অভিনয় । শোভন

অনীকের হাত কাঁপছে। আলতো করে মোচড়াতেই লাল রঙের জিনিসটা বেরিয়ে এল। সবে ঠোঁটের কাছে নিয়ে এসেছে, লাগাবে বলে। কিন্তু মা ঘরে ঢুকে পড়ল। অনীককে ওই অবস্থায় দেখে চমকে উঠল মা। অনীকও।

“কী করছিস আমার লিপস্টিক নিয়ে? নতুন এটা, একদিনও লাগাইনি এখনও। দু’দিন না হয় একটু সবুর করতি!”

অনীক মুচকি হেসে লিপস্টিকটা মায়ের হাতে ধরিয়ে দিল। “তোমাকে বলতে তো ভুলেই গেছি, কলেজের নাটকে আমি দ্রৌপদী চরিত্রে অভিনয় করছি। আজকেই রিহার্সাল শুরু হচ্ছে।”

“বাঃ, পেয়েছিস তাহলে রোলটা!”

মা সবে স্নান করে এসেছে। চুলগুলো ভেজা এখনও। অফ হোয়াইট রঙের একটা তোয়ালে দিয়ে আস্তে আস্তে চুল শুকাচ্ছে আর অনীকের সঙ্গে কথা বলছে বিছানায় বসে। মায়ের গা থেকে সুন্দর একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। অনীক বড় করে দু’বার শ্বাস টেনে গন্ধটা ফুসফুসে ভরে নিল। সতেজ, স্নিগ্ধ। মা অনীকের দিকে না তাকিয়েই চুল মুছতে মুছতে শান্ত স্বরে বলল, “তোর কি মনে হয় তুই রোলটা ঠিকঠাক করতে পারবি?”

অনীক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। নিজের চেহারার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। চোখের মণি দু’টো একটু কাঁপল এদিক ওদিক। নৈঃশব্দ্য। মায়ের পায়ের কাছে এসে বসল। হাতদু’টো আলতো করে চেপে ধরে বলল, “হ্যাঁ, মা।” একটু দম নিয়ে আবার বলল, “আমি তো দ্রৌপদীদের চিনি। জানি আমি তাদের, বুঝি, অনুভব করি। রোজকার লড়াইটা দেখি। দেখি কী করে তারা ভেতরে আর বাইরেটা সামলে নেয়। জানি কী করে তারা চারিদিকের লোলুপ দৃষ্টিগুলোর সাথে যুদ্ধ করে। আমি পারব, মা।”

মা কিছুই বললনা। ঢাকনাটা খুলে লাল রঙের লিপস্টিকটা আনীকের ঠোঁটে লাগিয়ে দিল সুন্দর করে। “নে রাখ, এটা তোর।”

অনীকের এখনও দাড়ি গজায়নি। আদুরে মুখ। বড় বড় চোখ, দেখে মনে হয় যেন কাজল মেখেছে, আদপে নয়। ঘন দীর্ঘ চোখের রোম। সরু নাক আর ঠোঁট। মুখের বাঁ দিকে নাকের পাশে ছোট্ট একটা তিল।

অনীক আবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর গোলাপী ঠোঁট দু’টো এখন ঘন লাল। হাসল। মুখের কালো তিলটা একটা টোলের মধ্যে ডুবে গেল। অনীক হারিয়ে গেল নিজের প্রতিচ্ছবির মধ্যে। উলটো দিকের অনীকটা আয়নায় টোকা দিয়ে ডাকছে এবার অনীককে, চিৎকার করে ডাকছে, “অনীক, অনীইইইইইইই…ক! সে আসছে! শুনতে পাচ্ছিসনা? তোর মাথার কোঁকড়ানো চুলগুলো! লুকিয়ে রাখ… নইলে সে এসে তোর চুল ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। তুই কাঁদবি, চিৎকার করবি, কিন্তু কেউ বাঁচাতে আসবেনা। আহ্‌! আমি যে বন্দী। কী করি অনীক? পারবি তো নিজেকে বাঁচাতে?”

অনীক কেঁপে উঠল। অনেক অনেক কণ্ঠ একসাথে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। মনে হচ্ছে ওর সমস্ত দেহটা নগ্ন। শ’য়ে শ’য়ে চোখ ওর গায়ের কাপড় টেনে টেনে খুলে ফেলছে। চেটে আর চেখে দেখছে ওর সমস্ত শরীর। কুঁকড়ে গেল অনীক। কিন্তু তাও ওর কোমল নরম কোমড়টা দেখা যাচ্ছে। ফর্সা তলপেট আর নাভির কাছটা স্পটলাইটের আলোয় আরও উজ্জ্বল হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে সবার। সবার অট্টহাসি এবার যেন হাততালিতে বদলে গেল। পর্দার পেছনের অন্ধকারে অনীক ধীরে ধীরে মিশে গেল। একটা উষ্ণতা জড়িয়ে ধরল তাকে। কিছু দেখতে পাচ্ছেনা। গন্ধ পেল একমুঠো। মা। অনীক এবার নিরাপদ।

অনীক ঘুমোচ্ছে। মুখটা দেখেছ? কী শান্ত, পবিত্র। ওর বিছানাটা জানলার ঠিক পাশেই। রাতের বেলায় জানলাটা খোলাই থাকে। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার কিন্তু কোথা থেকে একটা হালকা আলো অনীকের মুখে এসে ছিটিয়ে পড়েছে। তির তির করে কাঁপছে আলোটা। দেখ দেখ, আলো আর অন্ধকার কেমন কানামাছি খেলছে অনীকের মুখের ওপর আর ওর ভেতরের সমস্ত কষ্ট আর কান্নাগুলোকে শুষে নিছে ধীরে ধীরে।

“কষ্ট? কান্না? কীসের কষ্ট ওর?”

উমমম্‌… দাঁড়াও। অনীক ডায়েরি লেখে দেখেছি। ও ঘুম থেকে জেগে ওঠার আগেই ওর ডায়েরির দু’ চার পাতা পড়লে কেমন হয়? হতেই পারে আমরা কিছু নতুন জিনিস জানতে পারব।

এইযে, অনীকের ডায়েরি। আমি আন্দাজে কোন এক পাতা বের করে পড়ছি, ঠিক আছে?

“… একটা এক্সপ্রেস ট্রেনের ভেতরে। একটু আগে ট্রেনটা স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে। এটাই শেষ স্টেশন। তাই ভেতরে কেউই নেই। বাতি নেভানো। জানলা আর দরজা গুলো তখনও খোলা। খোলা জানলা দিয়ে প্ল্যাটফর্মের আলো কামরার ভেতরে প্রবেশ করেছে। আলো আর আঁধার দু’জন মিলে খুনসুটি করছে, হাসছে, খেলছে। মনেই হচ্ছিল না যে আমরা একটা ক্লান্ত ট্রেনের কামরার ভেতরে দাঁড়িয়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছি, বরং মনে হচ্ছিল আমরা মেঘের ওপরে দাঁড়িয়ে। পায়ের নীচে মেঘ, মাথার ওপরেও মেঘ। মাঝে মাঝে চাঁদের আলো মেঘ ছিঁড়ে আমাদের উঁকি দিয়ে দেখছে। অন্ধকার আমাদের প্রশ্রয় দিল। ঠোঁটের উষ্ণতা বিনিময় করলাম। বাইরের প্ল্যাটফর্মের শব্দ জমাট বেঁধে উবে গেল আমাদের চারপাশ থেকে। আমরা কেঁপে উঠলাম একসাথে। আমার জিহ্বা ওর জিহ্বা ছুঁয়ে এল। সায়নী আমার মাথাটা ধরে রেখেছে একহাতে, আমার লম্বা কোঁকড়ানো চুলের মধ্যে ওর সরু আঙ্গুলগুলো বিলি কাটছে। ওর লাল রঙের লিপস্টিক আমার মুখে লেপ্টে গেছে। সায়নী মুখ সরিয়ে নিল হঠাৎ করে, ছুটে ট্রেন থেকে নেমে পড়ল আমাকে রেখেই।

আমার প্রথম চুমু। সায়নীর প্রথম নয়। তবে আমার মনে হয় প্রথম বার হলেও আমি খুব একটা খারাপ ছিলাম না। এখনও মনে আছে সায়নী আমার ঠোঁট ছুঁয়ে কীভাবে কেঁপে উঠেছিল।”

অপূর্ব! (আবার নৈঃশব্দ্য। একটা দীর্ঘশ্বাস)

আরেকটা পাতা পড়ি। যদিও এভাবে কারও ডায়েরি পড়া ঠিক নয়, কিন্তু কৌতূহল হচ্ছে! দেখি কী লেখা:

“আমি তাঁকে অন্য অভিনেতাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে অভিনয় করতে দেখেছি। তোমরা হয়তো ভাবছ আমি খুবই অস্বস্তিতে ভুগি। না, ভুগিনা। আমার মা নিজের ব্যাক্তিগত জীবন আর নিজের পেশার মধ্যে সীমারেখা টানতে জানে। বোঝে যে কী করে শুরু করতে হয় আর কোথায় ইতি টানতে হয়। মা জানে সিনেমার সেট-এ নিজের চরিত্রকে কীভাবে অনায়াসে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়। আমার যখন দুঃখ হয়, মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আমার মন ভালো হয়ে যায়। আমার ‘বন্ধুরা’ (সত্যিই কি ওরা আমার বন্ধু?) মায়ের সিনেমার বিভিন্ন সিনের কথা, তার সাথে তার নায়কের ‘রসায়ন’ নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে বলে আমাকে বিরক্ত করত। এমনকি আমার টিচাররাও কখনও সুযোগ পেলে উল্টোপাল্টা বলতে ছাড়েনি। খুব খারাপ লাগত আগে। রাগ হত। কষ্ট হত। কিন্তু এখন আর হয়না। আমি মায়ের ভেতরের ঝড়-ঝাপটা গুলো আঁচ করতে পারি। আমি ভালই বুঝি ক্যামেরা বা পাবলিকের সামনে মা’র নকল হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকা চিৎকারটা। কেউ শুনতে পাক বা না পাক, আমি পাই। সত্যি কথা বলতে গেলে, পাবলিক ফিগারদের ব্যাক্তিগত জায়গাটা খুবই সীমাবদ্ধ, চারপাশে একটা গণ্ডী টানা। তবে আমার মা খুব দৃঢ় মনের মানুষ। কে কী বলল তাতে মা কান দেয়না। মায়ের যত চিন্তা আমাকে নিয়েই।

মা’কে আমি কখনই আমার বাবার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করিনি। মা একদিন নিজেই সেই ‘ব্যাক্তি’ সম্বন্ধে অনেক কথা বলেছিল। আমি সেই ‘ব্যাক্তি’র নাম বলছিনা। মায়ের প্রথম স্বামী। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সবকিছু বদলে গেল। ডিভোর্স। মিডিয়া জুড়ে ‘কেচ্ছা’র বন্যা বইল। আমি তখন মায়ের পেটে। জন্মের পর আমার কথা ভেবে মা আবার বিয়ে করল। কিন্তু কোন এক কারণে এই বিয়েও বেশিদিন টিকল না। যাই হোক, তারা এখন কোথায় আছে বা কী করছে সেসব নিয়ে আমার কোনই মাথাব্যথা নেই। আমার চিন্তা মা’কে নিয়েই। দ্বিতীয় বারের পর মা আর কোন বিয়ে করেনি। আমার কখোনো কখোনো মনে হয় এই বিশাল জনসমুদ্রের ভেতরে থেকেও মা কোথাও বড়ই একা। মা’র অসংখ্য ভক্ত। কত লোকের হার্টথ্রব আমার মা। কোন সিনেমা রিলিজের আগে বড় বড় হোর্ডিং-এ মা’র ছবিতে শহর ছেয়ে যায়। তা সত্ত্বেও মা ভেতরে একা। যখনই আমি মায়ের ঘরে ঢুকি, আমি সেই শূন্যতাটা অনুভব করি। কেবল দক্ষিণের দেয়ালে একখানা ঘড়ি, অক্লান্তভাবে সময় দেখিয়ে যাচ্ছে। কোন দাবি নেই, শুধু টিক, টিক, টিক…। বাকি দেয়াল গুলো নির্লজ্জ, খালি, নগ্ন। আমি তাকালেই ওই দেয়াল গুলো কেবল খিল খিল করে হাসে। আমার খুব ভয় করে।”

আমার মনে হয় এর পর আর পড়া উচিত হবেনা।

“না! প্লীজ, আর অন্ততঃ একটা পাতা! অনীক তো এখনও ঘুমোচ্ছে।”

আচ্ছা… এটাই তবে শেষ পাতা, কেমন? আমি একদম শেষ পাতাটা পড়ছি।

“আজ আমার এক স্মরণীয় দিন। একটা বিশেষ ঘটনা ঘটেছে আজ। তবে সেটা শুরু করার আগে পুরোনো কিছু কথা আমার বলার দরকার।

কয়েক সপ্তাহ ধরেই লক্ষ্য করছিলাম মা বেশ খুশি খুশি। যত্ন করে সাজগোজ করছে। কোন শ্যুটিং বা পার্টি না থাকলেও। মায়ের কথা বলা বা সাজ-পোষাকের ধরণও কোথাও যেন একটু বদলে গেছে। এমনিতে মা খুবই অন্তর্মুখী। অন্য যে কারোর তুলনায় আমি মা’কে বেশ ভালো করেই চিনি। সামান্য বদলও আমার নজরে পড়ে যায়। নিশ্চয়ই কোন ব্যাপার আছে। ঘরের দেওয়ালগুলো দিনে দিনে রঙিন হয়ে উঠছে।

মা’র সাজগোজের জিনিস ব্যবহার করার একটা প্রবণতা আমার মধ্যে ছিল। কখনও কখনও মায়ের বিভিন্ন ধরণের পোষাকও পরে দেখতাম। মা এসবে কখনোই আপত্তি করেনি। একদিন মা’কে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করে বসলাম যে কেন মা আমাকে মেয়েদের ড্রেস বা কসমেটিক্স ব্যবহার করতে নিষেধ করেনা! মা হাসল। (মায়ের হাসিটা ভোরবেলার মিষ্টি হাওয়ার মতো। মনটা নিমেষে
ভালো হয়ে যায়।) ধীর অথচ জোর গলায় বলল, “কারণ তুই পছন্দ করিস!”

“কিন্তু এরকম করা তো খারাপ, তাইনা?”

“শোন, ‘ভাল’ আর ‘খারাপ’ একেক জনের কাছে একেক রকম। তোর যদি মনে হয় তুই কোন কাজ ঠিক করছিস, কারও ক্ষতি না করে, তাহলে সেটা করে যা। যদি তোর নিজের ভাল না লাগে, তাহলে সেটা নিয়ে জোর করিসনা।”

“আমি কী করে বুঝব যে কোনটা আমার ভাল লাগছে বা লাগছে না, খুবই কনফ্যুসড হয়ে যাই মা!”

মা আবার হাসল (আহ্‌, কী শান্তি!)।

“নিজের মন আর অভিজ্ঞতা দিয়ে।”

সেদিন দেখলাম মা কিছু নতুন কসমেটিক্স কিনেছে। মায়ের ঘরে গেলাম। ঘরটা মায়ের মতই হাসি খুশি হয়ে রয়েছে। আলোয় ভরা। সুন্দর একটা গন্ধ। ড্রয়ার খুলে দেখলাম একটা নতুন লিপস্টিক। খুবই সুন্দর। লাল রঙের। মা স্নান করতে গেছে, সময় লাগবে। ভাবলাম এই সুযোগে লিপস্টিকটা লাগিয়ে দেখি কেমন লাগে। মা হঠাৎ করে যে ঘরে ঢুকে যাবে ভাবিনি। কিন্তু মা কিছুই বলেনি। আগেও না করেনি কখনও।

যাই হোক, মায়ের সাথে কথা বলার সময় মায়ের চোখে মুখে অদ্ভূত এক খুশির ঝিলিক দেখতে পাচ্ছিলাম। মজার ছলে জিজ্ঞাসা করলাম। মায়ের গাল দু’টো লাল হয়ে গেল। আমার কথাকে ঠাট্টা করে উড়িয়ে দিল না, বরং কতকটা গম্ভীর ভাবেই বলল আমাকে শীঘ্রই কারণটা জানাবে।

আজ আমাকে সেই কারণ জানাল মা। অনেক গৌরচন্দ্রিকার পর শেষ পর্যন্ত বলল মা আবার বিয়ে করতে যাচ্ছে!

প্রিয় ডায়েরি, আমি তোকে একটুও মিথ্যে বলবনা। এক মুহূর্তের জন্যে হলেও আমার মনে হচ্ছিল আমার ভালবাসা এবার ভাগ হয়ে যাবে। মায়ের পৃথিবীতে এতকাল এই অনীক ছিল কেবল, এবার আরেকজন আসবে। আমার ভালো লাগেনি। কিন্তু যখন ঘুরে তাকালাম পেছনের দিন গুলোর দিকে, দেখলাম আমার মা আমাকে এতদিন কীভাবে সবসময় আমাকে সাপোর্ট করে এসেছে। শক্ত মনের মানুষ, তার শক্তি আমাকে আত্মবিশ্বাস যুগিয়ে এসেছে। মা-ই তো আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে সব বিরুদ্ধ শক্তির সামনে কোমড় সোজা করে দাঁড়াতে হয়। যেটা সঠিক সেটার জন্য কীভাবে আওয়াজ তুলতে হয়। আর এখন যখন আমার যখন মা’র পাশে গিয়ে দাঁড়ানো খুবই দরকার, আমি স্বার্থপরের মতো নিজের আদরের ভাগ নিয়ে দুঃখ করছি! আমি সংযত হলাম। মা’কে জড়িয়ে ধরলাম। শক্ত করে। মা সেই মানুষটিকে কাল আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসবে বলল।”

আচ্ছা! তো এই হল ব্যাপার। নতুন বাবার সাথে কাল অনীকের দেখা হবে! কে সে ভদ্রলোক? জানার খুব কৌতূহল হচ্ছে।

অনীক আজ সকাল সকাল উঠে পড়েছে। আকাশটা মেঘলা হয়ে রয়েছে। বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে। ওর ঘরের খোলা জানলা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস নির্লজ্জের মতো ঢুকে পড়ে সব এলোমেলো করে দিচ্ছে। অনীক বিছানায় বসে, মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। লম্বা কোঁকড়ানো চুলগুলো দিয়ে ওর মুখটা ঢেকে গেছে। এলোমেলো বাতাসে সেগুলো দুলছে। অনীক কিছু ভাবছে।

“আচ্ছা, আমার নতুন বাবা যদি মায়ের মতো আমাকে বুঝতে না পারে তবে কী হবে! যদি সে ভালো মানুষ না হয়! আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছে গুলো কি মেনে নেবে? আমি যেমন তেমনটা কি আমাকে থাকতে দেবে? আর আমিই কি তাকে মেনে নিতে পারব?”

অনীকের মাথার মধ্যে অনেকগুলো অনীক এসে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে! মুখের ওপর থেকে চুলগুলোকে টেনে পেছনে সরিয়ে দিল। চোখদু’টো ফুলে রয়েছে। তাও আজকে যেন চোখদু’টো আরও সুন্দর লাগছে। সায়নী একবার বলেছিল, অনীক কেন সবদিক থেকেই এত পারফেক্ট! সেজন্য ওর খুব ভয়। সে বলে, “আমার কোন গ্রীক দেবতা চাইনা, রক্ত মাংসের একটা ‘সখুঁত’ মানুষ চাই।” (‘সখুঁত’ শব্দটা অনীক সায়নীর মুখেই প্রথম শুনেছে।)

শুনে অনীক খুব হেসেছিল সেদিন। হাসি থামলে বলল, “কেউ পারফেক্ট নয় রে! ভগবানও নয়। আমরা নিজেরাই অন্যদের ওপর ‘পারফেকশন’ এর ভাবনাটা আরোপ করি কেবল। তোর দিক থেকে হয়তো মনে হয় আমি নিখুঁত, কিন্তু সায়নী, কাছে আয়, আমাকে ছুঁয়ে দেখ, ভেতরটায় অনেক জায়গায় অন্ধকার গলি পড়ে রয়েছে, কেউ হাঁটেনি সে গলিতে। এখনও কোন এক পথিকের আশায় বসে আছে, সেই গলিতে আলো ফেলবে বলে।” সায়নী আর অনীকের হাতদু’টো একে অন্যকে জাপটে ধরল।

মা বাড়িতে নেই। কোথায় গেছে তাও জানা নেই। অবশ্য এটা অনীকের কাছে নতুন ঘটনা নয়।

বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। এককাপ কফি নিয়ে নিজের ঘরে জানলার ধারে একটা চেয়ারে বসল। হাতে বই। সায়নী দিয়েছে। জন্মদিনে। গন্ধটা! কী দারুণ। গায়ে কাঁটা দিল। গায়ে একটা শাল জড়িয়ে নিল।

কলিং বেল! বাজল নাকি? একবার। দু’বার। মা এল? সঙ্গে কি বাবাও? অনীক উঠল। তাড়াহুড়ো করে। কাপটা টেবিলে রাখল। বইটা বিছানায়। শালটাও। বুকটা কাঁপছে। বুকের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। মা এখনও বলেনি কে তার নতুন বাবা। খুবই টেনশন হচ্ছে। অ্যাড্রিনালিন!

দরজা খুলল অনীক। মা। মুচকি হাসছে। সেই মন ভাল করা হাসি। আর বাবা? কোথায়? নেই তো!

অনীকের মনটা একটু দমে গেল। কত কিছুই না ভাবছিল নতুন বাবাকে নিয়ে। কিন্তু হলটা কি বাবার? প্ল্যান বদলে গেছে? একগাদা প্রশ্ন এসে ভিড় করছে। বলল, “বাবা?”

মা ধীরে সুস্থে দু’টো ছাতা বন্ধ করে মেঝের অপর একপাশে রেখে দিল। জোর বৃষ্টি হচ্ছে। মায়ের পাশে অন্য একজন মহিলা। মা তার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, “তোর নতুন মা।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *