স্মরচিহ্ন। মহলদার। পর্ব ২। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

মহলদার

সে ছিলএক উৎসবমুখর ছেলেবেলা। সরল, অনাড়ম্বর, নিতান্তই শিশুমনের উৎসব। উৎসবের দিনগুলি আসত ঋতুচক্রের স্বাভাবিক পথে। হেমন্তের আগমনে একজন প্যাকাটি-চেহারার মলিন বর্ণের মানুষ তারই মতো দেখতে একটি উঠতি বয়সের শাগরেদ সঙ্গে করে হাজির হত আমাদের গাঁয়ে। তাদের পরনে লুঙি আর ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া রঙিন গেঞ্জি। গাঁয়ের প্রান্তে এক খণ্ড পোড়ো জমিতে বাসা বাঁধত তারা। জংগল থেকে কচি শালের বল্লা আর কাঁচা শালপাতা মাথায় করে বয়ে নিয়ে এসে তা দিয়ে সেই জমির এক প্রান্তে ফুট তিনেক উচ্চতার বামনাকৃতি একটি কুমো বানাত। অন্য প্রান্তে চার ফুট লম্বা আর দু ফুট চওড়া একটি গর্ত খুঁড়ে একটি উনুন। কুমোটি ছিল তাদের একাধারে শয়ন ও ভাঁড়ার ঘর। এসব কর্মকাণ্ড চলত আমাদের অগোচরেই। আমরা সম্ভবত তখন ফসল-ওঠা মাঠে ধানশীষ কুড়নোর বা ইঁদুরের গর্ত থেকে তাদের সঞ্চিত ধান লুঠের উৎসবে মগ্ন থাকতাম। হঠাৎ-ই একদিন নজরে পড়ে যেত, তালপাতায় বোনা একটি থলে কোমরে ঝুলিয়ে তরতর করে রাস্তার পাশের খেজুর গাছে উঠছে একটি রোগা, কালো মানুষ। তার থলে থেকে উঁকি মারছে এক গাছা মোটা দড়ি আর একখানা ধার-চকচকে হেসো। নিমেষেই আমাদের বুকের মধ্যে উৎসবের ঢাক বেজে উঠত। পরদিন ভোরে উঠেই একটি গেলাস নিয়ে ছুট লাগাতাম সেই নির্দিষ্ট জায়গার দিকে যেখানে ফি-বছরই খাঁদুর খেজুরমহল বসে। কাছাকাছি গিয়ে পড়লেই শালপাতার ধোঁয়ার সঙ্গে ফুটন্ত রসের অতি চেনা মিশ্র গন্ধটি নাকে এসে ঢুকত। সেখানকার দৃশ্যটিও অতি পরিচিত। কুমোর গায়ে শালের শুকনো ডাল-পাতা ডাঁই করা, লম্বা উনুনে নৌকার মতন লোহার কড়াই-এ ফুটছে খেজুর রস। খাঁদুর চেলাটি ক্রমাগত ডালপালা ঠেসে চলেছে উনুনের মুখে আর খাঁদু একটা লম্বা হাতা দিয়ে ফুটন্ত রসে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। এক দঙ্গল আমার মতোই বালকবালিকা ছোট ছোট ঘটি-গেলাস যে-যার সামনে রেখে লাইন দিয়ে বসে আছে। আমিও চটপট বসে পড়তাম সেই লাইনে। নির্দিষ্ট সময় হলেই হাতাধারী মহলদার পাশে রাখা হাঁড়িটি নিয়ে পঙক্তির কাছে চলে আসবে। তারপর হাঁড়ি থেকে সকলের পাত্রেই পরপর রস ঢেলে দেবে। এমনই তার হাতের মাপ – কোনো পাত্রেই এক বিন্দু কম বা বেশি পড়বে না। সেই কনকনে রসটুকু চোঁ চোঁ করে গিলে নিলেই সেদিনের মতো উৎসব শেষ।

প্রতিদিনের রসোৎসব ছাড়াও প্রতি তিন দিনে একদিন হত লবাতোৎসব। সেই বস্তুটি তৈরি হতে খানিক বেলা হয়। গরম গুড়কে বহুক্ষণ ধরে ঘষে ঘষে ঘন করতে হয়। উনুনের পাশেই ফুটখানেক উঁচু বালির একটি চৌকোনা ঢিপি। তাতে সমান দূরত্বে সারি সারি গর্ত করে তার উপর একটি পাতলা চাদর পাতা হয়। তারপর মহলদার সেই চাদর-ঢাকা গর্তগুলিতে ঘন গরম গুড় পরপর ঢেলে দিতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পরে গুড় ঠাণ্ডা হয়ে শক্ত হয়ে গেলে সেগুলি একে একে তুলে কাঁচা শালপাতা বিছানো বাঁশের ঝুড়িতে রাখা হয়। এভাবেই তৈরি হয় খেজুর গুড়ের পাটালি। আমরা বলতাম ‘লবাত’। সেগুলি গর্ত থেকে তোলার সময় গর্তের কিনারায় গড়িয়ে পড়া পাতলা অংশগুলি ভেঙে যায়। খদ্দেরদের বিক্রি করার আগে মহলদার সেই ভাঙা পাটালিগুলি উৎসর্গ করে তার খুদে খুদে অতিথি নারায়ণদের। অন্য নারায়ণরা কীভাবে সেই সামান্য নৈবেদ্যের আস্বাদ নিত খেয়াল নেই, কিন্তু আমি কৃপণের মতো তা থেকে একটু একটু করে ভেঙে জিভে দিতাম। জিভ আর তালুর মধ্যে একটুখানি চেপে রাখলেই সেটি গলতে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে স্বাদে-গন্ধে আমোদিত হয়ে উঠে শরীরের প্রতিটি রোমকূপ।

বছরের পর বছর আসতে আসতে মহলদারের সঙ্গে গ্রামের অনেকেরই বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়ে গিয়েছিল। তারা তাকে খাঁদু বলে ডাকলেও বুড়োরা এবং আমরা তাকে খাতির করে মহলদার বলেই সম্বোধন করতাম। খেজুর গাছের মালিকদের সঙ্গে তার গাছ-প্রতি গুড় দেওয়ার একটা বার্ষিক বন্দোবস্ত থাকত। সে যে মুসলমান সেকথা জানার কোনো সুযোগ সেই বেলা আমার হয়নি। আমাদের অঞ্চলে মুসলমান বসতি ছিল না বলে তাদের নিয়ে আলাদা কিছু সচেতনতা আমাদের গড়ে ওঠেনি। আর পাঁচজন বাইরের মানুষের মতো অতিথি-খাতিরই তার বরাদ্দ ছিল। ‘নেড়ে’ বা ‘মোসলা’ বিশেষণে ভূষিত করার মতো ব্যুৎপত্তি গ্রামের লোকেরা তখনও পর্যন্ত অর্জন করতে পারেনি।

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকেই বোধ হয় খাঁদুর আসা বন্ধ হয়ে যায়। ততদিনে তার বেশ বয়সও হয়ে গিয়ে থাকবে। তার ছেলেপুলেদের মহলদারের কাজে উৎসাহ না থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। কারণ খাটুনির তুলনায় আয় ছিল অতি নগণ্য। বন্দোবস্ত নেওয়া গাছগুলিকে কামানোর পর সেগুলিকে দুটি ভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করা হয় যাতে প্রতিটি অঞ্চলে গাছের সংখ্যা কমবেশি সমান থাকে। প্রথম অঞ্চলে পর পর তিন দিন রস নামানো হয়। সেই দিনগুলিতে দ্বিতীয় অঞ্চলের গাছগুলি সব বিশ্রাম পায়। চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ দিন পর্যন্ত দ্বিতীয় অঞ্চলে রস নামানো হয়। প্রথম অঞ্চল তখন বিশ্রামে। পর্যায়ক্রমে এইভাবেই চলে রস-আহরণ। তিন দিন বিশ্রামের পর প্রথন দিনে যে রসটি নামে সেটিই সর্বোৎকৃষ্ট। নাম ‘জিরান কাট’। দ্বিতীয় দিন ‘মধ্যম কাট’, তৃতীয় দিন ‘শেষ কাট’। অঞ্চল বিশেষে এই নাম ভিন্ন হতে পারে। আকাশ যত পরিষ্কার থাকে রসের উৎকর্ষও তত বাড়ে। পাটালি সর্বোত্তম হয় মেঘ ও কুয়াশাহীন রাতের জিরান কাটের রসে।

এবার মহলদারের কাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলে তার খাটুনির খানিকটা আন্দাজ পাওয়া যাবে। গুড় তৈরি শুরু হওয়ার অন্তত দিন দশেক আগে থেকে তার প্রাথমিক কাজগুলি সেরে ফেলতে হয়। প্রথমেই মহলের জায়গা পরিষ্কার করে কুমো আর উনুন তৈরি। তারপর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে জংগল থেকে শালপাতা আর সরু সরু ডালপালা সংগ্রহ করে নিয়ে এসে শুকোতে দেওয়া। একটি মরশুমে মহলের আয়ু বড়জোর পঞ্চাশ দিন। এই পঞ্চাশ দিনের জ্বালানি গাছ কামানোর আগেই মজুত করে ফেলতে হয়। পরবর্তী কাজ বন্দোবস্ত নেওয়া গাছগুলির ডালপালা ছেঁটে রস নামানোর উপযোগী করে কামিয়ে ফেলা। তার সঙ্গে প্রতিটি গাছের জন্যে গড়ে দেড়খানা করে ‘গুঁজি’ তৈরি করা। ‘গুঁজি’ হল সরু ফাঁপা বাঁশের নল। এক খণ্ড গোলাকার নলকে মাঝখানে চিরে দুটি ‘গুঁজি’ হয়। এর একটি দিক কিছুটা সরু করে গাছের কামানো অংশে গুঁজে দেওয়া হয়। এই নল দিয়ে রস চুয়ে পড়তে থাকে গাছের গায়ে ঝোলানো মাটির হাঁড়িতে। রস নামানো শুরু হলে পর প্রাত্যহিক কাজের পরিমাণও কম নয়। যদি ষাটটি গাছের মহল হয় তাহলে প্রতিদিন বিকেলে তিরিশটি কামানো গাছ আবার এক পরত চেঁছে তাতে গুঁজি লাগিয়ে হাঁড়ি ঝোলাতে হয়। চেঁছে নেওয়া জালির মতো এই পাতলা পরতটি দিয়ে হাঁড়ির মুখ ঢেকে দেওয়া হয়। রাতচরা পাখি বা অন্যান্য প্রাণী যাতে রসে মুখ ডুবিয়ে বা বিষ্ঠা ত্যাগ করে রস নষ্ট করতে না পারে সেজন্যেই এই ব্যবস্থা। পরদিন ভোরবেলায় উঠেই গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামিয়ে সেগুলি বাঁকে করে মহলে নিয়ে আসা। এসেই গুড় জ্বাল দেওয়া শুরু। পাতা ও সরু ডালপালার আগুন বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। তাই একজনকে ঠায় বসে থাকতে হয় উনুনের মুখে ক্রমাগত জ্বালানি জুগিয়ে যেতে। সে সময়টায় মহলদার সমানে গুড়ের পাক তদারকি করতে থাকে। গুড় তৈরি, তার বিক্রিবাটা, রসের হাঁড়ি শুকোনো, গুড়ের নৌকা পরিষ্কার করতে করতেই বেলা ঢলে যায়। তখন কোনোমতে চান সেরে সেদ্ধ ভাত বা খিচুড়ি দিয়ে পেট ভরানো। ততক্ষণে গাছে টাঙানোর জন্যে বাঁকে হাঁড়ি ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ার সময় হয়ে যায়।এরই মধ্যে তাকে সামলে চলতে হয় দুষ্টু ছেলেদের ক্রিয়াকাণ্ড। হাঁড়ির রস ঢেলে নিয়ে জল ভরে দেওয়া খুবই নির্দোষ মজা, কিন্তু তার বদলে হিসি করে রাখলে খাঁদুর আমের সঙ্গে ছালার মতো রসের সঙ্গে হাঁড়িও যায়। খাঁদুকেও তাই ব্যবস্থা নিতে হয়। ধুতরো বীজ কী পরিমাণে রসের হাঁড়িতে দিয়ে রাখলে ছেলেরা একটা পুরো দিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না অথচ সেই রস ফুটে গুড় হলে তার মাদকক্রিয়া নষ্ট হয়ে যাবে, সে সম্বন্ধে নিখুঁত জ্ঞান ছিল খাঁদুর।

মাঘ মাস শেষ হওয়ার মুখে মহলদার খাঁদু পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যায় তার গাঁয়ে। খেজুরমহলের ভূমিটুকু তার মসৃণ গায়ে ভাঙা উনুনের ক্ষত নিয়ে একলা পড়ে থাকে গাঁয়ের বাইরে। খাঁদুর লাগানো গুঁজি তখনও লটকে থাকে কোনো কোনো খেজুর গাছের আগায়। আর সেই গুঁজি বেয়ে টপ টপ করে ঝরে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা রস। টোকো গন্ধে ভরে উঠে চারপাশ। দু-একটা পাখি সেই গন্ধের টানে গুঁজিতে বসে রসের স্বাদ নেয় কখনও-সখনও। মাছি ভনভন করে রসে-ভেজা এক টুকরো মাটিতে। আর সে টোকো গন্ধ নিশ্বাসের সঙ্গে বুকের মধ্যে ঢুকে পড়লে টনটন করে ওঠে আমাদের বুক।

+ posts

6 thoughts on “স্মরচিহ্ন। মহলদার। পর্ব ২। লিখছেন অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

  1. অসাধারণ একটি স্মৃতিকথন। অনবদ্য দলিল শুধু আগামী প্রজন্মের জন্য নয় বর্তমান প্রজন্মের জন্যেও। পত্রিকা কতৃপক্ষকে শত শত ধন্যবাদ। মুখিয়ে আছি পরবর্তী কিস্তির জন্য।

  2. খুব সম্ভবত মহলদারের গল্প ফেসবুকে পোষ্ট করেছিলেন । মহলদারের কাহিনী বর্তমান প্রজন্মের কাছে একটি দলিল ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed