নায়িকার ভূমিকায়। পর্ব ১। লিখছেন স্পন্দন ভট্টাচার্য।

“স্ক্রিন- পর্দাই আমার নিজস্ব জগৎ” – নিজেকে মনে মনে রোজই বলেন চন্দ্রাবতী দেবী । সময়টা গত শতকের  ২০র দশকের শেষ। বায়োস্কোপের জনপ্রিয়তার কল্যাণে চন্দ্রাবতী দেবীর স্বপ্নে আসা যাওয়া করেন লুপে ভ্যালে, চার্লি চ্যাপলিন, গ্রেটা গার্বোর মতো তারকারা। অভিনয়ের ক্ষিদে থে্কেই শুরু হয় ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ খোঁজা। অবশেষে সুযোগ একটা মেলে। সাহিত্যিক সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় ওঁর স্বামীর বন্ধু,  তাঁরই গল্প ‘পিয়ারী’ অবলম্বনে আরম্ভ হয় ছবির কাজ। নায়িকার ভূমিকায়  চন্দ্রাবতী দেবী। তার সঙ্গে গুরু দায়িত্ব ছবি প্রযোজনার। ঊনিশশো তিরিশ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিতে (পরিচালক বিমল পাল) চন্দ্রাবতী দেবীই একাধারে প্রযোজিকা ও অভিনেত্রী! ইতিহাস তৈরি করে তা নিয়ে যেন খানিক নিরাসক্তি নিয়েই লিখছেন আত্মজীবনীতে, “আমিই প্রযোজিকা- আমিই নায়িকা, সেই নির্বাক ছবি পিয়ারী-র। যত দূর জানি ভারতবর্ষে আমিই বোধ হয় প্রথম মহিলা প্রযোজিকা। আমার কোম্পানির নাম ‘মুভি প্রডিউসার্স”। ভারতের বা বাংলার চলচ্চিত্র নিয়ে একটু আধটু চর্চা করি যারা, কজন খবর রেখেছি এই নায়িকা-প্রযোজিকার?

দ্বিতীয় ঘটনাটিও কাছাকাছি সময় কালের। বাংলার চলচ্চিত্র জগতের পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (ডিজি) হন্যে হয়ে নায়িকা খুঁজছেন তাঁর ছবি ‘ফ্লেমস অফ ফ্লেশ’ এর জন্যে। তাঁর অধ্যাপক বন্ধুর স্ত্রীকে প্রস্তাব দেওয়ায় বন্ধু বলে উঠলেন, “নিজের ঘরে এমন সুন্দরী স্ত্রী আছে। আমার কাছে এসেছেন কেন?”। স্ত্রী প্রেমিকা দেবী ঠাকুর পরিবারের মেয়ে, ছবির জগতে প্রবেশ ছিল কল্পনারও অতীত। কিন্তু রাজি হলেন স্বামীর অনুরোধে। প্রথম অভিনয়েই সবার নজর কাড়লেন আর তারপর থেকে নিয়মিত হল অভিনেত্রী জীবন। ‘পঞ্চশর’  ছবির কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে তখন। ধীরেন্দ্রনাথ-প্রেমিকার দ্বিতীয় সন্তান ধীরাজের মৃত্যু হল নিউমনিয়ায় ভুগে। পুত্রশোকে পাথর প্রেমিকা দেবী এলেন স্টুডিও ফ্লোরে। ভগ্ন মন, ক্লান্ত শরীর নিয়েও ছবির প্রয়োজনে  ঘোড়ায় চড়া, পাহাড় থেকে পড়ে যাওয়ার মতো কঠিন দৃশ্যে অভিনয় করে সমাপ্ত করলেন ছবির কাজ। কিন্তু এরম প্রতিশ্রুতিময় অভিনেত্রীর অভিনয় জীবন হলো না দীর্ঘস্থায়ী। অকাল মৃত্যু কেড়ে নিল যখন এই অভিনেত্রীকে, তখন তাঁর বয়স মাত্র বাইশ। তাঁর মৃত্যুর পর ফিল্ম পত্রিকা চিত্রলেখায় (২০শে ডিসেম্বর, ১৯৩০) প্রতিবেদন বেরোলো– “দুঃসাহসিকা ছাড়া আমাদের দেশের ভদ্রমহিলারা এখনও চলচ্চিত্র শিল্পে যোগদান করতে নারাজ। অথচ শিক্ষিত কৃষ্টি সম্পন্ন মহিলা অভিনেত্রী বিনা কোনো চলচ্চিত্রই সফল হইবার কথা নয়। প্রেমিকা দেবী এই নিতান্ত দুঃসাহসিকাদের অন্যতম ছিলেন। তাহার অকাল মৃত্যুতে চলচ্চিত্র জগতের যে ক্ষতি হইল তাহা শীঘ্রই পূরণ হইবার নহে।”

গত শতকের ২০,৩০ ও ৪০এর দশক জুড়ে, অর্থাৎ বাংলা চলচ্চিত্রের আদি যুগে এই ‘দুঃসাহসিকা’ অভিনেত্রীরা তাদের অভিনব ভূমিকা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন বারেবারে আর তাদের সিনেমার প্রতি ভালবাসা, নিষ্ঠা, প্যাশন আর সর্বোপরি তাদের শিল্পবোধ ও প্রাণপাত করা পরিশ্রমে বর্ণময় করে তুলেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র। অথচ হাতে গোনা দু’একজন অভিনেত্রী ছাড়া কারও কথাই  গুরুত্ব পায়নি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে। একদিকে যেমন চন্দ্রাবতী দেবী বা কানন দেবীর মতো অভিনেত্রীরা চলচ্চিত্রের শিল্পের ঐ আদি যুগে দৃষ্টান্ত তৈরী করেছিলেন প্রযোজিকা রূপে, অন্যদিকে রয়েছেন সাধনা বোসের মতো গুণী নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যপরিচালিকা যিনি চলচ্চিত্রের নৃত্যের আঙ্গিকে নিয়ে এসেছিলেন নতুন ভাবনা। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, জনপ্রিয় ভারতীয় চলচ্চিত্রে  নৃত্যের প্রয়োগ ও তার শিল্প ভাবনার ক্ষেত্রে সাধনা বোস একজন পথিকৃৎ। অথচ বিস্মৃতপ্রায়। একই রকম বিস্মৃতি গ্রাস করেছে  বীণাপাণি দেবী, রানিবালা দেবী, সুনন্দা দেবীর মতো গুণী অভিনেত্রীদেরও। বিস্মৃতির এই ধারা কিছু ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত অমনোযোগ হলেও অনেকাংশেই নির্ধারিত মূলধারার লিঙ্গ-রাজনীতিতে। যেই  রাজনীতিতে পুরুষ ও পৌরুষ এর একচেটিয়া গল্প বলায় অবজ্ঞা-উদাসীনতায় ঢাকা পড়ে নায়িকা্র ভূমিকা। বাংলা চলচ্চিত্রের আদি যুগে এই নায়িকা্র ভূমিকা বৃহত্তর পরিসরে অনেক সময়ই ছবি তৈরির গল্পে গায়িকা-পরিচালিকা–প্রযোজিকারও ভূমিকা। তাই এই ভূমিকা  বিস্মৃতপ্রায় হলে সেই বিস্মৃতির রাজনীতি মনোযোগের দাবী রাখে বইকি।

আর শুধু মনোযোগই যথেষ্ট নয়, বিস্মৃতির রাজনীতির পাল্টা স্মৃতির ও স্মৃতিচারণের রাজনীতি এই সময়ের দাবি। একথা অনেকেই জানি বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি বড় সংখ্যক অভিনেত্রী এসেছিলেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সম্প্রদায় থেকে।পরিস্থিতি বদলায় তিরিশের দশকে, ছবিতে শব্দ আসায়।  কথা বলা, গান গাওয়া ছবির প্রয়োজনেই ছবির জগতে আসেন বাঙালি পরিবারের মেয়েরা আর  সংস্কারাচ্ছন্ন পুরুষ শাসিত সমাজ ঝড় তোলে নিন্দা-সমালোচনার। একদিক থেকে দেখলে ৩০ ও ৪০ এর দশকের এই নায়িকারা বিপ্লব নিয়ে আসছেন ঘরের চার দেওয়ালের বাইরেও মহিলাদের এক নতুন কর্মজগতের ধারনা নির্মাণ করে। এই সব নায়িকাদের জগৎ আবর্তিত হচ্ছে পে-রোল, চুক্তিপত্র, মাইনে, ট্যাক্স এর মতো শব্দদের নিয়ে। থিয়েটারও এই কর্মজগৎ নিয়ে এসেছিল। কিন্তু চলচ্চিত্রের সংগঠিত কাজের দুনিয়ায় এই ওয়ার্কিং উওম্যান এর পরিচিতি আরও স্পষ্ট। নায়িকার ভূমিকায় এভাবেও ঘরে-বাইরে ছক ভাঙছেন মেয়েরা।

এই ‘দুঃসাহসিকা’ অভিনেত্রীরা বেছে নিচ্ছেন নিজের পেশাই শুধু নয়, অনেক ক্ষেত্রে মনমতো জীবনসঙ্গীও। আর সেইসঙ্গে নীতিপুলিশদের ভয়ের কারণ হয়ে উঠছেন নায়িকারা। অথচ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে (পড়ুন ভদ্রলোক বাঙালি পুরুষ ও পৌরুষের স্থির করে দেওয়া ইতিহাসে)অমনোযোগ আর উদাসীনতায় বিস্মৃত হয়ে রইলেন এই অভিনেত্রীরা। তবুও আশার  কথা এই যে দীর্ঘ এক নীরবতা ভেঙে ইদানীং কিছু নায়িকাদের নিয়ে বাংলা প্রকাশনা জগত আগ্রহ দেখাচ্ছে। দু’একটি লিটল ম্যাগাজিন বিশেষ সংখ্যাও বার করছে। কয়েকজন নায়িকাদের আত্মজীবনীও প্রকাশিত হয়েছে। যদিও কা্নন দেবীর মতো দু’তিন জন তারকাকে নিয়ে যতটা উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তার সিকিভাগও অন্য নায়িকারা পাচ্ছেন না। তারকা চর্চাও সিনেমার ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়, কিন্তু তারকা বৃত্তের মধ্যে থাকা নায়িকাদের নিয়েই শুধু চর্চা ও আলোচনা সীমিত রাখলেও তো চলবে না। তাই এই তারকা নির্ভর ম্যাপের বাইরে বেরিয়ে এই ধারাবাহিকে আমার মনোযোগ থাকবে বাংলায় চলচ্চিত্রের প্রথম পর্বে নায়িকাদের সামগ্রিক অবদানে ও নামী-অনামী বিভিন্ন নায়িকাদের ভূমিকায়।

বাংলায় চলচ্চিত্র লাভজনক ব্যবসা হিসেবে দেখা দেওয়ার পরপরই ১৯২০ থেকে ১৯৪০ এর মধ্যভাগ বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প (শিল্প কথাটি আর্ট এবং ইন্ডাস্ট্রি দুই অর্থেই প্রযুক্ত এখানে)এক সুবিশাল নির্মাণ ও বিনির্মাণের সাক্ষ্মী। এইযুগের শুরুতে বেশ কিছু সংখ্যক বাঙালি  ভদ্রলোক যোগ দেন চলচ্চিত্র নির্মাণ, অভিনয় ও ব্যবসায়। ১৯৩০ এ চলচ্চিত্রে শব্দ এসে যাওয়ার পর জনপ্রিয় হতে থাকে ভদ্রলোক পরিচালিত চলচ্চিত্র সংস্থাগুলো। সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র গুলো লোকমুখে প্রচলিত হতে থাকে ‘বই’ হিসেবে। আর নিউ থিয়েটার্সের মত স্টুডিও সবচেয়ে উজ্জ্বল এই ‘বই’ এর বাজারে। সাহিত্যনির্ভর স্টুডিও ‘সোশ্যাল’কে দেখা হতে থাকে বাঙালির রুচিশীল সিনেমার আদর্শ হিসেবে। প্রযুক্তি বিশেষত শব্দ প্রযুক্তি  আমূল বদলে দ্যায় ছায়াছবির ভাষা। নেপথ্যসঙ্গীত এর প্রচলনের পর বদলে যায় ফিল্ম মেলোড্রামার গঠন ও গড়ন। এইসব নির্মাণ – বিনির্মাণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকেন  ‘দুঃসাহসিকা’ অভিনেত্রীরা- নেতৃত্বে, পরিশ্রমে ও শিল্পবোধের বিস্তারে। কিছু ইতিহাস লিখিত, কিছু  শুধুই ঘরোয়া আড্ডায় ঘোরাফেরা করে বিস্মৃত। সেইসব স্মৃতি-বিস্মৃতি নিয়েই এগোবে এই ধারাবাহিক, এই আশাই রইল। আজ এই অবধিই।

(ক্রমশ)

 

স্পন্দন ভট্টাচার্য
স্পন্দন ভট্টাচার্য চলচ্চিত্র বিদ্যার ছাত্র, গবেষক এবং অধ্যাপক। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র চর্চার যাঁরা সূত্রধর এবং অগ্রণী স্পন্দন তাঁদের মধ্যে একজন। নির্মুখোশে স্পন্দন লিখছেন বাংলা ছবিতে প্রথম যুগের নায়িকাদের নিয়ে।

+ posts

7 thoughts on “নায়িকার ভূমিকায়। পর্ব ১। লিখছেন স্পন্দন ভট্টাচার্য।

  1. স্পন্দন ভট্টাচার্য চলচ্চিত্র বিদ্যার ছাত্র, গবেষক এবং অধ্যাপক। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র চর্চার যাঁরা সূত্রধর এবং অগ্রনী স্পন্দন তাঁদের মধ্যে একজন। নির্মুখোশে স্পন্দন লিখছেন বাংলা ছবিতে প্রথম যুগের নায়িকাদের নিয়ে। খুব কম লেখা হয়েছে এই সময়কে নিয়ে। খুব কম তথ্য পাওয়া যায়। কাজেই আমার মতো অনেকেই নিশ্চই উন্মুখ হয়ে থাকবেন। অনেক শুভেচ্ছা রইলো স্পন্দন।

    1. অনেক ভালবাসা কল্লোল-দা। আমিও যে এ বিষয়ে অনেকটা জানি এরকম নয়। তবে আগ্রহ রয়েছে খুবই আর মনে হয় এই অভিনেত্রীদের নিয়ে আরও কাজ আমাদের করা উচিত।

  2. অপূর্ব লেখা। এই সময়ের অভিনেত্রীদের নিয়ে বিশেষ কাজ হয়েছে বলে জানা নেই। এক কানন দেবীর বিখ্যাত আত্মজীবনী টি ছাড়া, আর কোনো মহিলা অভিনেত্রীদের রেফারেন্স সহজলভ্য নয়। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

    1. অনেক ধন্যবাদ। সত্যিই খুব কম কাজ হয়েছে । ইচ্ছে রয়েছে কাজ করার, কতটা পেরে উঠব জানা নেই। ভাল থাকবেন।

  3. চন্দ্রাবতী দেবীর আত্মজীবনীর নাম ও প্রকাশনা জানালে ভাল হয় দাদা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed