স্মরচিহ্ন । পর্ব ৯ । কিশলয় মানে সবুজ পাতা । লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

আমাদের পাঠশালার সিলেবাস নিয়ে আমার যে স্মৃতি তার মধ্যে সন্দেহের অনেক অবকাশ আছে। সেকালের তথ্য যাচাই করে দেখলে সে-সন্দেহের নিরসন কিছুটা সম্ভব। কিন্তু স্মৃতিগদ্যে বিস্মৃতির জন্যেও কিছুটা জায়গা ছেড়ে রাখা দরকার, নইলে স্মৃতি চরিত্রভ্রষ্ট হয়।

পাঠ্যসূচির এক নম্বরে বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয়, প্রথম ভাগ। আমার কেন যেন মনে হয়, প্রথম ভাগের ছোটো-বড়ো ছিল। প্রচলিত বর্ণ পরিচয়ের যে ছবিটি আজও পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, আয়তনে তার থেকে ছোটো, চৌকো একটি ছোটো প্রথম ভাগ ছিল যেটি ছবিসহ বর্ণমালার বিবরণেই শেষ হয়ে যেত। প্রচলিত আয়তাকার সংস্করণটিকে আমরা বলতাম বড়ো প্রথম ভাগ। বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয় নিয়ে সাম্প্রতিক কালে প্রাইমার-গবেষকদের মধ্যে ধুন্ধুমার বিতর্ক হয়ে গেল। সেসব আলোচনার মধ্যে ছোটো প্রথম ভাগের কথা একবারও উচ্চারিত না হওয়া সত্ত্বেও তার যে ছবিটি আমার মাথায় ভাসে সেটিকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে রেখেছি। যাচাই করে দেখতে গিয়ে সেই ছবিটি যদি মুছে দিতে হয়, সে-কষ্ট সহনীয় না হওয়াই সম্ভব।

দু’নম্বরে ভয়াবহ যুক্তাক্ষর-সমন্বিত বর্ণ পরিচয়, দ্বিতীয় ভাগ। এটা ছিল বেশির ভাগ পড়ুয়ার অগ্নিপরীক্ষা। পনশয়(পণ্ডিতমশায়)-এর বেত এড়িয়ে এটিকে টপকে যাওয়া কঠিন ছিল। তিন নম্বরে ধারাপাত। সংখ্যা-পরিচয় তথা অঙ্কের প্রাইমার। মূলত নামতা, গুণনের তালিকা। এই বইটিও ছিল বর্ণ পরিচয়ের আকারে, লাল বা গোলাপি রঙের মলাট। এটি হাতে আসার আগেই পাঠশালা শুরুর আগে দলবদ্ধ হয়ে সমস্বরে নামতা হাঁকার কল্যাণে সব পড়ুয়ার অনেকটাই মুখস্থ হয়ে যেত। ১৯ সংখ্যার নামতা দিয়ে শেষ হত ধারাপাত।

চার নম্বরে কিশলয়। কিশলয় শব্দের সঙ্গে ‘মানে কচি পাতা’ শব্দ তিনটি এখনও আপনাআপনি মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। তৃতীয় শ্রেণিতে কিশলয় শুরু। চতুর্থ শ্রেণিতে কিশলয়ের দ্বিতীয় ভাগ। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কিশলয়-ই প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয় আমাদের। ‘কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি’-র পদ্য ছন্দের সঙ্গে ‘আবদুল মাঝি, ছুঁচলো তার দাড়ি, গোঁফ তার কামানো’-র গদ্য ছন্দও আমাদের কানে ঢোকে। কিশলয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বোধ হয় কামিনী, প্রিয়ম্বদা দেবী, সুখলতা রাও ছিলেন। মদনমোহন ছিলেন কিনা মনে করতে পারছি না।

পাঁচ নম্বরে প্রকৃতি বিজ্ঞান – এটিও শুরু তৃতীয় শ্রেণি থেকে। পরিচিত কিছু প্রাকৃতিক ঘটনার বিবরণ ও ব্যাখ্যা দিয়ে ভূগোল ও বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার প্রয়াস ছিল সেই বইটিতে।

অঙ্ক নিয়ে স্মৃতিটা বেশ গোলমেলে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে যোগ থেকে ভাগ পর্যন্ত শেখানো হত। আঙুলের গাঁট গুনতে শেখানো থেকে শুরু করে যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ পাঠ্যপুস্তকের সাহায্য ছাড়াই পনশয়রা শিখিয়ে দিতেন। নিজেরাই মুখে মুখে অঙ্ক দিতেন, শুনে শুনে পড়ুয়ারা স্লেটে লিখে অঙ্ক করে তাঁদেরকে দেখাত। ছোটো আকার থেকে ক্রমশ বড়ো আকারে উত্তরণ ঘটত সেই সব অঙ্কের। সব পড়ুয়াদের গতি সমান ছিল না। ফলে শ্রেণির মধ্যে শ্রেণি তৈরি হত। কয়েকজন হয়তো যোগবিয়োগেই আটকে রইল, তো কয়েকজন গুণ পেরিয়ে ভাগে পৌঁছে গেল। ফলে পনশয়কে একই শ্রেণির পড়ুয়াদের আলাদা আলাদা অঙ্ক দিতে হত। এই অঙ্ক-দৌড়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সত্যর সঙ্গে ছুটতাম আমি। প্রতিযোগীদের মধ্যে রেষারেষির সঙ্গে প্রেমও অঙ্কুরিত হতে পারে। সে কথা এখন নয়, বলব এই লেখার শেষে।

গণিতের পাঠ্য বই ছিল না বললাম, কিন্তু নব মুকুল বা গণিত মুকুল – এই ধরনের একটা নাম কেন যে আবছা ভেসে এল মনে কে জানে! পাটিগণিতের ছোটো ছোটো সমস্যা যার সমাধান হয় যোগ বিয়োগ গুণ ভাগে, সেগুলো নইলে কোথায় ছিল? ভগ্নাংশ কি শিখেছিলাম পাঠশালায়? এই অংশটা একেবারেই ধূসর। দশমিক তো আরও পরের ব্যাপার। হিসেব করে দেখলে যে-বছর আমি প্রথম পাঠশালা গেছি সেবছরই চালু হয়েছে মেট্রিক পদ্ধতি। শুভঙ্করের আর্যা মুখস্থ করার হাত থেকে তাই রেহাই মিলেছিল,
দশমিকের হিসেব গ্রামের পাঠশালা পর্যন্ত তখনও এসে পৌঁছয়নি।

পরীক্ষা – সেটাও শুরু ওই তৃতীয় শ্রেণি থেকে। ছাপানো প্রশ্নপত্রে উত্তর লেখার জন্যে প্রশ্নের তলায় জায়গা থাকত। পরীক্ষার শেষে দোয়াতের কালি উলটে দু-এক জন পড়ুয়ার উত্তরপত্র অপাঠ্য হয়ে গেলেও বাকি সকলের উত্তরপত্রে নিব থেকে ঝরে পরা কালির আলপনা সত্ত্বেও দিব্যি পড়া যেত। তবে পনশয়রা সেগুলি পড়তেন বলে মনে হয় না। কারণ পরীক্ষায় কেউ কখনও কোনো নম্বর পেয়েছে বলে কেউ শোনেনি। কিন্তু পাশ ফেল ছিল। বছরের শেষে কোনো কোনো পড়ুয়ার নাম উঠত উপরের শ্রেণিতে, উঠত না অনেকেরই। পরীক্ষার সঙ্গে পাশ-ফেলের কোনো সংশ্রব ছিল না, পনশয়রা আগে থেকেই
জানতেন কারা পাশ কারা ফেল।

সবশেষে আসত ছয় নম্বর বই। ছাত্রবন্ধু। গায়েগতরে অনেকখানি সেই বই। তার মধ্যে রাশি রাশি প্রশ্নমালা। তার উত্তরও লেখা থাকত। চতুর্থ শ্রেণির শেষ পরীক্ষার কয়েক মাস আগে থেকে বারবার সেই সব প্রশ্নমালার উত্তর লেখার অভ্যাস করতে হত। সেই পরীক্ষাটা পাঠশালায় হত না। সিট পড়ত অনেক দূরের কোনো বড়ো ইস্কুলে। সব পরীক্ষার্থীদের নিয়ে এক পনশয় গিয়ে আগের দিন উঠতেন সেই ইস্কুলের বোর্ডিং-এ। সঙ্গে থাকত একজন রাঁধুনি। বোর্ডিং-এর একটি ঘর বরাদ্দ সকলের জন্যে। রাতের খাওয়া
শেষ হলে মেঝেতে লম্বা বিছানা পাতা হত। একদিকে ছেলেরা অন্যদিকে মেয়েরা। মধ্যিখানে পনশয় আর রাঁধুনি। সেই রাত্রে আমার প্রথম ভূত দেখা। দেখিয়েছিল দুর্গা নামে এক সহপাঠী।

বিশাল মাঠের মাঝে সেই ইস্কুল আর বোর্ডিং। তার এক প্রান্তে অজস্র ঝুরি নামানো একটা বিরাট বট গাছ, অন্য প্রান্তে তালগাছের সারি। রাতে খাওয়ার পরে বিছানা পাতা হচ্ছে, –ভূত দেখবি তো আয় – বলে দুর্গা আমাকে মাঠে নিয়ে গেল। আমি জীবনে প্রথম ভূত দেখলাম। এক লম্বা ছায়া বট গাছের মাথা থেকে তাল গাছের মাথায়, আবার তাল গাছ থেকে বটের মাথায় আসাযাওয়া করছে। অবাক হয়েছিলাম খুবই, ভয় তেমন পাইনি। পরের দিন হাই বেঞ্চিতে দোয়াত রেখে কলমের নতুন নিব ডুবিয়ে উত্তরপত্রে পর পর সব প্রশ্নের উত্তর লিখে সময়ের অনেক আগেই বেরিয়ে এসেছিলাম। দোয়াত বা নিব থেকে এক ফোঁটা কালিও পড়েনি উত্তরপত্রে। আগের দিন রাতে পনশয় বুঝিয়েছিলেন খাতায় কালি ফেললে ফেল, না ফেললেই পাশ।

একদিনেই পরীক্ষা শেষ। তিনটে তো বিষয় – বাংলা, অঙ্ক আর প্রকৃতি বিজ্ঞান। বোর্ডিং-এ ওই একদিনই রাত্রিবাস। পরের দিন পরীক্ষা-শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সুয্যি ডুবে যায়।

সিলেবাসের শেষ কথাটা এবার বলেই ফেলি। উচ্চ বিদ্যালয় বা কলেজে ছেলে মেয়ে এক সাথে পড়াশোনা করলে তাদের সিলেবাসে প্রেম অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই বলে পাঠশালাকে এই বিষয়ে একেবারেই অবজ্ঞা করবেন না। বিশ্বাস করুন, বালক-বালিকাদের মধ্যেও প্রেম হয়। যারা নিজের ছেলেবেলা ভুলে গেছেন, তাঁদের বিব্রত করতে চাই না, কিন্তু যারা ভোলেননি তাঁরা স্মৃতি হাতড়ে দেখুন। মনেও পড়তে পারে স্ফুটনোন্মুখ প্রেমের সলজ্জ উপস্থিতি। যে সত্যর সঙ্গে আমার রেষারেষির কথা বলেছিলাম, সে ছিল একটি দীঘল শ্যামলা রঙের মেয়ে। খাড়া নাক, পাতলা ঠোঁট, মাথায় এক ঢাল চুল। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখতাম, সেও আমাকে। চোখে চোখ পড়লে তার মুখে রঙ জমত, চকিতে সরিয়ে নিত চোখ। ব্যাখ্যাহীন এক ভালোলাগায় মন ভরে উঠত। ফ্রয়েড এটাকে কী বলবেন জানি না, কিন্তু তখনও কাম জাগেনি শরীরে। অন্য সহপাঠিনীদের সঙ্গে দেদার কথা হত, তাদের কাঁধে হাত দিয়ে পথ চলতে কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু সত্যর সঙ্গে সলজ্জ দূরত্ব, কথা একটিও নয়।

একদিন পাঠশালা থেকে ফিরছি সবাই। অনেকটা পথ। সত্যর সঙ্গে আমার অনেকটা ব্যবধান। পদি নামে একটি মেয়ে আমার মুখের দিকে ইঙ্গিতময় দৃষ্টি রেখে সত্যর কানে কানে কী যেন বলল। নিমেষেই রাঙা হয়ে উঠল সত্যর মুখ। দুম দুম করে পদির পিঠে দুটো আদরের কিল বসিয়ে দিল।– লুকনো প্রেম রয় না ঘরে/আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ে। কে যেন লিখেছিলেন? তাহলে কি শুধু পদি নয়, সবাই দেখেছে সেই আলো?

পদি তার মাস দুয়েক পরেই কি যেন একটা অসুখে দুম করে মরে গেল। পোড়ানোর যোগ্য হয়নি বলে তার বাড়ির লোকেরা তাকে মাঠের মধ্যে গর্ত খুঁড়ে চাপা দিয়ে এল। অনেক দিন সেই জায়গাটা ঢিবির মতো একটু উঁচু হয়ে রয়ে গেল।

সত্যর সেদিনের লজ্জারুণ মুখের সুখস্মৃতির সঙ্গে একটা ক্ষতের মতো সেই ঢিবিটাও জুড়ে রইল চিরকালের মতো।

2 thoughts on “স্মরচিহ্ন । পর্ব ৯ । কিশলয় মানে সবুজ পাতা । লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

  1. শেষের স্মৃতিটা বেশ ভাল। সত্যান্বেষণ করার চেষ্টা করলে হয়। খুব সুন্দর লেখা। পাঠ্যক্রম সম্পর্কে পুরান দিনের ছবি তুলে আনার জন্য ধন্যবাদ। শেষে লেখকের শিশুমনের কল্পনা দিয়ে যে রসসৃষ্টি করা হয়েছে তা অনবদ্য।

    1. কি যে ভাল লাগল তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। ছোটবেলায় ফিরে যেতে যেতে দুটো কথা মনে হল… বলেই ফেলি। অঙ্ক বইটির নাম ছিল নব গণিত মুকুল। আর দ্বিতীয় শ্রেণীতে আমরা সরল অঙ্ক শিখেছিলাম। বিষয়টা মনে থাকার কারণ আছে। হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় আমার সামনের বেন্চে বসেছিল ক্লাসের ফার্স্ট বয়। যথারীতি ঘেমে নেয়ে সরল অঙ্ক কষে তার উত্তর বের করি ১৮। চোখ চলে গেল সামনের বেন্চে বসা ফার্স্ট বয় পিণাকীর খাতার দিকে…. ওর উত্তর ৮। আমার হিংসুটে মন পরম আহ্লাদিত হল। বাড়ি ফিরে যখন উত্তর মেলাই ওটা ৮ এসেছিল। বিশ্বাস করুণ গোটা একটা দিন মনের দু:খে কেটেছে….. 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *