বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা । পর্ব ১ । একশো কুড়ি গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড । লিখছেন কল্লোল লাহিড়ী

একশো কুড়ি গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড

গোটা বাড়ি জুড়ে হুলুস্থূল কাণ্ড। কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাকে। বাড়ি বলতে তো মোটে দুটো ঘর। এক চিলতে বারান্দা। ছোট্ট একটা উঠোন। তার পাশে রান্নাঘর। একটা পাতকুয়ো। আর এইসবের সম দূরত্বে কৌণিক অবস্থানে একটা খাটা পায়খানা। তার পাশের দেওয়ালে এক মানুষ জায়গা সমান একটা বাথরুম। মাথা উঁচু করলে এক চিলতে আকাশ নীল হয়ে শামিয়ানার মতো ছড়ানো। যদিও বাড়িটা তিন তলার,  কিন্তু এই একতলার পরিসরেই আমাদের ওঠাবসা। ঝগড়া আহ্লাদ। প্রেম বিরহ। ফেলে আসা স্মৃতির টানের দ্যোতনা। ওপরের দোতলা, তিনতলায় ওঠা নিষেধ। ওটা অন্য লোকের জায়গা। বড় করে তালা দেওয়া। কাজেই সেখানে যে থাকবে এমনটাও নয়। আবার শুরু হয়ে যায় খোঁজ… খোঁজ… খোঁজ।

লোক বলতে তো মোটে আমরা তিনজন। মা, দাদা, আমি। সঙ্গে যে আর কেউ নেই তেমনটা নয়। রান্নাঘরের ঘুলঘুলিতে বাস করা অনেক দিনের চড়াইয়ের পরিবার আছে। পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ানো মিনি, হুলো, পুটকি, পুটুস সমেত খান সাতেক বেড়াল আছে। প্রেসিডেন্সি জেলের মতো উঁচু পাঁচিলের মাথায় দুষ্টু কাকটা আছে। যাকে দেখলেই মনি সময়ে অসময়ে রোদে দেওয়া কাসুন্দির শিশি আড়াল করতো। ঢাকা দিতো সাদা কাপড়ে। এদের সাথে তালে তাল মিলিয়ে পুরোনো লেপের কভার আছে। মরচে পড়া ঠাম্মার তোরঙ্গ আছে। সেই কবেকার এনামেলের বাসনের ঝুড়ি আছে। ভাঙাচোরা মিড শেলফের আলমারি আছে। রাশিকৃত পুরোনো বইয়ের পোঁটলা আছে। মায়ের লক্ষ্মীর ঝাঁপি আছে। সবাই, সব; ঠিক আগে যেমন ছিল সংসারটা পাতার সময়। তাকে গুছিয়ে ওঠার সময়। তারমধ্যে মানুষ গুলোর গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বাঁচার সময়। বৃষ্টির সময়, গরমের সময়, নতুন পাতা ওঠা বসন্তের সময়। ঠিক তেমনই আছে। শুধু একটাই জিনিস নেই। কোত্থাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাকে।

ঠিক এমনটা নয় যে আমরা না খুঁজে পাওয়া জিনিসটাকে এই বাড়িতে রেখে চলে যেতে পারবো। এমনটা নয় আমাদের অনেক কিছু রেখে যাওয়ার আছে এই বাড়িতে।

কতকগুলো কঙ্কালসার মানুষের স্মৃতি। তাদের ভালোবাসা। করুণাধারা। সেগুলোও তো আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে ট্রাকে চেপে। ভ্যানে চেপে। নাকি সঙ্গোপনে?

প্রথম ঘরের জানলা দিয়ে তাকালে অমরদার সবজির দোকান। জগাদার মাছের দোকান। ষষ্ঠীদার ফলের দোকান। রতনদার চালের দোকান। তাড়িনীবাবুর চপের দোকান। একটা ছোটোখাটো বাজার।  সেই বাজারে ঘুরঘুর করা কত চেনা লোক। ঝিমোতে ঝিমোতে এগিয়ে গিয়ে প্রত্যেক দোকান থেকে নিজের পাওনা খাবার বুঝে নেওয়া ভোলা ষাঁড়। পাঁচিলে ল্যাজ গুটিয়ে বসে থাকা দক্ষিণেশ্বরের পঞ্চবটির গাছ থেকে আসা হনুমান। মানিকদার সেলুনে বাটি ছাঁট দিতে আসা খদ্দের। আর এদের মাঝ বরাবর সোজা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। বড় বড় পাঞ্জাব লরি। চুয়ান্না, ছাপ্পান্ন নম্বরের হাওড়া যাওয়ার বাস। এদের কোলাহলের জোয়ার ছাপিয়ে আসে আমাদের এক চিলতে বাসায়। তারমধ্যেই আমি মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ মুখস্থ করি। দাদা শেষ করে কে সি নাগের অঙ্কের বই। জ্যামিতি বক্সে মাথা রেখে প্রতিপাদ্য করার অছিলায় ঘুমোয় ছোট্ট মিনি। মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে তার গোঁফ কাঁপায়। লেজের খুটটা কুটুস কুটুস নাড়ে। চড়ুই গুলো আটার গুলি ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গিয়ে ছানাদের খাওয়ায়। রোদ সরে সরে যায় দেওয়াল থেকে। পলেস্তারা খসে। পুরোনো হয় বাড়ি। মানুষগুলো হারিয়ে যায়। স্মৃতি হয়ে যায়। ভুলে যাই আমরা সব কিছু। কিম্বা ভুলিয়ে দেওয়া হয়। আর সেই ভুলভুলাইয়াতে আমি হাতড়াই। খুঁজে পাই না তাকে। অথচ পেতেই হবে। কারণ এই প্রথম একটা অনেক দিনের সংসার গুটিয়ে আমরা এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাচ্ছি। শেকড় ছিঁড়ছে আমার, দাদার, মায়ের। তার কষ্ট একটু নয় অনেকটা টের পাচ্ছি যেন।

কিন্তু এটাই কি প্রথম? এর আগেও কি এমন হয়নি কখনও আমাদের পরিবারের? কোনোদিন? এক জায়গা থেকে আর আর একজায়গায় চলে যেতে হয়নি তাদের? এক রাতের মধ্যে? বিনা নোটিসে? তাও আমার যে এই মন খারাপের আতিশয্য সে তো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার। এক দেশ থেকে চিরকালের মতো অন্য দেশে যাওয়া তো নয়? পেছনে পড়ে থাকলো ভিটে মাটি সব কিছু। তুলসী মঞ্চে জ্বালা থাকলো প্রদীপ। হরিমতিকে পোয়াতি অবস্থায় দিয়ে আসতে হল পাশের বাড়ির গোয়ালে। বারবার পেছনে ফিরে তাকালো সে। চোখ ভর্তি জল। মাঠ ভর্তি ধান উপছাপা হয়ে রইলো না কাটা অবস্থায়। পুকুর পাড়ের কাঁচা মিঠে গাছটা ভরে থাকলো মুকুলে। গোটা প্রজন্ম শুধু শুনে চললো লাহিড়ী বংশের তিন মহিলার দুঃসাহসিক, কষ্টকর, বেদনা বিধুর সীমানা পেরোনোর বৃত্তান্ত। আমি তো তাদের থেকে অনেক দূরে। আখ্যানের সাজানো পরিসরে খুঁজে চলেছি এমন একটা জিনিস যা এইসব মানুষ গুলোকে এখনও মূর্ত করে রেখেছে। আধারকে হারালে পাপ। আমি সেই অর্থে পাপী হতে চাইছি না তাহলে এই মুহূর্তে? এই তর্পণ তাহলে কি আমার পালিয়ে বেড়ানোর খিড়কির দরজা?

শুনেছি কোন একটা বাড়িতে থাকতে থাকতে সেই বাড়িটার মতো হয়ে যায় মানুষগুলো। নাকি বাড়িটা হয়ে যায় মানুষ? তার জানলা, দরজা, কড়ি, বর্গা, উঠোন, চৌবাচ্চা, জলের কল, লাইটের সুইচ সব যেন শরীরের এক একটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। বসত করলে মায়া বাড়ে। ছেড়ে গেলে কান্না পায়। এই বাড়িতেই জন্ম হয়েছে আমার। এই বাড়িতে জন্মেছে দাদা। বাবা মায়ের বিয়ে হয়েছে এই বাড়িতে। ঠাম্মা, মনি, বড়মা, হাঁদা এই বাড়িতেই এক সময়ে কতদিন আগে ওপার থেকে এসে উঠেছিল প্রথমে। শুরু করেছিল আবার নতুন করে সব কিছু। যাদের চারিদিকে ছিল সবজেটে রঙের গ্রাম্য জীবন তারাই দু কামড়ার স্যাঁতসেঁতে ঘরে পিলসুজের ওপর প্রদীপ রাখলো। হারানো ছড়ানো দুঃখ গুলোকে জমাট করে রাখলো মনের মাঝে। কাউকে কোনদিন বোঝার অবকাশ দিল না। ছায়া ছায়া হয়ে একদিন সবাই আবার সরেও গেল যে যার মতো করে। ফাঁকা হয়ে যেতে থাকলো আমাদের চারপাশটা। একদম একলা হয়ে যাওয়ার মতোই।

সেই কবেকার একলা হয়ে যাওয়া একটা সংসারকে জড়ো করছি আমরা। ট্রাঙ্কে গোছাচ্ছি। বস্তায় পুরছি। ঝুড়িতে ভরছি। হারিয়ে যাচ্ছে আমার কাছ থেকে আমার জন্মস্থান। আমার পুরোনো পাড়া। আমার গায়ে এক তলার বাসার স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। এমনকি যারা এতোদিন আমার কোলে কাঁখে করে ঘুমোতো। যাদের ছাড়া আমি খেতে বসতে পারতাম না। জানলায় দাঁড়ালে যারা আমার সাথে জানলায় গিয়ে বসতো সেই পুটকি, পুটুস, বুড়ো হুলো কেউ যাবে না আমাদের সাথে। ওরা থেকে যাবে এই পুরোনো বাড়িতে। জগাদাকে বলা থাকবে মাছের কাঁটা দিতে। সামনের বাড়ির কাজের লোক দেবে দুধ ভাত। ওরা খাবে? থাকবে ঠিক? কী জানি? মন খারাপ যখন ছল ছল চোখে চার দেওয়াল ঘুরছে তখনই পাওয়া যাচ্ছে না তাকে। অথচ তার হারিয়ে যাওয়ার কোনো কথা ছিল না। সে আমাদের থেকেও যত্নে ছিল অনেক। তাকে আমরা যত্নে রেখেছিলাম। কারণ সে ছিল আমাদের অতিথি। বাবার কথায় তৃতীয় নয়ন। তখনও আমার জন বার্জার পড়া হয়নি। আমাদের দেখার রকমফেরগুলো অন্যরকম ছিল। গান গেয়ে যারা ছাদ পিটোতো, আর পঞ্চমীর চাঁদ যখন সহজপাঠের ভেতর দিয়ে বাঁশ বাগানে উঠতো তখন আমাদের বর্ণপরিচয়ের সবে শুরু। চন্দননগরের পুজোর লাইট ছিল আমাদের কাছে তখন রাশিয়ার প্রান্তরে লাল ফৌজের যুদ্ধে বরফ পড়ার ভ্রম। বছরে একবার পয়লা বোশেখের বাজার করতে বেরিয়ে কারেন্ট অফের গলে যাওয়া আইসক্রিম ছিল স্বর্গ দেখার মতো পুণ্য অর্জনের ফল। সিদ্ধার্থ ঘোষ তখনও ‘বাঙালির ফটোগ্রাফি চর্চা’ লেখেননি। বোন এ্যান্ড শেফার্ডের ফটোগ্রাফির লাইব্রেরি সমস্ত ইতিহাস বিলোপ করে পুড়ে যায়নি তখনও। অতীত তাকিয়ে ছিল বর্তমানের দিকে। আর বর্তমান তাকিয়ে ছিল ভবিষ্যতে। কিন্তু ভবিষ্যত মনে হয় তখন আর কারও দিকে তাকানোর অবকাশ পায়নি। তার তাড়া ছিল বড্ড। নব্বইয়ের দশকের মাঝ বরাবর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল আমাদের দেখার জগৎ। প্রসারভারতী বিল আসার পর নতুন করে যেন ঘুম ভেঙে উঠলো সব। বাড়ির ছাদে হাওয়ায় ঘুরে যাওয়া টিভির অ্যান্টেনাগুলো ঠিক করার আর প্রয়োজন পড়লো না। ব্রিগেডে যত ভিড় বাড়তে শুরু করলো পাড়াগুলো, অঞ্চলগুলো বসতগুলো তত উন্নত থেকে উন্নততর হওয়ার লোভে তুবড়ে মুচড়ে পালটে যেতে থাকলো। গঙ্গার মুখ কালো হয়ে এলো হাইড্রেনের বিষাক্ত জলে। একটা দুটো করে পুরোনো বাড়ি ভাঙা হতে থাকলো। সবাই গুনগুন ফিসফিস করে বলতে থাকলো পাড়ায় নাকি ফ্ল্যাট উঠবে। সবচেয়ে বুড়ো নিমগাছটা কাটা পড়লে তাল বুড়ি অভিশাপ দিয়েছিল
“বেজন্মা হবি সব…বংশে বাতি দেওয়ার কেউ থাকবে না তোদের”। দিব্বি বংশ বেড়েছিল পাড়ায় পাড়ায়। ফ্ল্যাটের চার পাঁচ তলার ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিল তালগাছটা। তার সাথে তালবুড়িও। কেউ মনে রাখেনি তার কথা। শুধু লোকগুলোর জীবন থেকে চলে গিয়েছিল মুখের হাসি। একে অপরের সাথে দেখা হলে কুশল বিনিময়ের ইচ্ছা।

বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার নোটিস যখন এসেছিল বাবা তখন বেশ অসুস্থ। শয্যাশায়ী। অবসর পাওয়ার দু বছরর পেরিয়ে গেলেও তখনও কোনো পেনশান হাতে পায়নি মানুষটা। উদ্বাস্তু শিবিরের সেকেণ্ড জেনারেশান আমরা। কাজেই একলা দাদার কাঁধের ওপর সংসার। তার অবস্থা তখন গঙ্গায় প্রথম সাঁতার শেখা বাচ্চা ছেলেটার মতো। হাবুডুবু খেতে খেতে সংসারতরী পার করছিল সে। বাবা চেয়েছিল তার মৃত্যু পর্যন্ত সময়। যাঁরা নোটিস পাঠিয়েছিলেন ঘর ফাঁকা করার, বাসা ছেড়ে দেওয়ার তাঁরা শুনেছিলেন আবেদনের কথা। বাবা অপেক্ষা করছিল একটা চূড়ান্ত সময়ের জন্য। একটু একটু করে গুটিয়ে নিচ্ছিল সব কিছু থেকে। এমনকি প্রতিদিন নিজের লেখার হিসেবের খাতার শব্দ সংখ্যাও যেন কমে আসতে থাকলো। কথাও। দুটো ঘর এক চিলতে উঠোন আর মাথার ওপর চৌকো আকাশের মধ্যে চারটে মানুষ একজনের চির বিদায়ের যেন প্রস্তুতি নিতে থাকলো একটু একটু করে। শ্বাস কষ্ট বাড়লে সেই প্রথম বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার এলো।

কীভাবে অক্সিজেন দিতে হবে একটা মানুষকে! কীভাবে নল পরিয়ে দেওয়া হয়! জলের মধ্যে কতগুলো বুদবুদ কাটলে তার পরিমাপ বোঝা যায় সব দেখিয়ে দিয়েছিলেন ডাক্তার কাকিমা। অনেক রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে মা ডাকলেই আমি গিয়ে অক্সিজেনের নল পরিয়ে দিতাম বাবাকে। জলের মধ্যে বুড়বুড়ি উঠতো। কানের কাছে ফিসফিস করতাম। যাচ্ছে বাবা? অক্সিজেন? বিছানার সাথে মিশে যাওয়া মাথাটা একপাশে হেলে যেত শুধু। ওটাই ছিল বোঝার সাংকেতিক– ‘হ্যাঁ’। মাথার ওপর টিপটিপ ঘামকে মুছিয়ে দিয়ে, হাতগুলোকে জড়ো করে সামনে এগিয়ে দিয়ে। বুক পর্যন্ত চাদর ঢেকে আমি আবার শুয়ে পড়তাম। মনে শঙ্কা থাকতো লোকটার ঘুম ভাঙা নিয়ে। সকালে উঠে আবার চুপ করে বসে থাকতে দেখতাম। মাথা নীচু হয়ে আছে হাঁটুর কাছে। এই দৃশ্যময়তা আমি কোন ক্যামেরায় তুলে রাখতে পারিনি। যদিও তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের ক্লাসে চলছে ‘মি জঁ সেন’ নিয়ে পড়ানো। একটা ফ্রেমের মধ্যে কীভাবে সাজানো হবে সব কিছু। বাস্তবের প্রতি রূপায়ণে রেমব্রান্টীয় আলোয় ভেসে যাবে স্থান, সময়, কল্পনার পরিসর। আমি কোন ফ্রেম তাক করতে পারিনি বাবার দিকে। তক্তপোশটা খালি হয়ে গিয়েছিল কিছুদিনের মধ্যেই।

খালি তক্তপোশটার নতুন বাসায় কোনো জায়গা হয়নি। দাদা বলেছে ওটাকে নিয়ে যাবে না। পাশাপাশি দুটো তক্তপোশই। ওগুলো নতুন জায়গায় বেমানান। তাহলে এই যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটা গোটা তক্তপোশের ওপর তাদের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলো তারা এখানেই পড়ে থাকবে? অনেক ভেবে ঠিক হয়েছিল ওগুলো হবে বুক শেলফ। বংশের হাড়, পাঁজড়, অস্থি মজ্জা এর চেয়ে আর ভালো কাজে লাগবে কী করে? কাজেই টেনে বার করা হল দুটোকেই কবেকার কোন অতল গহ্বরের ভেতর থেকে। আর তাদের টেনে বার করতে গিয়ে বেরোলো পাইন কাঠের পাতলা কাঠের বাক্স। বাবার প্রবাসী বন্ধুর উপহার। সেই বাক্সের মধ্যে থেকে বেরোলেন তিনি যাকে এতো হুড়ুমতাল করে খোঁজা হচ্ছে। ঝড় ঝাপটা কম যায়নি এই কমাসে। আমাদের তিনজনের মুখ ছিল বিষাদসিন্ধুর মতো। এই প্রথম দাদার মুখে হাসি ফুটলো। মায়েরও। অনেক দিনের তার নীরব অভিমান ভেঙে আমাদের সামনে আবার এসে জায়গা করে নিলো বাবার সেই কবেকার ইয়াশিকা ক্যামেরা। ভিউ ফাউন্ডারে চোখ দিয়ে শাটারে হাত দিতেই সে বলে উঠলো “ক্লিক…ক্লিক”। দাদা বলতো “ও ক্যামেরার ভাষায় কী বলতে চাইছে বলতো ভাই?” আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। কী বলছে? দাদা মুচকি হেসে বলতো “আসলে ও বলতে চাইছে ঠিক… ঠিক…”।

ইয়াশিকা ঠিক ঠিক মতো ১২০ জি টি রোডের ছবি তুললো। এর আগে সে যে ছবি তোলেনি তা নয়। অনেক তুলেছে। এত এত ছবি আর মানুষের গল্প সেগুলো সব রাখা আছে আমার কাছে। তবে এই ছবিগুলো এক্কেবারে অন্য রকমের। কোনো একটা সংসারের এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় চলে যাওয়ার গল্প। মন কেমনের ছবি। যেখানে তারা আর কোনোদিন ফিরবে না। উঠোনে দাঁড়িয়ে ভিজবে না বৃষ্টিতে। রান্না ঘরের সামনে বাটি নিয়ে বসে থাকবে না পিঁয়াজকলি ভাজা খাওয়ার জন্য। এক চিলতে রোদ আসা দরজাটার কাছে বসে থাকতে দেখবে না বাবা, মনি, হাঁদা, ঠাম্মা কাউকেই। দুই ভাই গলা জড়াজড়ি করে কোনো এক গরমের দুপুরের ছুটিতে গাইবে না “আমরা দুটি ভাই…শিবের গাজন গাই…ঠাম্মা গেছে গয়া কাশি, ডুগডুগি বাজাই…”। বাক্স, প্যাঁটরা, বস্তায় মোড়া জিনিস, খালি তক্তপোষ, ফাঁকা ঘর, উঠোন, মাথার ওপর আকাশ সব ঘুরে ঘুরে ছবি তুললো ইয়াশিকা। ছবি তো তুলেছিল ক্লিক ক্লিক…ঠিক ঠিক করতে করতে। কিন্তু তার একটাও প্রিন্ট করাইনি আমি। ইচ্ছে করেনি একটুও। ভাবতেও চাইনি কোনোদিন আসলে ওই বাড়িটা আর নেই। হয়তো না থেকেও কোথাও থেকে যাওয়ার মতো ওই বাড়িটায় থাকতে চেয়েছি আমি। নিঝুম দুপুরে বসে থাকতে চেয়েছি জানলার ধারে জি টি রোডের দিকে চেয়ে। ওই জানলাটা যেন আমার কাছে মনির দেশের বাড়িতে ফেলে রেখে আসা পুকুর পাড়ের ফলসা গাছটার মতো। যার থেকেও না থাকার কষ্টটা মনের মধ্যে রোদ পোহায়। ডালপালা মেলে বড় হয়। ফল ধরলে মেঘ ঘনিয়ে এসে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ায়। আমি সেই জমা বৃষ্টির জলে কাগজের নৌকা বানিয়ে ছাড়ি। ওরা দুলতে দুলতে ভাসে। ভাবটা এমন যেন এক্ষুনি গঙ্গায় গিয়ে পড়বে।

ঠোঁটের ওপরে ঠিক নাকের নীচ বরাবর একটা কালচে রেখা যখন উঠলো, বাড়ির লোকজন-আশেপাশের আত্মীয় স্বজনরা যখন বলতে শুরু করলো আমি নাকি বড় হয়ে যাচ্ছি ঠিক সেই সময়ে বাবার বন্ধুর সাথে আমার পরিচয় হল। শুধু পরিচয় বললে ভুল হবে। আমরা দুজনে বন্ধু হলাম। বাবাই পাতিয়ে দিয়েছিল বন্ধুত্ব। আসলে এর আগে ইয়াশিকা বাবার হাতে থাকতো। তাক করতো আমাদের দিকে। ফ্রেমে সজ্জিত হয়ে আমরা তাকিয়ে থাকতাম ওর দিকে। এবার উল্টোটা হবার পালা। ইয়াশিকা থাকবে আমার হাতে। আমি তাক করবো ক্যামেরা। উলটো দিকের ফ্রেম সাজানো হবে অনেক কিছু দিয়ে। একদিন যারা আমাকে দেখতো। এবার তাদের যদি আমি দেখি? সেবারও অনেক দিন পরে বের করা হয়েছিল ইয়াশিকাকে সেই পুরনো পাইন কাঠের বাক্স থেকে। তার জাপানি জামা খুলে ঝাড়পোঁছ করা হয়েছিল। পাড়ার দোকান থেকে কিনে নিয়ে আসা হয়েছিল একশো টাকা দিয়ে কোডাকের রিল। তারপর সেই ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে আমি ঘুরলাম গঙ্গার পাড়। আড্ডার ঠেক। রাঙার বাড়ির উঠোন। আমতলার দুর্গামণ্ডপ। এমনকি মা বাবাকেও ধরে রাখলাম আমার তোলা ইয়াশিকার প্রথম ফ্রেমে। আর বাবা তার জাপানি বন্ধুর চোখ দিয়ে কত যুগ আগের থেকে যে ধরে রেখেছিল আমাদের তার হিসেব নিকেশ করা এই মুহূর্তে মনে হয় অসম্ভব। সেইসব গল্পগুলো উনুনের ধোঁয়ার সাথে। সন্ধ্যামণি ফুলের সাথে। স্থলপদ্মের রঙের মতো আমার মনের রিলে যদি ছাপতে থাকে তাহলে হয়তো একটা পুরোনো অ্যালবাম খোলা যেতে পারে। যে অ্যালবামটার ওপরে লেখা থাকবে ‘বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা’।

আমাদের ঠাঁই বদল হতে হয়েছিল এরপরেও অনেকবার। সেগুলোর মন কেমনের হিসেব-নিকেশ আর ইয়াশিকা ধরে রাখতে পারেনি। ততদিনে তারও যেন দিন গোটানোর সময় শুরু হয়েছিল। ফিল্ম পাওয়া যাচ্ছিলো না আর। একদিন বাজার থেকে কেমন যেন ভ্যানিস হয়ে গেল রিলের প্যাকেট গুলো। তার জায়গায় চলে এলো নতুন নতুন সব ডিজিটাল ক্যামেরা। ইয়াশিকা আবার লুকিয়ে পড়লো সেই পাইন কাঠের বাক্সের মধ্যে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় হল স্থানান্তরিত। হঠাৎ অনেকদিন পর তার খোঁজ পড়লো আবার। কলেজস্ট্রিট পাড়ায় সেদিন একটু শীত শীত ভাব। “আচ্ছা কল্লোলদা তোমার সেই পুরোনো ছবি গুলো…যেগুলো নিয়ে লিখবে ভাবছিলে?” শ্রেয়ান তাড়া দিতে থাকলো। আবার এতদিন পরে নতুন করে খোঁজ…খোঁজ…খোঁজ। এক ঝাঁক ছবি নিয়ে পুরোনো বন্ধু আমার আবার জায়গা করে নিল বালিশের পাশে। পড়ার টেবিলে। ল্যাপটপের কি প্যাডে। কিন্তু ফটো সাজাতে গিয়ে দেখলাম অনেক কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। সেগুলো কি হারিয়ে গেছে? লুকিয়ে পড়েছে? নাকি অন্য কোনো জায়গায় অন্য গল্প বলার জন্য অপেক্ষা করছে? জানি না। তবে এই মুহূর্তে কয়েকটা ছবি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একশো কুড়ি গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডে আমরা তিনজন। আমি, দাদা, মা। সত্যিই কি তিনজন? নাকি উলটো দিকে বাবাও। যাকে দেখা যাচ্ছে না। অথচ যিনি আমাদের তিনজনেরই দ্রষ্টা। ক্যামেরায় লুক থ্রু করে আছেন। তাঁর দেখায় একটু একটু করে ফুটে উঠছি আমরা। এক নতুন গল্প হয়ে।

(ক্রমশ)

ঋণ

বাবা তোমাকে…। আর পৃথিবীর সেই সমস্ত মানুষদের যাঁরা এখনো ছবিতে ধরে রাখছেন সময়কে…স্মৃতিকে…গল্পকে…।

 

কল্লোল লাহিড়ীঃ চলচ্চিত্র বিষয়ে অধ্যাপনা, তথ্যচিত্র নির্মাণ, ফিল্ম, টেলিভিশন ধারাবাহিক ও ওয়েব সিরিজের চিত্রনাট্য রচনা এবং তারই ফাঁকে নানা স্বাদের লেখালেখি– এসব নিয়েই কল্লোল লাহিড়ী। তাঁর প্রকাশিত দুটি উপন্যাস– ‘গোরা নকশাল’, ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’।

কল্লোল লাহিড়ী
+ posts

চলচ্চিত্র বিষয়ে অধ্যাপনা, তথ্যচিত্র নির্মাণ, ফিল্ম, টেলিভিশন ধারাবাহিক ও ওয়েব সিরিজের চিত্রনাট্য রচনা এবং তারই ফাঁকে নানা স্বাদের লেখালেখি– এসব নিয়েই কল্লোল লাহিড়ী। তাঁর প্রকাশিত দুটি উপন্যাস– ‘গোরা নকশাল’, ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’।

3 thoughts on “বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা । পর্ব ১ । একশো কুড়ি গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড । লিখছেন কল্লোল লাহিড়ী

  1. এত সাবলীল আর সরল ভাবে লেখা এমনি যেন ছবি হয়ে ভেসে ওঠে চোখে।
    স্মৃতি থাকে সকলের কাছে টুকিটাকি, তবে দৃষ্টি প্রখর,বোধ অতল আর যিনি নির্বাক থাকা পছন্দ করেন সময়ে সময়ে তার স্মৃতি তোরঙ্গ ফুলে ফুলেফেঁপে ওঠে সময়ের সাথে।
    এই ভার বইতে পারাও কম বড় ব্যাপার নয়।ভালো লাগলো বলার অপেক্ষা রাখেনা হয়তো।তবে এই ভালোলাগায় যেন এক চিনচিনে অনুভূতি থাকে।
    অপেক্ষায় থাকলাম পরবর্তী পর্বের।
    ভালো থাকবেন।

  2. স্যার এর লেখা পড়তে বসা মানে একটা যাত্রা শুরু। এমন এক যাত্রা যা মাঝ পথে বন্ধ করা যায় না, যতসময় না প্রান্তিক স্টেশন এ এসে পৌঁছচ্ছি। এতো স্মৃতি বিজড়িত লেখা, মন টা দ্রবীভূত হয়ে গেলো। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

  3. খুবই ভালো লাগছে এই স্মৃতির সরণি বেয়ে যেতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed