স্মরচিহ্ন । পর্ব ১০ । কুপ্রস্তাব । লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

খর গ্রীষ্মের প্রাকদুপুরে সকাল-ইস্কুল থেকে সারা গায়ে-পায়ে রাস্তার ধুলো মেখে ফেরার পথে নিজের গাঁয়ে পা দেওয়া মাত্র সেই আশ্চর্য, প্রায়-অলীক দৃশ্যটি চোখে পড়ে গেল আমার। আমাদেরই গাঁয়ের ধানুকাকা কলুপাড়ার মনু গরাই-এর কোমরে গরু-বাঁধা দড়ি দিয়ে বেঁধে টানতে টানতে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। ধানুকাকার তীক্ষ্ণ রিনরিনে স্বরে ক্রোধের হুঙ্কার, মনু গরাই-এর ভীত-সন্ত্রস্ত, অপরাধী মুখ ঝুলে আছে তার বুকের উপর। তাদের পিছনে পিছনে এগিয়ে আসছে কোলাহল; উত্তেজিত ও কৌতূহলী মানুষের দঙ্গল।

জীবনে সেই প্রথম দেখলাম একজন মানুষের অ-মানুষিক ছবি। গরু-ছাগলকে দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়। মানুষকেও সেই দড়ি দিয়ে বাঁধা যায়! বোধের মধ্যে সেই প্রথম ভাঙচুর।

বিশ শতকের মাঝামাঝি এক প্রান্তিক জেলার ততোধিক প্রান্তিক গাঁয়ে গ্রীষ্মের দিনগুলি শুরু হত বিলম্বিত পয়ারের ছন্দে। ভোরের আলো না ফুটতেই বাবার ডাকে নিতান্ত অনিচ্ছায় বিছানা ছেড়ে মুখ ধোয়ার অছিলায় ঘুমচোখে বাড়ির পিছনের বাগানের সরু পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শান-বাঁধানো কুয়োর সরু পাড়ে সটান শুয়ে পড়া। অমনি বদ্ধ ঘরের ঘামে ভেজা শরীরে বাতাবি ফুলের গন্ধ মাখা ভোরের হাওয়া ঝিরঝির করে বয়ে যেতে থাকে। ঘুম ও নিঘুমের মাঝে দোল খেতে খেতে তখন আন্দাজ পাওয়ার চেষ্টা
আর কত ক্ষণ বয়ে গেলে তবে রান্নাঘরে ঠিক সময়ে হাজিরা দিতে পারব। তারপর দই-মুড়ি খেয়ে বই-দপ্তর বগলে নিয়ে পায়ে পায়ে এঁটেল মাটি-গুঁড়োনো ধুলো-ওড়া দেড় মাইল পথ পেরিয়ে বিজন মাঠে শাপলা-ফোটা পুকুরের পাশে আমাদের ছোটো ইস্কুলটিতে পৌঁছে যাওয়া। ইস্কুলের সময়টুকুই যা নিরানন্দের। ছুটির ঘণ্টা পড়তেই বাড়ির দিকে দৌড়। পলকেই ফুরিয়ে যায় রাস্তা। কোনোরকমে বাড়িতে বই-দপ্তর ফেলে দিয়েই খালের বাঁধে। সঙ্গিসাথীদের সাথে বাধের উঁচু পাড় থেকে ঝাঁপিয়ে, ডিগবাজি খেয়ে দু-মানুষ গভীর খালের জলে সাঁইসাঁই করে ঢুকে পড়া। সেখানে অফুরন্ত সাঁতার, ডুব দিয়ে জলের তলা থেকে মাটি আনার প্রতিযোগিতা। তারপর বাড়ি এসে গোগ্রাসে ভাত গিলে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। জামের লালাভ থোকা কালো হয়ে উঠল কিনা দেখার জন্যে জাম গাছে চড়া, আমের তপ্ত সবুজ শরীর নরম হয়েছে কিনা দৃষ্টি দিয়ে তা অনুমান, এবং অনুমান মোক্ষম হল কিনা আমগাছে উঠে তা পরখ করা। পিঁপড়ের শত্রুতা সামলে ডালে ডালে দুপুরের শেষ ভাগ কাটিয়ে রোদ্দুরের তেজ কমে এলে বিশাল সবুজ মাঠে হা-ডু-ডু, দাড়িয়াবন্ধ। বিজলিহীন পৃথিবীতে গ্রীষ্মই শ্রেষ্ঠ কাল – ঘামাচি গায়ে থাকুক, গরম কাকে বলে জানা হয়নি তখনও। অন্ধকার নেমে এলে হ্যারিকেনের আলোয় বই নিয়ে ঢুলতে ঢুলতে একেবারে ভোরে বাবার ডাকে বিছানায় উঠে বসা।

শান্ত ছন্দের আনন্দময় দিনগুলিতে আচমকা কেন একজন মানুষ আর একজন মানুষের কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যায়? ধানুকাকা লম্বা লম্বা পা ফেলছে, মনু গরাই পা ঘষটাতে ঘষটাতে তার পেছনে। অনেক লোক জমে গেছে রাস্তায়। বিপন্ন মুখে মনুর বুড়ো বাবাও হাঁটছে সকলের পিছনে। অবাক হয়ে দেখলাম, ‘মধ্যম কত্তা, মধ্যম কত্তা’ বলে ডাকতে ডাকতে আমাদের বাড়িতেই ঢুকে পড়ল ধানুকাকা। তার পিছনে মনু, মনুর পিছনে পুরো জমায়েত। আমাদের বাখুল ভরে গেল মানুষের ভিড়ে। কোনোরকমে লোকের ফাঁকফোকর খুঁজে বাড়িতে ঢুকে আমি রান্নাঘরের দাওয়ায় উঠে পড়লাম। ততক্ষণে ধানুকাকা তার হাতে ধরা দড়ির প্রান্ত ঢেঁকিচালার খুঁটিতে বেঁধে ফেলেছে। মনুর ঘাড় একই রকম ঝুঁকে আছে নীচের দিকে। তার বাবা দু-হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে বসে পড়েছে মাটিতে। উঠোনে পড়ে থাকা একটা খাটো বাঁশ তুলে নিয়ে ধানুকাকা মনুর আদুড় পিঠে, পায়ে দুমদাম করে পেটাতে শুরু করল। আমি চোখ বুজে ফেলি। রান্নাঘরের দরজার কাছ থেকে ছায়ের বিরক্ত গলা ভেসে আসে,– এসব আমাদের বাড়িতে কেন…।

একটু পরেই ওদিকের ঘর থেকে বাবা বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে যান। বলেন, – কী – হয়েছেটা কী?

ধানুকাকা হাতের বাঁশ মাটিতে নামিয়ে রেখে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, –পুচিকে কুপ্রস্তাব দিয়েছে! অ্যাতো বড়ো আস্পদ্দা – কলুর ব্যাটা বাম্ভনকন্যাকে কুপ্রস্তাব দ্যায়! তুমি এর বিচের করো মধ্যম কত্তা।

কুপ্রস্তাব? মানে কী তার? বর্ণের সঙ্গে বর্ণ জুড়ে উচ্চারিত শব্দের দ্যোতনা আমার ন’বছরের মস্তিস্কের অর্গলে নাড়া দিতে থাকে।
ধানুকাকার গলা শুনতে পাই, –হাপুস চোখে কাঁদতে কাঁদতে তখনই আমার নিষ্পাপ মেয়ে এসে তার মাকে সব বলে। কী বিচের – মধ্যম কত্তা, তুমি বললে এখনই আমি কাতান দিয়ে কলুর ব্যাটার নুনুটা কেটে দি’ –

মনুর পায়ে, খোলা পিঠে লম্বা লম্বা লাল দাগ। তার মুখ ফ্যাকাসে, একটা অবোধ প্রাণীর মতোই তার দু-চোখের চাউনি। তার বাবা সজল চোখে হাতজোড় করে ধানুকাকার পায়ের কাছে বসে আছে।

সেদিকে চোখ রেখে আর বাবা কী বলেন তার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমি দ্রুত বড়ো হয়ে উঠছিলাম। এক আশ্চর্য কুয়াশা আমার মাথার ভেতর থেকে গলা বেয়ে বুকের মধ্যে ঝরে পড়ছিল। সেই কুয়াশা-পতন ঝাপসা করে দিচ্ছিল সামনের দৃশ্যকে। এক অনিঃশেষ সংশয়ের আবর্তে পড়ে আমার এতদিনের সহজ-সরল-আনন্দময় জীবনে ঢুকে আসছিল নিষ্ঠুর অচেনা এক মেঘ আর ক্রমশই তা আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আমূল ভিজিয়ে দিচ্ছিল।

1 thought on “স্মরচিহ্ন । পর্ব ১০ । কুপ্রস্তাব । লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

  1. গ্রাম্য জীবন এর সুন্দর বর্ণনা। মাত্র নয় বছর বয়সের ঘটনার উপলব্ধি যে ভাবে লেখক স্মৃতিচারণ করে গল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন তা এককথায় অনবদ্য। আশা করছি লেখকের স্মৃতির ভান্ডার থেকে আরও ঝাঁপি খুলে আমাদের সামনে তুলে ধরবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *