স্মরচিহ্ন। পর্ব ১৬ । কলের গান ও ধূমপান । লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

যে-সময়টায় আমরা বড়ো হচ্ছিলাম তখন ধূমপানের বিশাল গ্ল্যামার। উত্তমকুমারের ঠোঁটে সিগারেট যেন স্বয়ং শিল্পেরই এক মূর্ত রূপ। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক ইত্যাদি ধূমপানবিরহিত হওয়ার কথা চিন্তাই করত না। সত্যজিৎ নায়কের ঠোঁটনিঃসৃত ধুম্রবৃত্তে তাঁর মানসিক ব্যঞ্জনা ধরতে চেয়েছেন। দেশবিদেশের বহু বহু নন্দিত ব্যক্তির ঠোঁটে অলঙ্কারের মতো শোভা পেত ধূমপানের পাইপ। চার্চিল এবং কাস্ত্রোর মতো ভিন্ন মননের মানুষরা ধূমপানে এসে ‘একদেহে লীন’ হয়ে যেতেন।

স্বাভাবিক কারণেই ধূমপান তরুণদের চুম্বকের মতোই টানত। ধূমপান ছিল তাই শিল্পসাহিত্যসংগীতবিপ্লব-এর আবশ্যিক অনুপান। তরুণীরা ধূমপানে আগ্রহী না হলেও ধূমপায়ী তরুণে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। তাই ধূমপান অধিকাংশ কিশোরের অনুশীলন-সূচির অন্তর্গত হত। ধূমপায়ীদের স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে সেসব অনুশীলনের কাহিনি নিয়ে একটা চমৎকার সংকলন হতে পারে। অন্যদেরটা অন্যেরা বলবেন। আমারটা সামান্য একটু বলে নিই এখানে।

আশ্চর্যজনকভাবে আমার প্রথম ধূমপানের স্মৃতি কলের গানকে জড়িয়ে নিয়ে নিউরনের কোশে বসে আছে। একটায় টান দিলে অন্যটাও চলে আসে। তখন সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণি। যতদূর মনে পড়ে সেসময় চারমিনার, নাম্বার টেন আর পানামা সিগারেটই বেশি চলত গ্রামেগঞ্জে। আমি আর আমার এক বন্ধুসম ভাগ্নে মিলে একদিন বাড়ির দেওয়ালে ঝোলানো একটি ফটোর পিছনে আবিষ্কার করলাম না-খোলা এক প্যাকেট গোল্ড ফ্লেক। অত্যাশ্চর্য ঘটনা – প্রায় ম্যাজিক! তার আগে পর্যন্ত এই সিগারেট চোখেই দেখিনি। আলাদিনের কাণ্ড নয় তো?

অতটা নয়। একটু ভাবতেই রহস্যের আবরণ সরে গেল। আমার এক পিসতুতো দাদা এসেছিলেন বাড়িতে। মাঝে মাঝেই আসেন। খুব শৌখিন মানুষ। সংগীতপ্রিয়। হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতে তাঁকেই প্রথম দেখি। আমাদের বাড়িতে ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ নামে একটি কোম্পানির গ্রামোফোন ছিল। তাতে চোঙার সামনে মুখ দিয়ে একটু কুকুরের বসে থাকার ছবি। আমরা বলতাম, ‘কলের গান’। তাতে দম দিয়ে চালু করলেই প্যাড বসানো একটি গোলাকার চাকতি ঘুরতে শুরু করত। সেই চাকতির উপরে গ্রামোফোন রেকর্ড বসিয়ে একপাশে থাকা একটি দণ্ডের মাথায় পিন লাগিয়ে তার নমনীয় মুণ্ডুটিকে হেলিয়ে নিয়ে রেকর্ডের প্রান্তে বসিয়ে দিলেই গান শুরু হয়ে যেত। পিন আর দম – দুটিরই আয়ু কম। দু-চারটে রেকর্ড চালানোর পরেই পিন ভোঁতা হয়ে যেত, তখন গান আর না এগিয়ে এক কথাতেই তোতলাতে থাকত। তখন সেই পিন ফেলে দিয়ে নতুন একটা লাগাতে হত। আর দম শেষ হলে সাইকেলে ব্রেক মারলে যেমন ঘসঘস শব্দে তার চাকা থেমে যায়, তেমনই শব্দ করে চাকতিটি থেমে যেত। দম দেওয়ার জন্য ইংরাজি জেড আকৃতির একটি ছোটো দণ্ড ছিল। সেকালের বেডফোর্ড কোম্পানির মোটরগাড়ির গলা বের করা ইঞ্জিনে স্টার্ট দেওয়ার জন্যে এমনই একটি বড়ো আকারের দণ্ড থাকত। সেটি অনেকেই দেখে থাকবেন। ইঞ্জিন চলবে না বলে গোঁ ধরলে ড্রাইভার তার সিটে বসে খালাসিকে বলত, – হ্যান্ডেল মার পটলা। তারই ক্ষুদ্র সংস্করণ গ্রামোফোনের এই হ্যান্ডেল। সেটি চাকতির এক পাশে থাকা একটি ফুটোর মধ্যে গলিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দম দিতে হত। দম সম্পূর্ণ হলে হ্যান্ডেল আর ঘোরানো যেত না। গান নয়, আমাদের আসল আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল গ্রামোফোন নিজের হাতে চালানো, দম দেওয়া আর পিন পালটানো। সেই অধিকার পেতে আমাদের বহুকাল অপেক্ষা করতে হয়েছিল। যার শখে কেনা সেই জ্যাঠতুতো দাদার কাছে সেটি পুরনো হয়ে যাওয়ার পরে তা আমাদের হস্তগত হয়। গ্রামোফোনে নাকি সুরে গান হত, কী গান সে আর মনে নেই। কিন্তু পিসতুতো দাদা হারমোনিয়াম বাজিয়ে যেসব গান করতেন, তার দুটি খুব মনে আছে। ‘আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল’ আর ‘কোনো এক গাঁয়ের বধুর কথা তোমায় শোনাই শোন’।

তো সেই পিসতুতো দাদা সিগারেট খেতেন। বড়োদের কাছে লুকিয়ে খাওয়াই দস্তুর হলেও ছোটোদের দেখায় বাধা ছিল না। আমরা অবশ্যই তাঁর সিগারেট ও ধোঁয়া দেখতাম। প্যাকেট কখনও চোখে পড়েনি। পড়ল যখন তখন আমরাই তার মালিক। তিনি যাওয়ার সময় গোপন স্থান থেকে সেটি নিয়ে যেতে ভুলে গেছেন। অতএব আমি আর ভাগ্নে সেটি নিয়ে বিকেলে মাঠ সারতে গেলাম। মাঠ সারাটা মিছিমিছি, আসলে সেই মহার্ঘ ধুম্রের আস্বাদনে সাবালক কর্মে হাতেখড়ি নেওয়া। উত্তেজনার চোটে প্যাকেটের খিল খুলতেই লেগে গেল মিনিট পাঁচেক। তারপর ঢিপিঢিপি বুকে দুজনে দুটি ঠোঁটে নিয়ে অগ্নিসংযোগ। প্রথম টানেই দম গেল আটকে। তারপর কাশি। ভাগ্নের কম, আমার বেশি। গা গুলিয়ে মাথা ঘুরে এক অসৈরণ কাণ্ড। দুজনেই প্রতিজ্ঞা করলাম, এই শেষ, এ-জীবনে আর নয়। প্যাকেট শুয়ে রইল আলের পাশে, অনুতপ্ত আমরা ফিরে এলাম বাড়ি।

আমরা দুজন কেউই রাম নই, কাজেই সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার কোনো দায় যে ছিল না, সেটা বলাই বাহুল্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *