নাটক জড়িয়ে বেঁচে থাকা মানুষদের আখ্যান ‘নদীয়া জেলার নাট্যচর্চা’। লিখছেন সুজন বন্দ্যোপাধ্যায়

গ্রন্থ আলোচনা: লিখছেন সুজন বন্দ্যোপাধ্যায়

নদীয়া জেলার নাট্যচর্চা। শতঞ্জীব রাহা। সুপ্রকাশ। মুদ্রিত মূল্য: ৩৫০ টাকা।

বইটির নাম দেখে প্রথমেই মনে হয়, একটি জেলাতে আবার কীসের নাট্যচর্চা! বিশেষ করে যখন আমাদের ধারণা কসমোপলিটন কলকাতা থেকে মফস্বলে সংস্কৃতির সবই এসেছে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ফিল্টার-ডাউন পদ্ধতিতে! তবে শুধু কি কিছু তথ্য এক জায়গায় করাই এ বইয়ের উদ্দেশ্য? লেখক প্রথম কথার জবাব দিয়েছেন ও দ্বিতীয় সন্দেহটিকে ভুল প্রমাণিত করেছেন গোটা বই জুড়ে।

এখন একটা বিতর্ক সাম্প্রতিককালে চলছে যে ‘জেলায়’ না ‘জেলার’। অর্থাৎ ‘অমুক জেলার নাট্যচর্চা’ বলা হবে নাকি ‘অমুক জেলায় নাট্যচর্চা’ বলা হবে? লেখক সোচ্চারে কিছু না বললেও ভূমিকা পড়লে মনে হয়, লেখক সচেতন ভাবেই গ্রন্থনামে ‘জেলার’ রেখেছেন। ভূমিকার সেই প্রাসঙ্গিক অংশটি উদ্ধৃত করা যায়: “তেমনভাবে দেখতে গেলে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রসারণেই একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জীবনের লক্ষণগুলির মধ্যে সাধারণ সাদৃশ্যমূলক সমন্বয় সৃজিত হয়ে ওঠে। সেই সমন্বিত রূপটিই অঞ্চলটির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যরূপে প্রতিভাত হয়। সুতরাং স্বতশ্চলভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে,…. একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের ভিত্তিই হলো আঞ্চলিক সংস্কৃতি, যা লোকাল কালচারের সুরভিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমবায়ে গড়ে ওঠে।”

ইতিহাস ও ভৌগোলিক কারণেই নদীয়া এমন এক জেলা, যেখানে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ নবদ্বীপে রয়েছে চৈতন্যের নগর-সংকীর্তন , শান্তিপুরে আছেন অদ্বৈতাচার্য, রয়েছে কৃত্তিবাসের রামায়ণ পাঁচালি, মতিলাল রায় কিংবা নদীয়া সীমান্তবর্তী নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের যাত্রাগান। পরবর্তী সময়ে এসেছে বিদ্যাসুন্দর যাত্রা, কৃষ্ণকমল গোস্বামী, হরিনাথ মজুমদার, দীনবন্ধু মিত্র, মীর মশাররফ হোসেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়–তারও পরে দেশভাগের প্রভাবও এই জেলায় বোধহয় সর্বাধিক। তাই আমাদের নাট্য-সংস্কৃতির সামগ্রিক অবয়বেই যে নদীয়া জেলার দান সুপ্রচুর–তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার অনুপুঙ্ক্ষ ইতিহাস এতকাল দু মলাটে বাঁধা পড়েনি, এবার পড়ল।

বইটিকে লেখক ভাগ করেছেন চারটি বড় পর্বে– ১. আদি ও মধ্যপর্ব (প্রাক-ইতিহাস পর্ব, কৃষ্ণলীলা, যাত্রা, অঞ্চলভিত্তিক নদীয়ার নাট্যাভিনয়, উপসংহৃতি) ২ . গণনাট্য পর্ব, ৩. সাম্প্রতিক পর্ব এবং শেষ পর্ব ৪. আমাদের থিয়েটার: আমাদের নির্মাণ। আদি ও মধ্যপর্ব শুরু হয়েছে চৈতন্য ও কৃষ্ণলীলায় নাট্য-উপাদানের সন্ধান করে, তারপরে একে একে এসেছে যাত্রা যুগ,– ঊনবিংশ শতাব্দীর স্মৃতিকথায়, পত্র-পত্রিকায় লেখক খুঁজেছেন সে-সময়ের নাট্য-উপাদান। তারপর বিংশ শতাব্দীর নাট্যকার, নাট্যাভিনয়, অপেরা পার্টি। এ পর্বে অবিভক্ত বঙ্গের মেহেরপুরও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।

একদম প্রাকপর্বের কিছু অংশ ব্যতিরেকে প্রায় পুরো বইয়ের উপাদান সংগৃহীত হয়েছে–প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণ-সাক্ষাৎকার, স্যুভেনির,  নাটকের টিকিট ইত্যাদি থেকে(বইয়ের শেষে অ্যালবামে রয়েছে প্রচুর প্রচুর স্যুভেনির, টিকিটের ছবি)। ভূমিকা থেকে আমরা জানতে পারি এই তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছিল আশির দশকে। সেই তালিকায় আছেন প্রবীণ যাত্রা-দর্শক থেকে শুরু করে মঞ্চকর্মী, শব্দকর্মী, আলো-পোশাককর্মী থেকে নাট্য-পরিচালক। সেদিন যারা প্রবীণ ছিলেন, আজ তারা কেউ নেই–তাঁদের সঙ্গে অকথিত ইতিহাসও হারিয়ে যায়, যদি না ‘মুখের কথায় ইতিহাসে’র প্রেক্ষিতে এই ধরণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ না হয়। তথ্য ও ইতিহাসের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই, কিন্তু তথ্যের সঙ্গে সমাজ-ইতিহাসের আন্তঃসম্পর্ক নির্ণয়ই এ গ্রন্থের সম্পদ।

যেমন গণনাট্য পর্বের শেষে লেখক দুদিকই দেখাচ্ছেন। একদিকে লেখক দেখাচ্ছেন:

“পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অংশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নদীয়া জেলাতেও গণনাট্য আন্দোলন নাট্যচর্চাকে অভিজাত ও সম্পদশালীদের বিনোদন এবং মধ্যবিত্তের শখপূরণের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত করে।…আমরা সকলেই জানি বাংলার নাট্যচর্চায় গণনাট্যের অন্যতম দান হয়তো দলগত সংহতির অনুশীলন। আমরা যাকে বলি টিম-ওয়ার্ক–তা এ সময়েরই অর্জন। কী অভিনয় কলা, কী নাটকের অন্যান্য বিভাগ–সর্বত্রই টিম ওয়ার্কের চর্চা। ‘নাট্যকর্মী’ শব্দটি এ সময়েই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। নদীয়ার গণনাট্যকর্মীরাও, বিশেষভাবে কৃষ্ণনগর সংস্কৃতি সংসদ, পলাশীপাড়া অগ্রণী সুভাষ সংঘ, শান্তিপুর শাখা এবং পরবর্তীকালে রানাঘাটের মঞ্চনাট্যম দলগত সংহতির পরিচয় দিয়ে নাট্য-মানচিত্রের চরিত্র বদলে সহায়ক হয়ে উঠেছিলেন। অতিরিক্ত অর্থব্যয় ও আড়ম্বরের জায়গা নেয় নাট্যকর্মীদের শ্রম ও মেধা। নাটক সমস্ত বিভাগে কীভাবে শিল্পশোভন হয়ে ওঠে এবং দর্শকদের আশাা-আকাঙক্ষা আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা কীভাবে মঞ্চে প্রতিফলিত হতে পারে–সেদিকে দৃষ্টিপাতের প্রয়োজনীয়তাকে গণনাট্য উপলব্ধি করায়।”

আবার তাঁকে এও লিখতে হচ্ছে:

“মতাদর্শের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও সে বিষয়ে শিক্ষার একান্ত অভাব, চর্চার ঘাটতি ভেতরে-বাইরে সংস্কৃতি ফ্রন্টের ব্যবহারযোগ্যতাকে খাটো করে রেখেছিল। রাজনীতি চর্চাই হওয়া উচিত ছিল গণনাট্য সংঘের মূল শক্তি, বাস্তবে ছিল রাজনীতি না-চর্চার দুর্বলতা। এই দুর্বলতা নদীয়ার গণনাট্য সংঘের কার্যকক্রমকে দেশ-কাল-পরিস্থিতির সঠিক প্রেক্ষিতে প্রতিস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছিল।…মূলত কলকাতা ও বৃহত্তর কলকাতার গণনাট্য শাখাগুলির প্রযোজিত নাটকগুলিকেই নদীয়ার নাট্যকর্মীরা অনুসরণ করে চলেছেন। স্থানীয় ও প্রান্তিক মানুষের জীবনের বৈশিষ্ট্য, আশা-আকাঙ্ক্ষা নদীয়ার গণনাট্যমঞ্চে প্রতিফলিত হয়নি। রাজনৈতিক শিক্ষার অভাব তো ছিলই–এই ধরণের সমস্যা নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের তেমন মাথাব্যথা ছিল বলে মনে হয় না। বরং নাট্যকর্মীদের মধ্যে চারিয়ে দেওয়া হয়েছে নাটকের সঙ্গে সম্পর্কহীন শৃঙ্খলার দায়। ….নাট্যকলার বিভিন্ন দিকে কারও কারও ব্যক্তিগত দক্ষতা ও দলগত কার্যকুশলতার বিকাশ ঘটলেও (যেমন পূর্ণিমা চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়, কাঞ্চন চট্টোপাধ্যায়ের সাংগীতিক প্রতিভা কিংবা বিশু সেনের উদ্ভাবনী রূপসজ্জা) এই বিকাশমান সময়কে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও বিকশিত উপাদানগুলিকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ব্যবহারের কোনাে নির্ধারিত পদ্ধতি বা কার্যক্রম ছিল না। নদীয়ার গণনাট্য আন্দোলন নাট্যকর্মীদের মধ্যে কতটা আবেগ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল, তা পরিমাপের কোনাে ব্যবস্থা রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারণের স্তরে হয়েছিল কিনা সন্দেহ। সে কারণেই যে-কোনো রাজনৈতিক সংকটের দিনে নদীয়ার গণনাট্যকর্মীদের অসহায়ভাবে বিশ্বাসের সংকটে দোদুল্যমান দেখা গেছে। দায়বদ্ধ সংস্কৃতির দায়হীনতার ফাঁক তাই সেকালে স্পষ্টই প্রত্যক্ষ করা যায়।

তবু গণনাট্য আন্দোলন জেলার নাট্যচর্চায় পরিবর্তনের যে হাওয়া বইয়ে দেয়, সেই পরিবর্তিত ভিত্তিভূমিতেই দেখা দেয় পরবর্তী নাট্যচর্চার চেহারা-চরিত্র। গণনাট্য পরবর্তী নাট্য-আন্দোলনকে নবনাট্য-সৎনাট্য-গ্রুপ থিয়েটার–যে নামেই ডাকা হোক না কেন– তা গণনাট্যের পরম্পরার কাছে ঋণী। ….. এই প্রেক্ষাপটেই চলতি অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত নদীয়ার নাট্যচর্চাকে দেখতে হবে।”

শুধু গণনাট্য পর্বের জন্যেই বইটিকে এক বিপন্ন সময়ের দলিল কেউ বলতেই পারেন।

সাম্প্রতিক পর্বে এসেছে অপরিমিত ভাঙা গড়ার নাট্য। লেখক নিজেও যেহেতু এই পর্বে নাটক লেখা ও নির্দেশনায় জড়িত ছিলেন, তাই এ পর্বও লিখেছেন দক্ষতায়। প্রায় ৬০০ র ওপরে নাট্যদলের উল্লেখ ও তার প্রযোজনা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নাট্যকর্মীদের নাম, অজস্র নাট্যদলের প্রতীক– বিপুল পরিশ্রমে তৈরী হয়েছে এক বিরাট তথ্যভাণ্ডার। এ কাজ এক দিনের  নয়, কয়েক দশকের পরিশ্রম ছাড়া সত্যি এ জিনিস সম্ভবও নয়।

শেষ পর্বে, যাকে লেখক বলেছেন ‘আমাদের থিয়েটার আমাদের নির্মাণ’ –এই অংশটি তাত্ত্বিক তো বটেই, এ যেন আত্মসমীক্ষাও বটে। এমন সব অমোঘ, তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তুলেছেন লেখক মেধাবী গদ্যে যে সাজিয়ে উদ্ধৃতি দেওয়ার লোভ সংবরণ করা কোনো আলোচকের পক্ষেই দুষ্কর।–হাজার শব্দের মধ্যে লেখা শেষ করতে অনুরুদ্ধ হওয়ায় সে লোভ এ যাত্রা সংবরণ করা গেল। বাস্তবিকপক্ষে ভেতরে ভেতরে সমাজতত্ত্বের নিবিড় অনুশীলন ও গবেষকের বহুশ্রমী সবিশ্লেষ প্রক্রিয়া ছাড়া এ জাতীয় লেখার পরিকল্পনাও অসম্ভব। এটিকে একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ হিসেবেও দেখা চলে। এখানেই প্রকাশকের কাছে অনুযোগ যে, এ বইয়ের দাম বড্ড বেশি রেখেছেন।– শুধু এই প্রবন্ধটিই আলাদা পুস্তিকা আকারে করে হলেও অনেক সংখ্যক সংস্কৃতিকর্মীদের পড়ানোর ব্যবস্থা করা যায় নাকি, তা প্রকাশকের ভেবে দেখা উচিত।

বইয়ে রয়েছে প্রায় কুড়ি পৃষ্ঠার অ্যালবাম–তার মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সংবাদপত্রের কাটিং, টিকিট, নাট্যমঞ্চের ছবি, জায়গা বাঁচাতে বোধহয় প্রত্যেক নাট্যদলের একখানি করে ছবি দেওয়া হয়েছে।  বইয়ের গভীরতা ও মান অনুযায়ী এই আপসটুকু প্রকাশকের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। ছবি রঙিন হওয়া উচিত ছিল এবং দু-একটির মান নিয়েও চোখে অস্বস্তি হয়। তা সত্ত্বেও এ বইয়ের আভিজাত্য একটুও কমেনি যদিও। তবু সবশেষে বই তো হাতে নিয়ে দেখার জিনিসও বটে।

আমার হাতের কাছে যে কপিটি রয়েছে সেটি তৃতীয় মুদ্রণ, যদিও কপির সংখ্যা লেখা নেই। বছর দেড়েকে এরকম একখানা বইয়ের তৃতীয় মুদ্রণ বাংলা বইয়ের জন্য নিঃসন্দেহে সুখবর। পরের সংস্করণে তাই অ্যালবাম অংশটি বর্ধিত করা ও রঙিন ছবির দাবি প্রকাশকের কাছে রাখা গেল।

বাড়িতে বসে কিনতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুনঃ https://thinkerslane.com/?product=nadia-jelar-natyo-chorcha

1 thought on “নাটক জড়িয়ে বেঁচে থাকা মানুষদের আখ্যান ‘নদীয়া জেলার নাট্যচর্চা’। লিখছেন সুজন বন্দ্যোপাধ্যায়

  1. পড়েছি। আলোচক যথার্থই লিখেছেন—শেষ অংশটি আলাদা পুস্তিকা হিসেবে ছেপে যত বেশি সংখ্যক সম্ভব মানুষকে পড়ানোর ব্যবস্থা করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *