার বাপের বাড়িতে।

তখন আমার বছর চারেক বয়স।

চারদিকে একান্ত অপরিচিত বিয়েবাড়ির কলরোল।

কে আর কার দিকে নজর দিয়েছে। ছোটোদের তো বড়োদের মধ্যে দেখাই যায় না। সেখানে বয়স-অনুযায়ী ছোটো ছোটো গোষ্ঠী আপনিই গজিয়ে ওঠে, আর একেবারে ছোটোরা থাকে অরক্ষিত। সুতরাং যে-কোনো অনুষ্ঠানবাড়ি ছোটোদের কাছে বড়োদের মাতব্বরি থেকে বাঁচার একটু অবকাশ দেয়।

বড়োমার নজরের বাইরে হতেই একেবারে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গিয়েছি। আশেপাশের রাস্তায় দু-চার পাক দিতেই কে যেন কোলে তুলে সোজা বড়মার সামনে গিয়ে নামিয়ে দিলো।

প্রথমেই পিঠে পড়ল চু-চারটে মৃদু কিল, সঙ্গে বকুনি – ‘কোথায় গিয়েছিলি, কেন গিয়েছিলি বল!’

স-ক্রন্দনে বলেই চলেছি – ‘বেড়াতে গিয়েছিলাম, আমাকে ধরে এনেছে!’

বড়মার তড়পানি – ‘বজ্জাত, এতটুকু শান্তিতে থাকতে দিবি না! সবাই খুঁজে মরছে, আর উনি একা একা বেড়াতে বেরিয়েছেন!’

তারপর সবাই মিলে ঘিরে ধরে প্রশ্নবাণ।

সেই থেকে সারা জীবনে আর খুঁটির বাঁধন ছেড়ে বেশি দূরে যাওয়া হয়নি। ফিরে ফিরে আসতে হয়েছে অসম্পন্নতা আর সংকীর্ণতার মধ্যে।

বিয়ের পরদিন ছিল বাসি বিয়ে।

বিয়েবাড়িতে খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো মিলিয়ে এক ডজন দিদি। তার পরদিন বৌভাত। বৌভাতের দিন মাথা ঘষার প্রস্তুতির জন্য তারা নারকেল তেল মাখছিল, পরস্পরের চুলে মাখিয়ে দিচ্ছিল। আমার মাথাতেও তখন বেশ বড়ো বড়ো চুল। আমাকে কেউ আর তেল মাখিয়ে দেয় না। আমিও খুঁজে খুঁজে ডালডার টিন থেকে এক খাবলা ডালডা নিয়ে নারকেল তেল বলে মাথায় মেখেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্নান করাতে গিয়ে বড়মার চিৎকার – ‘মাথায় কী মেখেছিস তুই।’

নাকটাকে যথাসম্ভব আমার মাথার কাছে নামিয়ে আনতেই চিৎকার পরিণত হলো আর্তনাদে – ‘বজ্জাত, এতটুকু শান্তিতে থাকতে দিবি না তুই!’

পিঠে গোটাকয় কিল। সেদিনই গোলাকার কাপড়কাচা সাবান দিয়ে আমার মাথাঘষা কাজ করতে হলো বড়োমাকে।

বাড়ির বাঁ-দিকে আরও বড়ো একটা মাঠ মতন ছিল। সেখানে বিয়ের আগেরদিন পঙ্গপাল পড়েছিল। সে-এক অসামান্য দৃশ্য। মুহূর্তে হাজার হাজার পঙ্গপাল মাঠটাকে ছেয়ে ফেলল। পঙ্গপাল পড়া ভালো না খারাপ লক্ষণ তা নিয়ে দিন-দুয়েক ভীষণ চর্চা চলেছিল।

বিয়ের আসর জমেছিল খুব। বড়োমার বাবা অর্থাৎ আমাদের বড়োদাদু তখনও বেঁচেছিলেন। তাঁর রবীন্দ্রনাথের মতো সাদা চুল-দাড়ি ছিল, সাদা ধুতি পরতেন একটু খাটো করে, জোরে কথা বলতে জানতেন না, সর্বক্ষণের সঙ্গী মুখের হাসিটি ছিল শিশুর মতো। সংসারে থেকেও সাধকের থেকে বেশি ধীরোদাত্ত, স্থির, নিজের মধ্যে সমাহিত মানুষ ছিলেন – দেখেছি, সকলেই তাঁকে অসম্ভব সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধা করতেন।

বড়মার ভাইদের মধ্যে অনেকেই কৃতী ছিলেন। তাঁদের আমরা নিজের মামাদের থেকে বেশি জানতাম। তাঁরাও কখনও স্নেহের ব্যাপারে আপন-পর দেখতেন বলে মনে হয় না।

ঐ মামার বাড়ির সামনে অনেকটা জায়গা ছিল সেখানেই বিয়ের ম্যারাপ বাঁধা হয়েছিল। সেই প্যাণ্ডেলে একটা বেশ বড়ো চৌকির ওপর ফরাসের মতো কাপড় পেতে বাবার বন্ধু-বান্ধব ও বয়স্করা বাসি বিয়ে দেখতে বসেছিলেন। আসলে আড্ডা মারছিলেন। তার মধ্যে বিপুলকাকাও ছিলেন। তাঁর পুরো নাম ছিল বিপুলরঞ্জন দাশগুপ্ত, আমরা বলতাম চাইবাসার কাকা, চাইবাসা ও কলকাতায় তাঁর বিরাট ও বিলাসবহুল বাড়ি। তিনি আর তাঁর  স্ত্রী, চাইবাসার কাকিমা মাঝে-মধ্যে বাবাকে দেখতে আমাদের বাড়িতে যেতেন। একটু বড়ো হয়ে জনেছি বিপুলকাকা বিরাট ধনী – ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে তাঁর ব্যবসা। তাঁর একটা কালো অস্টিন মোটর কার ছিল, সেটায় চেপেও কয়েকবার আমাদের বাড়ি গেছেন।

সুতরাং বড়দির বিয়ের সময়ও বিপুলকাকা আমার পরিচিতই ছিলেন। বাসি বিয়ের সকালে তিনি সেই ফরাসে বাবার সঙ্গে মুখোমুখি বসে সুগন্ধী বার্মা চুরোট টানতে টানতে কী গভীর আলোচনায় মগ্ন। বাবার হাতেও জ্বলন্ত চুরোট। বিপুলকাকা পাঞ্জাবির পাশ পকেট থেকে বের করে আনলেন সোনার মতো ঝকঝকে সারা গায়ে ফুল লতা পাতা খোদাই করা ইঞ্চি-পাঁচেক সাইজের একটা নাগরা জুতো। আমরা ছোটোরা ভেবেছিলাম ঐ সোনার নাগরা জুতোটা নিশ্চয়ই কোনো রাজা-রাজড়ার জিনিস হবে।

ওমা! ওর মধ্যে যে বাবা আর কাকা ছাই ঝাড়ছেন।

ওটা তাহলে ছাইদানি! বড়ো দিদিরা বললেন – ‘ওটা সোনার নয়, পিতলের।’

বিপুলকাকার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে – এমন অনেক আশ্চর্য জিনিস ব্যবহার করতেন তিনি।

বাবার সঙ্গে বিপুলকাকার আলোচনারত ঐ মগ্ন-মূর্তি আর পিতলের নাগরার স্থিরচিত্র বড়দির বিয়েকে ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু সেই পিতলের নাগরা জুতোটিকে আর কোনোদিন দেখিনি।

বাবা আর বিপুলকাকার মতো অমন আশ্চর্য বন্ধুত্ব আমরা কখনও দেখিনি, আর কখনও দেখতে পাব বলেও মনে হয় না।

বিপুলকাকার মতো ধনী ও দেশ-বিদেশ ঘুরে আসা মানুষ কেন বাবার মতো মফস্বলের গরীবের (তখন, হয়তো এখনও এই চিকিৎসা মানে জল আর চিনির বড়ি) ডাক্তারের সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষার জন্য বছরে একবার-দু’বার দূর-মফঃস্বলে ছুটে ছুটে আসতেন – তা ছিল আমাদের বোধের অতীত। বাবা কখনও কারও বাড়ি যেতেন না, সে অবকাশও তাঁর ছিল না।

আমাদের ভাইবোনদের কোনো উন্নতির খবর পেলে বিপুলকাকা খুব খুশি হতেন। আমাদের ভাইবোনেরা বড়ো হবার পর তাঁর ইচ্ছে হয়েছিল আমরা যদি কেউ বিদেশে যাই। কিন্তু ভালোভাবেই জানতাম নিজেদের দৌড় – বাংলাভাষাটাই ভালো করে জানা নেই তো বিদেশযাত্রা—

ফলত নিজের জেলার মানচিত্রও পেরোনো হয়নি।

(ক্রমশ)

দুর্লভ সূত্রধর
লেখক | + posts

লেখক ছদ্মনামের আড়ালেই থাকতে চান, তাই ছবি কিংবা পরিচিতি কিছুই দেওয়া গেল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed