বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা । পর্ব ২ । ইয়াশিকা মিনিষ্টার । লিখছেন কল্লোল লাহিড়ী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভৎসতা তখনও জাপান দেশটার গা থেকে ধুয়ে মুছে যায়নি। ১৯৪৫ সালে বিশ্বে প্রথম ‘পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ’ যে কী প্রচন্ড অভিঘাত আনতে পারে তার কথা শুধু হিরোশিমা নাগাসাকি নয় জানতো গোটা পৃথিবী। আর জানতো সমুদ্রের ওপরে উড়তে উড়তে আমাদের দেশে চলে আসা শঙ্খচিলটাও। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মন কেমন করা গানে যে পাখিটা আমাদের সেই ছোট্ট বেলায় শুনিয়েছিল যুদ্ধের বিবর্ণ দুঃখের কথা। যন্ত্রণার কথা। গানটা যখনই চলতো তখনই আমার তাপসদার কথা মনে পড়তো। একটা লম্বা দেওয়াল নিখুঁত তুলির টানে ভরিয়ে দিচ্ছে। স্লোগানে স্লোগান। কবিতায় গর্জন করছে একটা মিছিল। তার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা শঙ্খচিল। পাশে রাখা ভাঁড়ের চা জুড়িয়ে যাচ্ছে। লোডশেডিং এর রাতে তেলের কুপি জ্বলছে মশালের মতো। তার দপদপে আগুনের ছায়া পড়ছে দেওয়ালে। শঙ্খচিলের গায়ে। ডানায়। তখনও আমি সমুদ্র দেখিনি। শঙ্খচিলও না। মনে মনে সাদা পাখিটাকে তাপসদার তুলির টানে কল্পনা করে নিতাম। তারও অনেক পরে বালী সাধারণ গ্রন্থাগারের ওপরের হলঘরে সিনে গিল্ড বালীর ১৬ মিমি প্রজেক্টারে দেখেছিলাম ‘হিরোশিমা মন আমুর’। হিরোশিমা মাই লাভ। ঘরটার বড় বড় জানলা দিয়ে আসছিল পাশেই বয়ে যাওয়া গঙ্গার ঠান্ডা হাওয়া। কেমন যেন শীত শীত করছিল আমার। ভালোবাসার গল্পের মধ্যে কিভাবে যুদ্ধ এসে বসত করে। উস্কে দিয়ে যায় স্মৃতিকে। সময়কে। ছবিটির পরিচালক আলা রেনেকে চিনি তারও বেশ কিছু দিন পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্রবিদ্যার ক্লাসে। বর্ষার ঝিম ধরা দুপুরে আমরা দেখছিলাম এই পরিচালকেরই আর একটি অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘নাইট এ্যান্ড ফগ’। একটা কনসেনট্রেশান ক্যাম্প। মৃত্যুর দানব, বীভৎস উল্লাস। শক্তির পরাক্রমতা। ধ্বংস যজ্ঞ। তার সাথে কবিতার মতো বয়ে চলা ধারা বিবরণী। যে বিবরণীর প্রত্যেকটা শব্দ মনে করাচ্ছিল এই নিধন মানব সভ্যতার কলঙ্ক। যা ইতিহাস শত চেষ্টাতেও মুছে ফেলতে পারবে না। ধুয়ে ফেলতে পারবে না তার পাপের হাত। সেদিনও কেমন যেন শীত করেছিল আমাদের। লম্বা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম সবাই চুপটি করে। একরাশ মৃতদেহ যেন বৃষ্টির মধ্যে ধুয়ে যাচ্ছিল সাদা পর্দার ভেতর থেকে এসে। কেউ কারও সাথে কথা বলিনি একটুও। আমাদের চারপাশে টিপটিপ বৃষ্টির আওয়াজ ছাড়া আর শুনিনি কিছুই সেদিন। অনেক রাতে শেষ ডানকুনি লোকালে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে পড়েছিল তাপসদার দেওয়ালে আঁকা সেই শঙ্খচিলটার কথা। যার ডানায় লেগেছিল মশালের মতো জ্বলতে থাকা তেলের কুপির দপ দপে শিখার ছায়া।

যন্ত্রণাতো শুধু যুদ্ধে থেমে থাকেনি। স্বজন হারানো। সংসার হারানো। ছিন্ন ভিন্ন মানুষগুলোর ওপরে এসে পড়েছিল উদ্বাস্তু হওয়ার শঙ্কাও। হয়েওছিল মানুষ কাতারে কাতারে। এক দেশ থেকে উৎপাটিত হয়ে অন্যদেশের সেই চিত্র আমরা আজও দেখি। সেই মুখগুলো মনে করায় কোন এক কনসেনট্রেশান ক্যাম্পকে। ভীত চোখ গুলোকে। খুন করা মানুষের চর্বি দিয়ে তৈরী হয়েছিল সাবান। চুল দিয়ে কার্পেট। মানুষই সেগুলো ব্যবহার করেছিল। আর আদালতে দাঁড়িয়ে তার রূপকাররা বলেছিল “এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চের” দায় তাদের নয়। অন্য কারোর। পৃথিবীর সেই ধ্বংস করা যুদ্ধের তাপ খানিকটা তো পুইয়েছিল ইয়াশিকাও। না হলে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাসে জাপানের নাগানোতে মাত্র পাঁচশো ছেষট্টি ডলার পুঁজি আর আটজন শ্রমিক নিয়ে কি একটা কোম্পানি শুরু করা যায়? হয়তো যায়। আর যায় বলেই তারও তিন দশক পরে কোথায় জাপান আর কোথায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হাওড়া জেলার বালীর মধ্যে একটা সংযোগ সেতু গড়ে ওঠে। রবি মাষ্টারের দুটো পুঁচকে ছেলে জানতে পারে জাপানের কথা। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের কথা। তার বাবার বন্ধু ইয়াশিকার কথাও। ধুতি পাঞ্জাবির সাথে একটা কোট। কাঁধে ক্যামেরা। পেছনে একটু দূরে ন্যাড়া একটা গাছ। কোথাও একটা বেড়াতে যাওয়ার ছবি। ছোটনাগপুর মালভূমির দিকে কোথাও কি? ছোট্ট টিলা ঢালু হয়ে এসেছে। আজ বলে দেওয়ার কেউ নেই। অনেক দিন পরে ছুটিতে কি বাবা বেড়াতে গিয়েছিল? উলটো দিকে কে ছিলেন যিনি ছবিটা তুললেন? ধুতির সাথে হাওয়াই চটিই বা কেন? আমি তো কোনদিন পরতে দেখিনি। মনে অনেক প্রশ্ন ভিড় করে আসছে। আর একটা ছবি। একটা সময় আমাকে তাড়া করে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আরও অন্য একটা গল্পের দিকে।

গুগুল বলছে জাপানি শব্দ ‘ইয়াশিকা’ মানে করলে দাঁড়ায় ‘সাফল্য’, ‘সাহসী এক মহিলা’ ইত্যাদি। অর্থাৎ তিনি পুরুষ পদে বিবেচ্য নন। লিঙ্গ ভেদে নামকরণে স্ত্রী। তাই হয়তো তিনি দেখতে তন্বী, সুঠাম এবং বাড়তি মেদ বর্জিত। ষাটের দশকে গোটা পৃথিবী জুড়ে যে উত্তাল হাওয়া উঠেছিল সেই হাওয়ায় গা ভাসাতে অবশ্যই দরকার ছিল এমন এক ক্যামেরার যা সহজেই অংশীদার হতে পারবে সাধারণ মানুষের। তাদের জীবনের জীবনসঙ্গী হয়ে উঠবে। মিছিলে, প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, গৃহস্থের স্মরণীয় মন কেমন করা মুহূর্তে সেই হবে সর্বক্ষণের সঙ্গী। বাড়ি থেকে অনেক দূরে বিদেশ যাওয়া ছেলেটা বা মেয়েটার বন্ধু। নীল খামের ভেতরে বাড়িতে পাঠানো বিদেশ বিভুঁইয়ের সেই কোন দিন না দেখা ছবিগুলো ছিল সব দেশেরই বাবা মায়ের আশ্রয়ের এক জায়গা। তাদের দূরে চলে যাওয়া সন্তানদের ছুঁয়ে দেখার যেন এক ম্যাজিক আয়না। যদিও ইয়াশিকা প্রথমেই কিন্তু ক্যামেরা তৈরী করেনি মোটেই। ঘড়ির যন্ত্র তৈরী করতো ছোট ছোট অংশে। এরপর তারা ক্যামেরার যন্ত্রাংশ তৈরী করতে শুরু করে। কেন করে? তার কথা পাইনি উইকিপিডিয়াতে। ১৯৫৩ সালে তাদের ক্যামেরা ইয়াশিকাফ্লেক্স প্রথমে বাজারে আসে। এরও প্রায় দশ বছর পরে ১৯৬২ সালে সাধারণের মধ্যে যে ক্যামেরার সবচেয়ে চল হয় তা হল ইয়াশিকা মিনিষ্টার। খুব হালকা। খুব সহজ ভাবে ছবি তোলার টেকনিকে এই জাপানী ক্যামেরা অন্য সবাইকে টেক্কা দিয়েছিল। দামও ছিল মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। আর এই ক্যামেরার যেটা ম্যাজিক ছিল সেটা হল ‘সেলফ টাইমার’। এখন যেমন সেলফি তোলার সময় ফোন যার হাতে আছে তার চারপাশে ভিড় জমালেই হয়। গ্রুপের সাথে উঠে যাবে ছবি যে তুলছেন তিনিও। ইয়াশিকাও একটা টাইমারের ব্যবস্থা করে দেয় সেই ষাটের দশকের প্রথমেই। তিরিশ সেকেন্ড বা এক মিনিটের একটা সময় সেট করে দিয়ে এসে যিনি ছবি তুলছেন তিনিও ঢুকে পড়তে পারতেন নিজস্ব ছবির ফ্রেমে। আমরা কতবার যে এইভাবে ছবি তুলেছি সবাই মিলে তার ইয়ত্তা নেই। পোজ করে বসে থাকতে হতো। যাতে চোখের পাতা একদম না পড়ে। ক্যামেরাকে ঠিক জায়গায় বসিয়ে বাবা ছুট্টে চলে আসতো আমাদের পাশে। ইয়াশিকা তার সময় মতো শাটার অন করতো। ক্লিক শব্দ হতো। ঝপ করে জ্বলে উঠতো ফ্ল্যাশের আলো। অনেক দিন পরে ছবি গুলো দেখলে মনে হতো যেন লণ্ঠনের আলোয় তোলা। কবেকার লোডশেডিং কবেকার গল্প নিয়ে ঝুপ করে ঝুলমাখা হয়ে কিপ্যাডে টাইপ করিয়ে নিতো। আর ছবি গুলোর ভেতর থেকে যারা চেয়ে থাকতো তাদের কেমন যেন অচেনা মনে হতো আমার।

মা দেখছি খুব, খুউব হাসছে। কেন? জানি না। আমি মায়ের পাশে কিশোর কবি সুকান্তের স্টাইলে। দাদা দেখছি তরুণ অপেরার ‘আমি সুভাষ বলছি’র শান্তিগোপালকে নকল করছে। বাবার মুখেও স্মিত হাসি। ছবিটা দেখতে বসে অবাক লাগছে। বাবা কিভাবে অতো তাড়াতাড়ি এসে ঠিক পজিশানে বসে পড়েছিল টুক করে। ক্যামেরার ওপাশে কেউ কি ছিল? যার কথায় আমরা হেসে উঠেছিলাম? নাকি অনেক দিন পরে শীতের রাতে ইয়াশিকাকে ফ্রেম করে নিজের জায়গায় রেখে বাবাকে হুড়মুড় করে আসতে দেখে আমরাই হেসে উঠেছিলাম? বাবা নিজেও? জানি না। পেছনে যে চাদরটা টাঙানো হয়েছিল সেটা কি সেই বছরের পুজোর? বালী বাজারের জনতা স্টোর্স থেকে কেনা? হয়তো তাই। ভাঙা পলেস্তারা খসা স্যাঁতসেঁতে পুরনো দেওয়াল ঢাকা পড়তো চাদরে। কেমন যেন স্টুডিও হয়ে উঠতো ঘরটা। ছবি তোলার কোন উৎসব কোন কালেই ঠিক ছিল না। একটা ইচ্ছে ছিল। মাঝে মাঝেই ইয়াশিকার মধ্যে ফিল্ম পোরা থাকতো। মন ভালো লাগলে। হঠাৎ অবসর এসে গেলে। কিম্বা বাড়িতে একটু পেঁয়াজকলি ভাজা আর নলেন গুড় দিয়ে গরম রুটি খেলে ফুর্তির কম পড়তো না। হরিণঘাটা দুধের মাসিক খাতায় ধার বাড়লেও, দুধ না আসলেও, একটা ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট রিল চলে আসতো ধর্মতলার স্যাভয় থেকে। ইয়াশিকাও নিজের মনে বলে উঠতো ক্লিক ক্লিক। দাদা চিৎকার করে বলে উঠতো “ভাই ওই দ্যাখ ক্যামেরা বলছে ঠিক…ঠিক”।

সেই সময় বিদেশে যাঁরা থাকতেন তাঁদের কাছে তো বটেই সেই বাড়ির আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে এই ক্যামেরার চল খুব দেখা যেত। অনেকে তার প্রিয়জনকে বিদেশ থেকে এই ক্যামেরা এনে উপহার দিতেন। বাবার ইয়াশিকা সেই সূত্র ধরেই পাওয়া।প্রবাসী বন্ধু আমাদের সন্তু কাকুর প্রথম চাকরী পেয়ে তার প্রিয় বন্ধুকে পাঠানো উপহার। না হলে কোথা থেকে এতো দামী একটা ক্যামেরা পাবে বালী বারাকপুর জুনিয়র হাইস্কুলের একজন শিক্ষক? যার বেতন সেই সময়ের পে স্লিপে দেখে আঁতকে উঠতে হয়। বুঝতে পারা যায় ধার বাকির খাতা গুলোকে। সে তখন ক্যামেরা কিনবে? নাকি শেকড় থেকে উপড়ে চলে আসা দশ বারোজনের গা ঘেঁষাঘেঁষি করা একটা বড় সংসার চালাবে? তবুও ইচ্ছে তো ছিল মনে মনে ফটোগ্রাফির খুব। সেটা তো এর ওর ক্যামেরা নিয়ে অনেক দিন আগে থেকেই হাত পাকানো হয়েছে। বন্ধুরাও জানতো সে কথা। দেখেছেও সবাই। কিন্তু শখ থাকলেও সাধ্য থাকে না অনেকের। সেই সাধ অনেক সময় মিটিয়ে দেয় কাছের বন্ধু। কোন এক প্রিয় মানুষ। বাবার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। না হলে যে ছেলেকে তার বাবা মা অনেক ছোট্ট বেলায় পাঠিয়ে দিলো এপারে নেফ্রাইটিসের চিকিৎসার জন্যে। কাকা, দিদি, মামার সংসারে এরপরে ঘুরে ঘুরে বড় হল যে। ইচ্ছামতী, কপোতাক্ষ, ভাগিরথী যাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল না। বরং তার গায়ে পরম মায়ায় মাখালো পলিমাটি। তাকে নিয়ে তো এক মহাকাব্যিক আখ্যান হওয়ার কথা। চক্রব্যূহের মাঝখানে দাঁড়িয়েও যে বেরিয়ে যাওয়ার পথ ভুলে গেল না। হাসতে হাসতে পার করলো সংসার বৈতরণী। অনেক উদ্বাস্তু ছেলের স্কুল সার্টিফিকেটের মতো যার সার্টিফিকেটে তখনকার শিবহাটি হাইস্কুলের হেড মাষ্টার পি সি সেনগুপ্ত লিখলেন “He is a helpless refugee from East Bengal and I think owing to poverty, he could not show the desired result in the school final examination…” তবুও ছেলেটা পরিশ্রমী, সৎ। তাকে যেন উপযুক্ত সুযোগ দেওয়া হয়। ধূসর টাইপ করা চিঠিটা যখন আমার সামনে বার করে দেয় মা তারও বাইশ বছর আগে লোকটা আমাদের সবাইকে টাটা করে কোন এক শীতের সকালে চলে গেছে। এই লোকটার কাছ থেকে শিখেছি অনেক কিছু। কীভাবে লিখতে হয়। গল্পের বই পড়তে হয়। ভালো সিনেমা কী করে দেখতে হয়। আর কী করে সবাইকে একসাথে নিয়ে চুপ করে কাজ করে যেতে হয়। আত্মার আত্মীয় করে নিতে হয় সবাইকে। চিঠিটার গা থেকে বেরোচ্ছে কি বাবার গায়েরই গন্ধ? লুকিয়ে লুকিয়ে শুঁকি। আর যেন ঝট করে একটা ছেলের মুখ মনে পড়ে যায়। টাইপ রাইটারের শব্দ। গোটা গোটা করে লেখা হচ্ছে ‘হেল্পলেস রিফিউজি’। তখন কেমন কষ্ট হয়েছিল বাবার মনের মধ্যে? আমি আঁকড়ে ধরি ছবি গুলোকে। পালাতে চাই। কিন্তু কোথায় পালাবো? কতদূর? নিজের পরিহাস নিজেকে তাড়া করে বেড়ায়। বই খুঁজে খুঁজে ইতিহাস ধরে ধরে কতদিন আগে চিনতে চেষ্টা করেছি মহামান্য কতজনকে। আর নিজের বাবা? কেন জানতে চাইনি তার কাছে কোনদিন কেমন ছিল তার ছোট্টবেলাটা? এই যে এর দোরে ওর দোরে ঘুরে বেড়িয়ে মানুষ হওয়া? কেমন লাগতো অনেক দিন পরে বাড়ি ফিরলে? অনেক রাতে দুটো নদী পার করে অনেক দিন পর মাকে দেখলে? কতবার বাবার সাথে বিদ্যাসাগরের হেঁটে যাওয়ার গল্প শুনেছি। একবারও জানতে চায়নি নিজের বাবার হাঁটার কথা। কেন? এক মামুলি প্রাথমিক শিক্ষকের স্মৃতি অচ্ছুৎ মনে হয়েছিল নিজের কাছে? নাকি সেই জ্ঞানের আলোটা জ্বলে ওঠেনি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও। তার জীবন কথা আমাদের এই সজ্জিত আলোকজ্জ্বল ইতিহাসে কোন কাজে লাগবে সেটা কি মনে হয়েছিল কোনদিন? তাহলে তো আমি নিজেই নিজের চারিদিকে গড়ে তুলেছি এক একটা পাঁচিল। যে পাঁচিলগুলো টপকাতে পারছি না আজ।  নিজের কথা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে নিজের কাছেই। প্রশ্নগুলো থেকে যায়। উত্তর দেওয়া লোকগুলোকে আর পাওয়া যায় না। তারা ছবির ফ্রেমে সেঁটে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকেই। যদিও এই মুহূর্তে তাদের দিক থেকে কোন অভিযোগ অবশ্য নেই। একটা হারিয়ে যাওয়া সময়কে হাতড়ানো ছাড়া।

নিজের চেনা পরিচিত গন্ডি ছেড়ে, দেশ ছেড়ে, বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার হিড়িক অনেক দিন আগে থেকেই ছিল। শ্রমজীবি মানুষকে, উচ্ছেদ হওয়া মানুষকে সেই কবে থেকেই তো জাহাজের খোলে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা। খাটানো হয়েছে দাসের মতো করে। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বেকার বাঙালী যুবকের যুদ্ধে অংশগ্রহণের ঘটনাও বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ নয়। ইংরেজ সরকারের সৈনিক হওয়ার গ্লানি সেই উপন্যাসের পরতে পরতে। কিন্তু তথাকথিত শিক্ষিত সাধারণ মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের বাড়ির ছেলে মেয়েদের শিক্ষার খোঁজে, চাকরীর খোঁজে উড়ান দেওয়ার প্রবল বাসনাটা অবশ্য এর বেশ কিছুদিন পর থেকে। যা ছিল এক্কেবারে এলিট জনগণের জন্য তা যেন ক্রমশ প্রসারিত হতে থাকলো সাধারণের মধ্যে। পৃথিবীও তখন যেন যুদ্ধের তাপ পুইয়ে আবার নতুন করে সেজে উঠতে চাইছে। ফিরতে চাইছে কাজের ছন্দে। অনেক দেশ তখন খুলে দিচ্ছে তাদের দরজা অন্য অনেক দেশের তরুণদের কাছে। এমন সুযোগে পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে কিম্বা ষাটের দশকের গোড়ায় মফস্বলের পড়াশুনোয় বেশ তুখোড় ছেলে মেয়েরা পাড়ি দিতে শুরু করেছিল বিদেশে। জার্মানি, আমেরিকা, কানাডা আরও কত কত জায়গায়। নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছিল সেইসব দেশ গুলো পড়াশুনোয়, কর্মসংস্থানে। একজন গেলেই সেই পাড়া বা অঞ্চল থেকে আরও বেশ কয়েকজনকে তারা নিয়ে যেতে পারছে অনায়াসেই। অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে। ঠিক এইভাবে বাবার বেশ কয়েকজন বন্ধু সন্তু কাকু, স্বদেশ কাকু, হরিনারায়ণ কাকু পাড়ি দিয়েছিল চাকরীর সূত্রে আমেরিকায়। দেখছি বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরায় তোলা প্রথম রঙীন ছবিটাই সন্তু কাকুর। কোলে তার বড় মেয়ে পিয়া।

সন্তু কাকু সেখানে গিয়ে কী কাজ করতো? কোন শহরে উঠেছিল? নিজেকে কীভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল সেই গল্প আমার অজানা। শুধু জানতাম অর্থনীতির ভালো ছাত্র ছিলেন। যে লম্বা চিঠি গুলো বাবার কাছে আসতো তাতে লেখার দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যেত। খবর রাখতেন সমসময়কার সাহিত্য এবং রাজনীতি নিয়েও। এবং হাতে গুনে কয়েকবার যা দেখা হয়েছে আমার সাথে তাতে একবারও ‘ভারত দেশটার কি বিচ্ছিরি অবস্থা’ বলে এন আর আই সুলভ যে পরিচিত বিদ্রুপ গুলো শোনা যায় তা কোনদিনই কাকুর মুখে শুনতে পাইনি। দেশে আসলেই বাবার জন্য কয়েক ঘন্টা বরাদ্দ থাকতো তাঁর। বাবা অসুস্থতার কারণে বেশি হাঁটা চলা করতে পারতো না। কাজেই বন্ধুদেরই দেখা করতে আসতে হতো তার সঙ্গে। আর হয়তো ভালোও লাগতো তাঁদের কবেকার ছেড়ে যাওয়া পাড়া, পুকুর, গঙ্গার ঘাট, নিজেদের আড্ডার জায়গা দেখতে। অনেক বছর অন্তর দেশে আসতেন সন্তু কাকু। কিন্তু কাকিমা আসতো প্রত্যেক বছরেই। কখনো দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে। আবার কখনও বা একা। এলেই আমাদের ভাগ্যে কিছু না কিছু উপহার জুটতো। পেন। ছোট্ট ঘড়ি। বিদেশী সাবান। আমরা সেগুলো ব্যবহার করতাম না। যত্ন করে তুলে সাজিয়ে রাখতো দাদা। অনেক দিন পর্যন্ত জিনিসগুলোর মধ্যে আমেরিকা আমেরিকা গন্ধ থাকতো। যদিও তখন বাড়ির পাঁচিলে বড় বড় করে লেখা আছে “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক”, “দালালের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও”, “তোমার নাম আমার নাম…ভিয়েতনাম…ভিয়েতনাম” তবুও যে দেশের স্বাধীনতাকে স্ট্যাচু করে রাখা হয়েছে সেই দেশের সুগন্ধ আমাদের সাগর পাড়ের স্বপ্ন দেখাতো। নীল রঙের এয়ারোগ্রাম বাড়িতে আসলেই পিওন কাকুর হাত থেকে ছোঁ মেরে নিয়েই আমি গন্ধ শুঁকতাম। চোখের সামনে ভেসে উঠতো একটা নীল সমুদ্র। জাহাজের ডেক। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে শঙ্খচিল। স্বপ্নটা দাদা এসে কেটে দিতো। “জাপানে বোমটা কারা ফেলেছিল মনে আছে তো ভাই?” মেজাজটা খিটকেল হয়ে যেতো তক্ষুনি। আমি জানি ও এখন অঙ্ক করছে গোরা কাকুর কাছে। শুধু কি অঙ্ক? কতকি যে গল্প করে লুকিয়ে শুনলে তাজ্জব হয়ে যেতে হয়।

বাবা চলে যাওয়ার ঠিক পরের বছরেই সন্তু কাকু একবার দেশে এলেন। তখন আমি বেশ বড়। জীবনের প্রথম চাকরী করছি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে। গাল ভরা একটা পোষ্টও আছে এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার। কাজের চাপ এতোটাই যে সকালে বের হই মাঝরাতে বাড়ি ফিরি। নিশ্বাস নেওয়ার সময় নেই।  ঠিক এমন এক সময়ে আমাদের নতুন বাসায় কাকু এলেন বহু বছর পরে। সেই আগেকার মতোই দামী চুরুটের ধোঁওয়া উড়িয়ে খাদির সাদা পাজামা আর ফতুয়া পরে। তাঁর লেখার মতোই ভারিক্কি আর উদ্দাত্ত ঢঙে। যদিও ততদিনে তিনি কানাডায় চলে গেছেন। কাজ করছেন ওখানকার সরকারের হয়ে। চশমার পাওয়ারটা আগের মতোই বেশি আছে। মোটা কাচের পুরু ফ্রেম। মানুষটাও সেই কবেকার মতো হাসি খুশি। শুধু আগের মতো যেটা নেই সেটা হল তক্তপোষে হেলান দেওয়া একটা মানুষ। যে বলার চেয়ে শুনতো বেশি। তারই মাঝে একটা বা দুটো যা কথা বলতো অমোঘ হয়ে থেকে যেত মনের মাঝে। তক্তপোষটাও তো বইয়ের র‍্যাক হয়ে গেছে। জ্বল জ্বল করছে বইমেলা থেকে আনা নতুই বই গুলো। রান্নাঘরে নতুন ফ্রিজ। বসার ঘরে নতুন টিভি। কল খুললেই ঝরঝর করে পড়ছে মিউনিসিপালিটির জল। আমাকে আর দাদাকে এখন আর স্নান করতে যেতে হয় না রাস্তার কলে। এক টুকরো রোদ নিয়ে আর কাড়াকাড়ি করে না কেউ। উঠোন ছাপিয়ে রোদ এসে ঢুকছে ঘরে। সব কিছু কেমন যেন নতুন নতুন। কাকু সব ঘুরে ঘুরে দেখলেন। চুপ করে এসে বসলেন সাদা কালো ছবি গুলোর সামনে। তারপর আমাকে নিয়ে গেলেন ওদের পুরনো আড্ডার জায়গা রাসবাড়ির গঙ্গার ঘাট। চায়ের দোকান। গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। অনেক দিন পরে ইচ্ছে হল তাঁর চুরুট ফেলে দিয়ে সিগারেট খাওয়ার। তাও আবার যে সে সিগারেট নয়। চারমিনার। তখনও তা পাওয়া যেত উপেন বাবুর পানের দোকানে। নিজেই কিনলেন। চুপ করে চায়ের দোকানে বসে খেলেন। ছলছল করে উঠলো কি চোখটা? কাকে খুঁজতে এসেছেন কাকু? নিজের প্রিয় বন্ধুকে? নাকি যে সময় হাতের নাগাল বেরিয়ে পালিয়ে গেছে তাকে? সন্তু কাকু অনেকক্ষণ ছিলেন সেবার। কত কত গল্প করলেন। আগে থেকে বলে রেখেছিলেন গঙ্গার ভোলা মাছ খেতে চান। সর্ষে বাটা দিয়ে মাখো মাখো ঝোল হয়েছিল সেদিন। গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে এনে রেখেছিলাম মালাইচপ। আর বালীবাজার থেকে মা গোপালীর মিষ্টি লাল দই। খুব তৃপ্তি করে খেয়ে উঠে চুরুট না ধরিয়ে আবার একটা চারমিনার ধরিয়েছিলেন। একবার দেখতে চেয়েছিলেন বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরাটাকে। হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকলেন। নাড়াচাড়া করলেন। আর অসহায়ের মতো আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “ঠিক ভাবে রাখবি তো এটাকে? জানিস তোর বাবার সাথে প্রথম আলাপ হওয়ার মুহূর্তটা আমার এখনও মনে আছে। একটা বছর চোদ্দর ছেলে গঙ্গায় সাঁতার কাটছে ঠিক যেন নৌকার মতো। তারপর সেই নৌকা করে আমরা যে কতদূর ভেসে এলাম…”। শেষ করতে পারেননি কথা গুলো। জানলা দিয়ে শেষ বিকেলের আলো এসে কাকুকে সিল্যুট করে রেখেছিল। সেই ফ্রেম অনেকদিন মনের মধ্যে গেঁথে ছিল আমার। বাবাকে চিনছিলাম অন্য কারো চোখ দিয়ে। কাকুকে যখন গাড়িতে তুলে দিয়ে এলাম সকালের হাসি মুখটা আর নেই। কেমন যেন মন খারাপের মেঘ জমেছে। “আর যদি কোনদিনও দেশে না ফিরতে পারি মনে থেকে যাবে আজকের দিনটা। ভালো থাকিস তোরা।” মাথার ওপর হাত দিয়ে ঝাঁকিয়ে দিয়েছিলেন। গাড়িটা চলে গেলে আমি চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম। উলটো দিকে কল্যাণেশ্বর মন্দিরে তখন সন্ধ্যা আরতি শুরু হয়েছে। দেওয়ানগাজীর মাজারে তখন বাতি জ্বালানোর ভিড়। মন যেন হাতজোড় করে প্রার্থনা করতে চাইছে একবার নয় যেন অনেকবার কাকু ফিরে আসতে পারে তার দেশে। তার ছোট্ট বেলার জায়গায়। তার এই সাদা কালো ছবি গুলোর কাছে। যে ছবি গুলো যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছিল বাবা। হয়তো কোনদিন তার বন্ধুদেরই দেশে ফিরে দেখার আশায়।

এরপরে আর কখনও সন্তু কাকুর দেশে ফেরা হয়নি। কয়েক মাসের মধ্যে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি। অনেক ভোরে ফোনটা মাথার কাছে বেজে উঠেছিল। কাকুরই কোন পড়শি তার বিদেশি একসেন্টে হড়বড় করে বলে যাচ্ছিল কথা। ডায়রীতে যাদের যাদের নাম্বার পেয়েছে ফোন করে যাচ্ছে সে। একদম সময় দেয়নি কাকু কাউকেই। এমনকি ডাক্তারকেও না…। কোন সুদূর কানাডা থেকে ভেসে আসা কথা গুলোয় আমি তখন মন দিতে পারছিলাম না একটুও। ওই ভোরে আমি যেন ছুটে চলে গিয়েছিলাম রাসবাড়ির গঙ্গার ঘাট। একটা বছর চোদ্দর ছেলে নৌকার মতো সাঁতার কাটছে। দেশহারা, ঘর ছাড়া ছেলেটার বন্ধু হয়ে উঠছে অনেকে। জমাট বাঁধছে আড্ডা জি টি রোডের পাশে চায়ের দোকানে। চারমিনার সিগারেটে। চায়ের ভাঁড়ে। স্কুলে…কলেজে। কিছু শাদা কালো ছবি এলোমেলো উড়ছে। আর একটা পাইন কাঠের বাক্স থেকে উঁকি মারছে কবেকার ইয়াশিকা মিনিষ্টার। যার কাছে গল্প ছিল অনেক। কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার তাড়া ছিল না একটুও।

 

ঋণ

বাবা তোমাকে…। আর পৃথিবীর সেই সমস্ত মানুষদের যাঁরা এখনো ছবিতে ধরে রাখছেন সময়কে…স্মৃতিকে…গল্পকে…।

 

(ক্রমশ)

কল্লোল লাহিড়ী
+ posts

চলচ্চিত্র বিষয়ে অধ্যাপনা, তথ্যচিত্র নির্মাণ, ফিল্ম, টেলিভিশন ধারাবাহিক ও ওয়েব সিরিজের চিত্রনাট্য রচনা এবং তারই ফাঁকে নানা স্বাদের লেখালেখি– এসব নিয়েই কল্লোল লাহিড়ী। তাঁর প্রকাশিত দুটি উপন্যাস– ‘গোরা নকশাল’, ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’।

1 thought on “বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা । পর্ব ২ । ইয়াশিকা মিনিষ্টার । লিখছেন কল্লোল লাহিড়ী

  1. একটা স্মৃতি রোমন্থন মনে পড়িয়ে দেয় আমাদের জীবনের এরকম কাছের মানুষদের, যাঁরা আর নেই। স্যার এর লেখাটা পড়তে পড়তে পুরনো অ্যালবাম গুলো ধুলো ঝেড়ে দেখতে ইচ্ছে করলো। মনে পড়ে গেলো অনেক কথা। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed