খড়কুটোর জীবন : পথের কথা । পর্ব ৮ । লিখছেন সুপ্রিয় ঘোষ

দুপুরবেলা স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছি। টিফিনের ঘণ্টা পড়ার আগে ভাত খেয়ে ফিরতে হবে। খুব তাড়া। কিন্তু বাড়ির কাছে আসতেই দেখি রাস্তার মাঝখানে বাঁশ পুঁতে বেড়া দেওয়া। আশ্চর্য ব্যাপার! বড়োরা সব দাঁড়িয়ে এখানে ওখানে । স্কুলে যাবার সময় দেখে গেছি কটাদের বাড়ির জমি মাপছে জসিম আমিন। লোহার চেন ধরে আছে দুজন। আর ক্লিপ-বোর্ডের উপর ম্যাপ রেখে মৌজা ধরে দাগ-খতিয়ান মিলিয়ে পরিমাণ অনুসারে স্কেল ধরে মুখে জ্বলন্ত বিড়ি নিয়ে মাপ মেলাচ্ছেন জসিম আমিন। জসিম আমিনের বয়স হয়েছে। চোখে কম দেখেন। তবু লোকের মান্যতা রয়েছে তার প্রতি। তিনি পা মেপেই জমির পরিমাণ নির্ধারণ করে দিতে পারেন। সদরের আমিন চিন্তাহরণ পানও এসে সে মাপের ভুল খুঁজে পাননা। এলাকায় জসিম আমিনের জমি মাপা শেষ কথা। সেই আমিন আজ জমি মাপতে গিয়ে বলেছে গ্রামের এই রাস্তা কটাদের জমির মধ্যে পরে। আর একথা শুনেই কটারা রাস্তায় বেড়া দিয়েছে। গ্রামের লোক কী বলবে বুঝতে পারছে না। কারণ জসিম আমিনের মাপের উপর তো আর কথা বলা যায় না। রক্ত গরম কয়েকজন অবশ্য প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু হালে পানি পায়নি। অন্য পথ দিয়ে বাড়ি ফিরে ভাত খেয়ে ঘণ্টা পড়ার আগে আবার স্কুলে।
স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের আলোচনা। পরিচিত পথ বন্ধ। পথের মালিক যে কেউ হতে পারে তা কেউ ভেবে উঠতে পারছি না। কারণ ছোটো হলেও জানতাম রাস্তা তো সরকারের। সরকারী রাস্তায় সবার অধিকার থাকে। কয়েকদিন রাস্তা বন্ধ থাকার পর একদিন দেখি রাস্তার বাঁশের বেড়া হাওয়া। জানা গেল জসিম আমিনের নজর কমের কারণে এই বিপত্তি। চিন্তাহরণ পান এসে এই প্রথম তার ভুল ধরে গ্রামের লোকের পথের চিন্তা দূর করেছেন।
নব্বইয়ের দশকে আমাদের গ্রামের সব রাস্তায় মাটির ছিলো। এক এক মরসুমে তার এক এক রূপ। কখনো ধূলো উড়তো আবার কখনো জল-কাদায় থইথই। পিচ রাস্তা থেকে পশ্চিমমুখী মেঠো পথ সাপের মতো ঢুকে গিয়েছে গ্রামের বিবরে। রাস্তার দুই দিকে মাঠ। পিচ রাস্তা থেকে নেমেই ডানদিকে খেজুর গাছে জড়িয়ে ওঠা বট। বাম দিকে ঝোপঝাড়। সেগুলি উলুখড় ,শেয়াকুলে ভরা।তার মধ্য শেয়ালের গর্ত। বেজি, গোসাপ এমনকি খড়াও চোখে পরতে পারে। কোথাও আকন্দ ফুলের গাছ। বন ঝাউ, অলা, কালকিসিন্দা, বন তুলসী, কিশোরী লতা রাস্তার দুদিক ভরে। মাঝে মাঝে দূর্বা আচ্ছাদিত। নয়নজলি বর্ষায় টলটলে। ভরে থাকে শাপলা। আপনি পথ চলতে চলতে কাট মল্লিকা বা ভাঁট ফুলের গন্ধ পাবেন। চোখ জুড়িয়ে দেবে রঙবেরঙের প্রজাপতি বা ফড়িং-এর ওড়াওড়ি। ভাগ্য ভালো হলে দেখতে পাবেন শালিক বা ঘুঘু পাখির ধুলো খেলা।

গ্রামে ঢোকার মুখে স্কুলের সবুজ মাঠ। মাঠের কোণে রাস্তার পাশে সাম্রাজ্য বিস্তার করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বট। রাস্তার বাম দিকে ডোবা। ডোবার পাড়ে দু চারটে খোড়ো চালের মাটির বাড়ি। গ্রামের ভিতর বাড়িগুলি সব রাস্তার ধারে ধারে। কোথাও পাটকাঠির বা বাঁশের বেড়া, কোথাও মাটির প্রাচীর বাড়িগুলি থেকে রাস্তাকে পৃথক করেছে। কোথাও রাস্তার উপর ঝুঁকে আছে বাঁশঝাড়, কোথাও কদম, সজনে, আম, জাম, নিম, চটকা, তেঁতুল বা কলাগাছের ঝাড় ছায়ার আলপনা এঁকেছে পথের উপরে। গ্রীষ্মে পথের ধূলায় আচ্ছাদিত হয়ে থাকে এসব হরিৎ। আবার শীতে গাছগুলি থেকে টুপ টুপ করে শিশির চুঁইয়ে পড়ে পথের ধূলায়। বর্ষায় কদম ফুলের পাপড়ি বা বসন্তে লাল শিমূল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। পশ্চিম পাড়ার মসজিদের পাশের পথ দিয়ে গেলে নাকে লাগবে হাসনুহানার সুগন্ধ। সজনে ফুল বা আমের মুকুল বা ঝড়া পাতাদের অন্তিম শয্যা রচিত হয় পথের পরে।
পথের পাশে পাড়ায় পাড়ায় কোনো গাছের নীচে পাওয়া যাবে ছাউনি দেওয়া বাঁশের মাচা। গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপের বা গৃহস্থ বাড়ির বৈঠকখানার আড্ডার অভাব পূরণ করে এসব মাচা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানান বয়সের ছেলে-বুড়োর ভিড় লেগে থাকে মাচায়। সে আড্ডার বিষয় দিদি থেকে মোদি, বিজয় মালিয়া থেকে জুন মালিয়া, প্লাস্টিক মানি থেকে পাড় হবার পারানি , পাড়ার হরিনাম সংকীর্তন থেকে ইসলামিক জলসা, লাভ জিহাদ থেকে খাপ পঞ্চায়েত  । এসবের পাশাপাশি আলোচনা চলতে থাকে এলাকার কে যেন ড্রাগন ফলের চাষ করেছে, কে কেরালায় কাজ করে বা কে দুবাই এমন নানান বিষয়। কেউ কেউ তাস খেলে। মাঝে মাঝে হার -জিত নিয়ে চেঁচামেচি করে। বিড়ি, সিগারেট, পান সঙ্গত দেয় এ- আড্ডার। কাউকে মুরগি বানিয়ে মজা করা হয়। রাস্তা দিয়ে কোনো অচেনা লোক আসতে দেখলেই মাচা থেকে প্রশ্ন ছুটে যাবে – বাড়ি কোথায়? নাম কী? কার বাড়ি যাবেন? সে কে হয়? বা গ্রামে কী কাজ? উত্তর জানা হলে আগন্তুক কে ঠিক বাড়িটা দেখিয়ে দেওয়া হবে। মজা করার ইচ্ছা হলে কেউ দেখিয়ে দিতে পারে অন্য পাড়ার পথ। কেউ হয়তো রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলেছেন। মাচা থেকে কেউ হয়তো বললো – ‘ ও ভাই, তোমার সাইকেলের চাকা ঘুরছে। ‘কেউ হয়তো ‘ হেউ’ শব্দটি শুনলে রেগে যান। মাচার ভিড় থেকে কেউ বললো – ‘ হেউ। ‘ রেগে আগুন লোকটি কথাটা কে বললো খুঁজে না পেয়ে মাচা লক্ষ করে কয়েকটি অপশব্দ প্রয়োগ করে চলে গেলেন।
চৈত্র মাস এলেই পথ গুলোকে দেখলে আমার মনে হয় ঘর ছাড়া কোনো উদাস বাউল। বুকের ভিতরটা কেমন খাঁ খাঁ করে। ছোটো বেলায় যখন রঙ দোল হতো তখন বেশ মজা হতো। দোলের দিন সকাল হতে না হতেই বালতিতে করে রঙ গুলে পিচকারি নিয়ে বন্ধুরা দাঁড়িয়ে যেতাম পথে। কেউ আমাদের রাঙিয়ে দিয়ে যাও, রাঙিয়ে দিয়ে যাও না বললেও আমারা  পথচারীদের বাদুড়ে রঙে রাঙিয়ে দিতাম। জায়গায় জায়গায় পথের ধুলোও রঙিন হয়ে উঠতো। বসন্ত গড়াগড়ি যেতো পথে পথে। বৈকালে পথে নামতাম আবীর নিয়ে। সঙ্গে তাসাপার্টি আর ঘোড়া নাচ। পথে পথে নাচনকোদন করে আর বাতাসে ফাগ উড়িয়ে ক্লান্ত পায়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতাম।

বর্ষার সময় পথ আর পথ থাকতো না। কোথাও কোথাও পাশের পুকুর বা ডোবা উঠে আসতো পথে। কোথাও হাঁটু পর্যন্ত কাদা, কোথাও পিচ পিচে। কখনো কাদার মধ্যে ন্যাদব্যাদ করে চলা তো কখনো পা টিপে টিপে চলা। হাঁটুর উপর কাপড় বা লুঙ্গী তুলে সে পথ চলা। মষেগাড়ির মাঠের আমাদের স্কুলে যাওয়ার আল পথ জলে ডুবে যেতো। পাট ক্ষেতের মধ্য দিয়ে সে আল পথ। তারপর আধো ডোবা ধান ক্ষেতের পাশ দিয়ে জল ভাঙতে ভাঙতে পৌঁছে যেতাম স্কুলে। অবশ্যই দল বোঁধে । একদিন একা একা ফিরছি।
নির্জন মাঠ। তখন আমার ক্লাস সিক্স। কাদার মধ্যে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে গিয়েছে। যতই ওঠার চেষ্টা করছি ততই পুঁতে যাচ্ছি। রাস্তার দুদিকে পাটের জঙ্গল। ভয় শেয়ালের দল এসে যদি ছিঁড়ে খায়। প্রাণ ভয়ে ভীত হয়ে বাবাগো মাগো বলে চীৎকার করছি। এমন সময় এক লোক দেবদূতের মতো হাজির। দু বাহু ধরে টেনে তুলে জলে নিয়ে গিয়ে ধুয়ে কাঁধে তুলে হাঁটা দিয়েছেন গ্রামের দিকে। কাঁদতে কাঁদতে কী নাম, বাবার নাম কী, কোথায় বাড়ি সেসব আগেই জানিয়েছি। বাড়িতে যখন পৌঁছেছি সবাই অবাক। কী ব্যাপার? সবার জিজ্ঞাসু চোখ আমার দিকে। ইতিবৃত্ত জানার পর সবার মুখে হাসি। যে তমেজ সেখ আমাকে নিয়ে এসেছিলেন তিনি বছর পঁচিশ পর আজো আমার তমেজ কাকা। ঈদে, দুর্গা পূজায় উপহার, শুভেচ্ছা আজো জারি। পথের সাথীকে চিনি নিয়েছিলাম সেদিনই। সে পথ হয়তো শেষ হবে গোরে বা শ্মশনে।

গ্রামে একটা প্রবাদ আছে –
‘পথ চলবে জেনে, কড়ি নেবে গুণে।’ তা অনেক সময় চলতি পথে জেনে নিতাম সামনে পাগলা কুকুর বা ক্ষ্যাপা ষাঁড় আছে কীনা। তাহলে পথ পালটাতাম । অনেক পথে ছিলো রাত্রিতে ভূতের ভয়। হালসানাদের বাঁশঝাঁড় একেবারে পথের উপর। অনেক বাঁশ ঝড়ের সময় নুইয়ে থাকতো পথের উপর। লোকের বিশ্বাস পাশের মাজার থেকে ভূতের দল বাঁশবনে এসে হাওয়া খায়। পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। পথ চলতি কেউ হয়তো যাচ্ছে সড়াম করে নুইয়ে থাকা বাঁশ উপরে উঠে যায়। তাই এখান দিয়ে চলার সময় নিয়ম হলো কোনো লাঠি দিয়ে নুইয়ে থাকা বাঁশের উপর তিনটে জোরে জোরে বারি মারা। তাতে অপ দেবতারা চলে যান। নিরাপদে বাঁশ ডিঙিয়ে যাওয়া যায়।
প্রতি বছর হরিনামসংকীর্তন শেষ হতো যেদিন দুপুরে ভোজন আরতী গানের আগে সকালে পথে বার হতো খোল-করতাল নিয়ে ধুলোটের দল। দুটি বাচ্চাকে রাধা-কৃষ্ণ সাজিয়ে দেওয়া হতো। তারা যেতো দলের সামনে সামনে। সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হতো – ‘ ধূলা তো ধূলি নয় ভক্ত পদ রেণু /সেই ধূলা মেখে ছিলো নন্দর ব্যাটা কানু। ‘ ধুলো উড়িয়ে পথ পরিক্রমা শেষে ফিরে আসতো সে দল। পথের দুদিকে ভক্তের দল সেই ধুলোটের দলের পদধূলি অঞ্জলি করে মাথায় নিতেন তুলে।
মহরমের দিন প্রতিবছর বার হতো তাজিয়া। মুহম্মদের দৌহিত্র আলির পুত্র ইমাম হুসেন এই দিনেই এজিদের সেনাবাহিনীর হাত প্রাণ হারান কারবালার যুদ্ধে। দিনটিকে অনেকে বলতো আশুরা। কুফার অত্যাচারিত মানুষদের রক্ষা করতে গিয়ে ইমাম হুসেন প্রাণদান করেন। এজিদের বাহিনী ইউফ্রেটিস নদীর একটু জলও ব্যবহার করতে দেয়নি। সেই শোকের দিনে মুসলমান পাড়ার মানুষেরা পথে পথে করতেন মাতম। ইমাম হুসেনের প্রতিকী কফিন কাঁধে নিয়ে তারা গাইতেন জারি গান। যে জারি শব্দের অর্থ ক্রন্দন। তারা বুক চাপড়াতে চাপড়াতে গাইতেন – ‘ হায় হুসেন হায় /একটুখানি পানির জন্য হুসেন মারা যায়। ‘ বাড়ির ভিতর থেকে  সারা গ্রামের মহিলারা রাস্তায় এসে দাঁড়াতেন। হিন্দু মায়ের চোখেও সেদিন দেখতাম ইমাম হুসেনের জন্য জল। পাঠক সে চোখের জলে কোনো জাত লেখা থাকতো না।

 

ক্রমশ

সুপ্রিয় ঘোষ
+ posts

নদীয়ার চাপড়া বড়ো-আন্দুলিয়া সংলগ্ন আলফা গ্রামে সুপ্রিয় ঘোষের জন্ম। অঞ্চলসংস্কৃতি উৎসাহী ও সন্ধিৎসু সুপ্রিয় আড়ালেই সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে তাঁর কাজ করে চলেছেন। তাঁর প্রকাশিত বই 'নদীয়ার হাট-হদ্দ'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed